09 February 2019

৯ই ফেব্রুয়ারী কবি, কথাশিল্পী, নাট্যকার, প্রবন্ধকার, চিকিৎসক 'বনফুল'-বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের প্রয়ান দিবস। আজ ওঁনার প্রয়াণ দিবসে জানাই শ্রদ্ধা।

ছোটবেলা থেকেই বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ ছিল। বলাইচাঁদ যখন সাহেবগঞ্জ রেলওয়ে হাইস্কুলের ছাত্র সেই সময়ে ‘বিকাশ’ নামে হাতে লেখা পত্রিকায় কবিতা লেখালিখি করতো। পরে ‘মালঞ্চ’ পত্রিকায় অষ্টম শ্রেণির ছাত্র বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা ছাপা হয়। এতে স্কুলের হেডপণ্ডিত রামচন্দ্র ঝা খুশি হলেন না। হেডপণ্ডিত রামচন্দ্র ঝার ধারণা বলাইচাঁদ সংস্কৃতে একশো পাওয়ার যোগ্য কিন্তু কবিতা লেখার কারনেই বলাইচাঁদ সংস্কৃতে একশো পাচ্ছে না। তাই হেডপণ্ডিত বলাইচাঁদকে কবিতা লিখতে নিষেদ করেন। কিন্তু বলাইচাঁদের প্রবল ইচ্ছা লেখার। তাই হেডপণ্ডিত রামচন্দ্র ঝার হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য 'বনফুল' ছদ্মনাম দিয়ে লিখতে শুরু করেন। কিন্তু এই ছদ্মনামে লিখেও পণ্ডিতমশাইয়ের কাছে ধরা পড়ে গেলেন। এ বার আর পণ্ডিতমশাই বাধা দিলেন না। তিনি বলাইচাঁদকে নির্দেশ অমান্য করার জন্য 'শাস্তি' হিসাবে তাঁকে কিছু সংস্কৃত শ্লোক অনুবাদ করতে বলেন। সেই আনুবাদগুলি 'প্রবাসী’ ও ‘ভারতী’-পত্রিকাতে ছাপাও হয়। এ ভাবেই বলাইচাঁদ 'বনফুল' নামে পরিচিতি লাভ করে 'প্রবাসী', 'ভারতী' এবং সমসাময়িক অন্যান্য পত্রিকায় তাঁর ছোটগল্প প্রকাশ হতে থাকে।

বাংলা সাহিত্যে সর্বপ্রথম অণুগল্প লেখেন বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়। তাঁর গল্পগুলো আধ পৃষ্ঠা বা এক পৃষ্ঠা কিংবা দুই পৃষ্ঠা পর্যন্ত সীমায়ত থাকত। ঈশপের ও জাতকের গল্প, পঞ্চতন্ত্র, হিতোপদেশ প্রভৃতি বনফুলের অণুগল্পের পূর্বতন ঐতিহ্যের নিদর্শন। ‘নিমগাছ’ শিরোনামের আধ-পৃষ্ঠার গল্পটিতে ফুটে উঠেছে এক অসাধারণ কাব্যিক ব্যঞ্জনা। আরেকটি অণুগল্পের নাম হলো ‘অতি ছোটগল্প’। মানুষের নিয়তিকে নিয়ে দুটি অণুগল্পের নাম হলো ‘আত্ম-পর’ ও ‘হাসির গল্প’।

বলাইচাঁদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংস্পর্শে এসেছিলেন। ১৯৩৫ সালে রাজস্থানের জয়পুরের বাসিন্দা রামচন্দ্র শর্মা নামে এক ব্রাহ্মণ মন্দিরে বলি বন্ধ করতে চেয়ে কালীঘাট মন্দিরের কাছে অনশন শুরু করেন। বেশির ভাগ বাঙালিই রামচন্দ্রের এই কর্মসূচির বিরুদ্ধে থাকলেও সমর্থন জানালেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথের এই অবস্থানের বিরোধিতায় খানিকটা ব্যঙ্গের সুরেই একটি কবিতা লেখেন বনফুল। কবিতা পড়ে রাগ নয় বরং কবির সঙ্গে আলাপ করতে চাইলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু বনফুল জানালেন, তিনি ব্রাহ্মণ ও ডাক্তার। তাই ‘কল’, অর্থাৎ নিমন্ত্রণ ছাড়া কোথাও যান না। শেষমেশ সপরিবার বনফুলকে নিমন্ত্রণই জানালেন রবীন্দ্রনাথ। নিমন্ত্রণ পেয়ে পরিবার নিয়ে বনফুল যান শান্তিনিকেতন।

এই শুরু রবীন্দ্র-সান্নিধ্যের। পরে সে আলাপ গড়াল ঘনিষ্ঠতায়। বনফুলের ‘মানুষের মন’ গল্পটি পড়ে ভারী খুশি হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি লেখককে কিছু একটা উপহার দিতে চাইলেন। বনফুলের আবদার উপহার হিসেবে গুরুদেবের গায়ে দেওয়া একটি পুরনো জামা। রবীন্দ্রনাথ কিছুতেই দেবেন না। বনফুলও নাছোড়। শেষমেশ এক দিকে দামি পশম, অন্য দিকে রেশম দেওয়া একটি প্রকাণ্ড জোব্বা উপহার পান। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বনফুলের মতান্তরও হয়েছে। বনফুলের ‘তৃণখণ্ড’-য় কিছু কবিতা  সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মতামত, ‘ডাক্তারের ক্লিনিকে ওরা ভান করা সৌখিন রোগী’। বনফুলের ‘শ্রীমধুসূদন’ নাটকের কিছু অংশও রবীন্দ্রনাথের পছন্দ হয়নি বলে বদলানোর পরামর্শ দিলেও বনফুল তা করেননি।

লেখক হিসেবে বনফুল হাজারেরও বেশি কবিতা, ৫৮৬টি ছোট গল্প, ৬০টি উপন্যাস, ৫টি নাটক, জীবনী ছাড়াও অসংখ্য প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তাঁর 'স্থাবর' ও 'জঙ্গম' উপন্যাসগুলি সর্বসময়ের ক্লাসিক উপন্যাস হিসাবে স্থান করে নিয়েছে। অগ্নীশ্বর ও হাটেবাজারে উপন্যাসগুলি খুবই জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাঁর অনান্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাস তৃণখন্ড, অগ্নি, ডানা ত্রিবর্ণ, ভুবনসোম, প্রচ্ছন্ন মহিমা, উদয় অস্ত প্রভৃতি। তাঁর কয়েকটি উপন্যাস চলচ্চিত্রায়িত হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভূবনসোম, অগ্নীশ্বর ও হাটেবাজারে।

সমাজের অবহেলিত মানুষের সেবা করা ছিল বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের জীবনের ব্রত। এক্ষেত্রে ডাক্তারি ছিল তাঁর অন্যতম মাধ্যম।

কবি, কথাশিল্পী, নাট্যকার, প্রবন্ধকার, চিকিৎসক বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৮৯৯ সালের ১৯শে জুলাই বিহারের পূর্ণিয়া জেলার মণিহারী গ্রামে। পিতা সত্যচরণ মুখোপাধ্যায় ছিলেন পূর্ণিয়া জেলার মণিহারী ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড হাসপাতালের ডাক্তার। মাতা মৃণালিনী দেবী। তার অনুজ অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় খ্যাতনামা চিত্রপরিচালক।

বিহারের পূর্ণিয়া জেলার মণিহারী স্কুলে এবং পরে সাহেবগঞ্জ জেলার সাহেবগঞ্জ উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ে তিনি লেখাপড়া করেন। এরপর ১৯২০ সালে হাজারীবাগ সেন্ট কলম্বাস কলেজ থেকে তিনি আই.এস.সি, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কলকাতা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন এবং পাটনা মেডিক্যাল কলেজে থেকে এম.বি ডিগ্রী লাভ করেন।

বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় কর্মজীবন শুরু করেন কলকাতার একটি বেসরকারি ল্যাবরেটরিতে। পরে মুর্শিদাবাদের আজিমগঞ্জের মিউনিসিপ্যালিটি হাসপাতালে মেডিক্যাল অফিসার পদে কিছুকাল দায়িত্ব পালন করেন। তবে তিনি ভাগলপুরের খলিফাবাগে নিজ উদ্যোগে The Secro-Bactro Clinic নামে একটি ল্যাবরেটরি  প্রতিষ্ঠা করে খ্যাতিমান ডাক্তার হিসেবে পরিচিত হন। প্যাথলজিস্ট হিসাবে তিনি ৪০ বৎসর কাজ করেছেন।  তিনি ১৯৬৮ সালে কলকাতায় চলে আসেন স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য।

সাহিত্য-সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় লাভ করেন শরৎস্মৃতি পুরস্কার, রবীন্দ্র পুরস্কার, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের জগত্তারিণী পদক। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডিলিট উপাধি প্রদান করে ১৯৭৩ সালে; ১৯৭৫ সালে ভারত সরকারের কাছ থেকে তিনি পান পদ্মভূষণ উপাধি।

১৯৭৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি  কলকাতা শহরে তাঁর মৃত্যু হয়। আজ ওঁনার ৪০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

ভালো লাগলে লাইক, শেয়ার করুন। বনফুলের সম্বন্ধে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।

08 February 2019

আজ নাট্যপরিচালক ও মঞ্চাভিনেতা গিরিশচন্দ্র ঘোষের ১০৬তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সাথে তাঁকে স্মরণ করি৷

আজ ৮ই ফেব্রুয়ারী বাংলা থিয়েটারের স্বর্ণযুগের প্রাণ পুরুষ ও জনক গিরিশচন্দ্র ঘোষের প্রয়াণ দিবস।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে কলকাতার কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটের (বর্তমানে বিধান সরণি) স্টার থিয়েটার ভিড়ে জমজমাট থাকতো। সেখানে অভিনয় করতেন অমৃতলাল মিত্র, অমৃতলাল বসু, হরিপ্রসাদ বসু ও প্রধান আকর্ষণ পরিচালক ও অভিনেতা গিরিশচন্দ্র ঘোষ। স্টারে অভিনীত নাটকের রচয়িতাও ছিলেন গিরিশচন্দ্র ঘোষ। সারা বাংলায় তখন সবার মুখে মুখে গিরিশচন্দ্র ঘোষের নাম।

১৮৪৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা নীলকমল ঘোষ তখন কলকাতার স্বনাম ধন্য ব্যক্তি ছিলেন। মায়ের নাম রাইমনি। গিরিশচন্দ্র ঘোষের ছিলেন তাঁর পিতামাতার অষ্টম সন্তান। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এবং পণ্ডিত হলেও গিরিশচন্দ্র ঘোষের কোন বিশেষ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিলনা। গিরিশচন্দ্র ঘোষের প্রাথমিক শিক্ষাজীবন স্থানীয় এলাকার বিদ্যালয়ে শুরু হয়। পরে গৌরমোহন আঢ্যের বিদ্যালয় ও হেয়ার স্কুলে লেখাপড়া করেন। ১৮৬২ সালে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। তবে পরবর্তীকালে একান্ত নিজস্ব চেষ্টায় তিনি ইংরেজি ভাষা ও হিন্দু পুরাণ বিষয়ে বিশেষ ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। এক সময় তিনি ‘অ্যাটকিন্সন টিলকন’ কোম্পানির হিসাবরক্ষণ বিভাগে শিক্ষানবিস হিসেবে যোগ দেন। গিরীশচন্দ্র ঘোষের মন প্রচণ্ড দ্রুতগতিতে এবং অদ্ভুত ভাবে চিন্তা করতে পারতো। তার চিন্তা কিংবা আইডিয়া বা শব্দাবলী তাৎক্ষনিক লিখে রাখার জন্য তিনি দেবেন্দ্র নাথ মজুমদারকে সেক্রেটারি নিয়োগ দেন। দেবেন্দ্র সারাক্ষণ তার কাছে তিনটা পেন্সিল প্রস্তুত রাখতেন, দোয়াত কলম রাখতেন না। কারণ কলমে কালি ভরার মত সময়টুকুও তিনি পেতেন না। কোন কথা বুঝতে না পেরে পুনরায় জিজ্ঞেস করলে গিরীশ রেগে যেতেন, কারণ তাতে তার চিন্তায় বিঘ্ন ঘটতো। তাই কোন শব্দ বুঝতে না পারলে তার নির্দেশ অনুযায়ী দেবেন্দ্র সেখানে ডট বসিয়ে যেতেন, যাতে পরে জেনে নিতে পারেন।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের প্রভাবে তিনি প্রথম গান এবং কবিতা লিখতে শুরু করেন। পরে নাট্য মঞ্চের সাথে যুক্ত হলে নাটক লিখতে শুরু করেন। ১৮৬৬ সালে গিরিশচন্দ্রের লেখা 'বিল্বমঙ্গল' প্রথম স্টারে অভিনীত হয়। ১৮৬৭ সালে মাইকেল মধুসূদন রচিত 'শর্মিষ্ঠা' নাটকের গীতিকার হিসেবে নাট্যজগতে তাঁর প্রথম জীবন শুরু হয়েছিল। এর ঠিক দু'বছর পরে দীনবন্ধু মিত্রের 'সধবার একাদশী' নাটকে অভিনয় করে সুনাম অর্জন করেন। ১৮৭২ সালে তিনিই প্রথম বাংলায় পেশাদার নাট্য কোম্পানি ন্যাশনাল থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করেন।

১৮৭৭ সালে মেঘনাদ বধ কাব্যে রামচন্দ্র ও মেঘনাদ উভয় ক্ষেত্রে অভিনয়ের জন্য সাধারণী পত্রিকার সম্পাদক অক্ষয়চন্দ্র সরকার তাঁকে "বঙ্গের গ্যারিক" আখ্যায় ভূষিত করেন। তার হাত ধরে বহু অভিনেতা অভিনেত্রী বাংলা থিয়েটারে এসেছেন, বাংলা থিয়েটারকে করেছেন সমৃদ্ধ। তাদের মধ্যে অন্যতম বিনোদিনী দাসী। যিনি মাত্র ১২ বছর বয়েসে বাংলা নাটকের জগতে প্রবেশ করেন এবং ২৩ বছর বয়সে অবসর নেন। ১৮৮৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর 'নটী বিনোদিনী'কে নিয়ে স্টার থিয়েটারে 'চৈতন্যলীলা' নাটকটি মঞ্চস্থ করেছিলেন। এই নাটকটি দেখে রামকৃষ্ণদেব মুগ্ধ হয়ে নিমাই এর ভূমিকায় বিনোদিনীকে আশীর্বাদ করেছিলেন। এরপর গিরিশচন্দ্র ঘোষ রামকৃষ্ণদেবের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তার সাথে সাক্ষাতের আগে গিরিশচন্দ্র ছিলেন কুখ্যাত মদ্যপ ও স্বেচ্ছাচারী, বেপরোয়া, সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধাচারি, বিশৃঙ্খল জীবনাচরণে অভ্যস্ত এক ব্যক্তি। কিন্তু তা সত্ত্বেও জীবনের পরবর্তী ভাগে তিনি রামকৃষ্ণ পরমহংসের এক বিশিষ্ট শিষ্য হয়েছিলেন এবং শ্রীরামকৃষ্ণের অন্যতম অন্তরঙ্গ শিষ্যে পরিণত হয়েছিলেন।  রামকৃষ্ণদেবের শিষ্যত্ব গ্রহণের পর গিরিশ ঘোষের মধ্যে পরিবর্তন আসে। এইসময় ধর্ম প্রভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি একাধিক পৌরাণিক ও ভক্তিমূলক নাটক রচনা করেন।

গিরিশ চন্দ্র ঘোষ পৌরাণিক, ভক্তিমূলক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে মোট ৪০ টি নাটক রচনা করেছিলেন। তাঁর লেখা নাটকের সংখ্যা ৭৫।  উল্লেখযোগ্য পৌরাণিক নাটকগুলির মধ্যে 'রাবণবধ', 'অভিমুন্যবধ', "সীতার বনবাস', 'বিল্বমঙ্গল', 'অজ্ঞাতবাস' ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। "অশোক", "সিরাজউদ্দৌলা", "মীরকাশিম", "ছত্রপতি শিবাজী" ইত্যাদি তাঁর রচিত প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক নাটক। তাঁর রচিত সামাজিক নাটকগুলি হলো প্রফুল্ল, হারানিধি, মায়াবসান, বলিদান ইত্যাদি। আবার "মুকুল মঞ্জরা" ও "আবুহোসেন" এর মতো কিছু রোমান্টিক নাটকও তিনি রচনা ক‍রেছেন। তিনি সীতার বনবাস লিখেছিলেন এক রাতে, 'সধবার একাদশী’র জন্য ২৬ টা গানও লিখেছিলেন এক রাতে। তার বোন দেবমাতা বলেছিলেন, অন্যতম শ্রেষ্ঠ  নাটক 'বিল্বমঙ্গল' লিখেছিলেন মাত্র ২৮ ঘণ্টায় এবং নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে এক বসাতে। এই নাটকগুলো আজও জনপ্রিয়তা হারায়নি। গিরিশচন্দ্র ঘোষের রচিত বুদ্ধদেব চরিত  বাঙালির মধ্যে বুদ্ধের প্রতি নতুন ভাবে আগ্রহ সৃষ্টি করতে অনেক অবদান রেখেছে। বাংলায় বুদ্ধ ধর্মীয় চর্চার ইতিহাসেও গ্রন্থটি অতি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

বেশ কয়েক বছর তিনি হাঁপানি রোগে ভোগেন। ১৮৯০ সালের ২০শে জুন তিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি উইল করেন। প্রচুর সম্পত্তির মালিক হয়েও জীবনে তাঁর সুখ ছিল না। পরপর দুই স্ত্রীর মৃত্যু হয়। তাঁর একমাত্র পুত্র সুরেন্দ্র ঘোষ পেশায় অভিনেতা ছিলেন। গিরিশচন্দ্র তাঁর বোস পাড়া লেনের বাড়ি শ্রীধর জীউ ঠাকুরের নামে দান করেন। তিনি তাঁর বোন ও দুই দৌহিত্রকে একটি বাড়ি ও গ্রন্থাবলির কপিরাইট দিয়ে যান। ১৯১২ সালের ৮ ই ফেব্রুয়ারি ৬৮ বছর বয়সে নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষের মৃত্যু হয়।

06 February 2019

জেনে নিন ভর্ধন নায়েককে যিনি ঈশা আম্বানিকে বিয়ের সাজে সাজিয়ে ছিলেন। এরপর তিনি কাকে সাজাবেন?

কে এই সেলিব্রিটি মেক আপ শিল্পী যিনি ভারতের শিল্পপতি মুকেশ আম্বানির মেয়ে ঈশা আম্বানিকে বিয়েতে সাজিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন?

জেনে নিন ভর্ধন নায়েককে যিনি  প্রিয়াঙ্কা চোপড়া থেকে কাজল এবং মাধুরি দীক্ষিত থেকে সোনাক্ষী সিনহা পর্যন্ত অনেক বলিউডের নায়িকাদের মেক আপ আর্টিস্ট। তবে ঈশা আম্বানির মেক আপ করে তিনি সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।

ঈশা আম্বানির বিয়ের সাজের সম্পর্কে ভর্ধন বলেন, "ঈশা ও মিসেস নিতা আম্বানি চেয়েছিলান বিয়ের মেক আপ যেন ঐতিহ্যগত, মার্জিত এবং ক্লাসিকাল হয়। অনেক বছর ধরে ওনাদের সাথে কাজ করার সুবাদে ঈশারা মেক আপের বিষয়টি আমার উপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। ঈশার ত্বকের ধরন, তার পছন্দগুলি, মেক আপের অপছন্দের বিষয়গুলি জানতাম। সেগুলো মাথায় রেখে আমি আত্মবিশ্বাসের সাথে ঈশার রাজকীয় নান্দনিক রূপ ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি"।

ভর্ধন নায়েক বিয়ের কণের জন্য নিচের পাঁচটি মেক আপ টিপস শেয়ার করেন:

১)  যতটা পারা যায় কম করা (Less is more)।

২) জীবনের স্মরণীয় দিনে প্রসাধনী দ্রব্যগুলি আপনার মুখে যেন পেস্টের মত ব্যবহার করা না হয়।

৩) যতটা সম্ভব নিজেকে ন্যাচারাল রাখুন। স্কিনে যেন  স্বাস্থ্যকর এবং ন্যাচারাল ভাব বজায় থাকে।

৪) আপনি যতটা পারবেন জৈব প্রসাধনী দ্রব্য ব্যবহার করুন। এগুলির মুখের উপর রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া হয় না।

৫) নিজেকে সতেজ এবং প্রফুল্ল রাখার জন্য ভালো করে ঘুমোন এবং হাইড্রেটেড রাখার জন্য  যথেষ্ট পরিমাণে জল খান।

এরপর আলিয়া ভট্টকে বিয়ের সাজে সাজাতে তৈরী শিল্পী ভর্ধন নায়েক।


আজ ৬ই ফেব্রুয়ারী শহিদ বসন্ত কুমার বিশ্বাসের ১২৩তম জন্মবার্ষিকী। ওঁনার প্রতি রইল আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

আজ ৬ই ফেব্রুয়ারী স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং অগ্নিযুগের বীর বিপ্লবী বসন্ত কুমার বিশ্বাসের ১২৩তম জন্মবার্ষিকী। ওঁনার প্রতি রইল আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

বসন্ত কুমার বিশ্বাস যুগান্তর দলের নেতা অমরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ও  রাসবিহারী বসুর নিকট স্বাধীনতা সংগ্রামের সশস্ত্র বিপ্লবের দীক্ষা নেন। বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৯১২ সালের ২৩ ডিসেম্বর তখনকার প্রভাবশালী ও বিত্তবান ব্যক্তিদের নিয়ে একটি শোভাযাত্রা বার করেন। শোভাযাত্রাটি দিল্লির কুইন্স গার্ডেন হয়ে চাঁদনীচক দিয়ে দেওয়ান-ই-আমের দিকে অগ্রসর হয়। বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ সস্ত্রীক হাতির পিঠে বসে এই শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেছিল। সেই সময় পূর্ব পরিকল্পনানুযায়ী বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর নির্দেশে বালিকার ছদ্মবেশে বসন্ত কুমার বিশ্বাস মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক ভবন থেকে বড়লাটকে লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ করে। ভাগ্যক্রমে বড়লাট বেঁচে গেলেন, মারা গেল তাঁর একজন চৌকিদার।  পুলিশ আততায়ীকে ধরার জন্য খোঁজ শুরু করে। রাসবিহারী বসু বসন্ত কুমার বিশ্বাসকে সঙ্গে নিয়ে দেরাদুনে চলে যান। ১৯১৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তিনি যখন তাঁর পিতার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান পালন করছিলেন, তখন তাঁকে নদীয়ার কৃষ্ণনগর থেকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর। ১৯১৪ সালের ২৩ মে দিল্লিতে দিল্লি-লাহোর ষড়যন্ত্র মামলার শুনানি শুরু হয় এবং ৫ অক্টোবর বসন্ত কুমারকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়। সরকার তাঁকে মৃত্যুদন্ড দিতেই বেশি আগ্রহী ছিল। তাই লাহোর হাইকোর্টে একটি আপীল দাখিল করা হয় এবং বিচারের নামে একটি প্রহসন অনুষ্ঠিত হয়। আম্বালা জেলে বসন্ত কুমার বিশ্বাসের ফাইলে কারচুপি করা হয়। ফাইলে তার বয়স দুবছর বাড়িয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয় যে, তিনি তার কৃত অপরাধের তীব্রতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞাত ছিলেন। এখন পর্যন্ত জেলের ফাইলে এ ভুলের সংশোধন করা হয়নি। বসন্ত কুমার বিশ্বাসকে ফাঁসি দ্বারা মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়। ১৯১৫ সালের ১১ মে বসন্ত কুমার বিশ্বাস অত্যন্ত শান্ত ও অবিচলিত মনে ফাঁসির মঞ্চে উঠেন। পাঞ্জাবের আম্বালা জেলে মাত্র ২০ বছর বয়সে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হয়ে বসন্ত কুমার ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের আত্মত্যাগী হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন।

৬ই ফেব্রুয়ারী ১৮৯৫ সালে তাঁর জন্ম নদীয়া জেলার অন্তর্গত পোড়াগাছা গ্রামে। তাঁর পিতার নাম মতিলাল বিশ্বাস। নীল বিদ্রোহের নেতৃত্ব দানকারী প্রধান নেতা দিগম্বর বিশ্বাস তার পূর্বপুরুষ। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পাঠ শেষ করে বসন্তকুমার বিশ্বাস  মুড়াগাছা সর্বার্থ সাধক বিদ্যালয়ে (মুড়াগাছা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ) স্বর্গীয় শ্রী রূপলাল খাঁ -এর তত্ত্বাবধানে ভর্তি হয়েছিলেন। তিনি বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে থাকতেন। প্রধানশিক্ষক মহাশয় শ্রী ক্ষীরোদ গঙ্গোপাধ্যায় বসন্তকে খুবই স্নেহ করতেন। ছোট থেকেই বসন্ত ছিলেন বিপ্লবী মনোভাবাপন্ন।





04 February 2019

আজ বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক সতেন্দ্রনাথ বসুর ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ওঁনার প্রতি রইল আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

আজ ৪ঠা ফেব্রুয়ারী জাতীয় অধ্যাপক ও বিজ্ঞানী সতেন্দ্রনাথ বসুর প্রয়াণ দিবস।

বিজ্ঞানের জগতে যার অবদান কখনো অস্বীকার করা যাবেনা তিনি হলেন  মহা বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। যিনি ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারী উত্তর কলকাতার গোয়া বাগান অঞ্চলে স্কটিশ চার্চ কলেজিয়েট স্কুলের পাশে ২২ নম্বর ঈশ্বর মিত্র লেনে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পরিবারের আদি নিবাস ২৪ পরগণার কাঁড়োপাড়ার সন্নিকটে বড়োজাগুলিয়া গ্রামে। তাঁর বাবা সুরেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন পূর্ব ভারতীয় রেলওয়ের হিসাবরক্ষক এবং মা আমোদিনী দেবী ছিলেন আলিপুরের মতিলাল রায়চৌধুরীর কন্যা। সত্যেন্দ্রানাথ বসু সাত ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন।

তিনি ছিলেন একজন বাঙালী পদার্থবিজ্ঞানী। তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র ছিল গাণিতিক পদার্থ বিজ্ঞান। আইনস্টাইনের সমসাময়িক বিজ্ঞানী ছিলেন সত্যেন বোস, তাঁরা এক সাথে গবেষণা করেন বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয় নিয়ে, যা সাড়া পরেছিলো গোটা দুনিয়ায়। যে আবিষ্কারের কারনে বিজ্ঞান অনেক দুর এগিয়েছিলো তা হলো বোসন কণা। এমনকি এই বোসন কণার সাথে বিজ্ঞানী আইনস্টাইনও অনেক মৌলিক বিষয় যুক্ত করেন যার নামকরন করা হয় বসু-আইনস্টাইন সংখ্যায়ন। হিগসবসোন কণা আবিস্কারের পর তার নাম নিয়ে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী সত্যেন্দ্রনাথ কর্মজীবনে যুক্ত ছিলেন তিন শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কলকাতা, ঢাকা ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, মাদাম কুরী প্রমুখ মণীষীর সান্নিধ্য পেয়েছেন। আবার অনুশীলন সমিতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সশস্ত্র বিপ্লবীদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগও রাখতেন তিনি। তিনি শুধুমাত্র বাংলায়  বিজ্ঞানচর্চার প্রবল সমর্থকই ছিলেন না, সারা জীবন ধরে তিনি বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার ধারাটিকেও জারি করে গেছেন। এই প্রসঙ্গে তাঁর অমর উক্তি, “যাঁরা বলেন বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা হয় না, তাঁরা হয় বাংলা জানেন না, নয় বিজ্ঞান বোঝেন না।” বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার প্রসারের উদ্দেশ্যে বিজ্ঞান পরিচয় নামে একটি পত্রিকাও প্রকাশ করেন তিনি। ব্যক্তিজীবনে সত্যেন্দ্রনাথ ছিলেন নিরলস, কর্মঠ ও মানবদরদী মণীষী। বিজ্ঞানের পাশাপাশি সঙ্গীত ও সাহিত্যেও ছিল তাঁর আন্তরিক আগ্রহ ও বিশেষ প্রীতি।এক কথায় তিনি ছিলেন একজন মানবিক মানুষ।

কিন্তু দুঃখের বিষয় আইনস্টাইন আমাদের কাছে যতটা পরিচিত,  সত্যেন্দ্রনাথ বসু ততটা পরিচিত নন। আমাদের প্রজন্ম দূরের আইনস্টাইকে চিনে কিন্তু কাছের সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে চিনেনা। এর কারণ প্রচারমাধ্যমে আইনস্টাইন সুযোগ পেয়েছেন সত্যেন্দ্রনাথ বসুর চেয়ে বেশি। এ ছাড়া স্বদেশী বিজ্ঞানসাধকের প্রতি আমাদের উৎসাহ খুবই কম। এটা আমাদেরই দীনতা।জাতি হিসেবে আমরা কখনই নিজেদের মেধাকে মূল্যায়ন করতে শিখিনি। তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের কিছু কিছু বিষয়ে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর অবদান আইনস্টাইনের অবদানের চেয়ে বেশি।

তিনি ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দের ৪ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় মৃত্যু বরণ করেন।

01 February 2019

আজ কবি ও সাংবাদিক যতীন্দ্রমোহন বাগচীর ৭০তম মৃত্যুবার্ষিকী। ওঁনার প্রতি রইলো আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

আজ যতীন্দ্রমোহন বাগচীর ৭০তম মৃত্যুবার্ষিকী। যতীন্দ্রমোহন বাগচী ছিলেন একজন বাঙালি কবি ও সাংবাদিক। ওঁনার প্রতি রইলো গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

আজ ১লা ফেব্রুয়ারি 'কাজলা দিদি' কবির প্রয়াণদিবস। যতীন্দ্রমোহন বাগচীর নাম করলেই তার 'কাজলা দিদি' কবিতাটির মনে পড়ে যায়। এই কবিতাটি সকলের মন স্পর্শ করে। এ কবিতাটি পড়ে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বলেছিলেন, ‘কাজলা দিদি কবিতাটি সোনার অক্ষরে ছাপানো উচিত ছিল।’

 ‘বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই-
মাগো, আমার শোলক-বলা কাজলা দিদি কই?
পুকুর ধারে, নেবুর তলে থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে-
ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, একলা জেগে রই;
মাগো, আমার কোলের কাছে কাজলা দিদি কই?
সেদিন হতে দিদিকে আর কেনই-বা না ডাকো,
দিদির কথায় আঁচল দিয়ে মুখটি কেন ঢাকো?
খাবার খেতে আসি যখন দিদি বলে ডাকি তখন,
ও-ঘর থেকে কেন মা আর দিদি আসে নাকো?
আমি ডাকি-তুমি কেন চুপটি করে থাকো?'

২৭ নভেম্বর, ১৮৭৮ সালে তিনি নদীয়া জেলার জমশেরপুরে জমিদার পরিবারে (বর্তমান বাগচী জমশেরপুর) জন্মেছিলেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস হুগলির বলাগড় গ্রামে।

যতীন্দ্রমোহন বাগচী পড়াশোনা শুরু বহরমপুরের খাগড়ায় মিশনারি স্কুলে। শৈশব থেকেই ছিলেন খুব মেধাবী। বই পড়ায় ছিল তার খুব আগ্রহ। পরে তিনি ভর্তি হন কলকাতার হেয়ার স্কুলে। তিনি তাঁর প্রথম ডিগ্রি কলকাতার ডাফ কলেজ (স্কটিশ চার্চ কলেজ) থেকে নিয়েছিলেন।

যতীন্দ্রমোহন বাগচী খুব অল্প বয়স থেকেই কাব্যচর্চা শুরু করেন। কবিতায় তার হাতেখড়ি স্কুলজীবনেই। একদিন যখন জানতে পেলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আর নেই তখন তার কবি কিশোর মন বেদনায় ভরে যায়। তখন তিনি  বিদ্যাসাগর স্মরণে একটি কবিতা লেখেন। বিদ্যাসাগরের মৃত্যুতে যতীন্দ্রমোহনের স্কুলের শোকসভায় পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র যতীন্দ্রমোহন সাহস করে বিদ্যাসাগরকে নিয়ে লেখা জীবনের প্রথম কবিতাটি পাঠ করলে সবাই অবাক হয়ে যান। উপস্থিত অনেকের চোখ জলে ভরে ওঠে। তেরো বছর বয়সের লেখা সেই রচনাটিই যতীন্দ্রমোহনের প্রথম মুদ্রিত কবিতা বলে জানা যায়। এখান থেকে তার লেখক জীবন শুরু।

ছাত্রাবস্থা থেকেই ঠাকুর বাড়ির বিখ্যাত সাহিত্যপত্রিকা ‘ভারতী’ এবং সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত ‘সাহিত্য’ পত্রিকায় যতীন্দ্রমোহনের কবিতা একের পর এক প্রকাশিত হতে থাকলে তিনি কবি হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। গ্রাম্য প্রকৃতির সৌন্দর্য ও গ্রাম্য জীবনের সুখ-দুঃখের কথা তিনি দক্ষতার সঙ্গে প্রকাশ করেন। কাজলা দিদি ও অন্ধবন্ধু তাঁর দুটি বিখ্যাত কবিতা।

যতীন্দ্রমোহন ছিলেন রবীন্দ্রোত্তর যুগের সফল কবিদের অন্যতম। সেই যুগে রবীন্দ্রনাথের ভক্তের তুলনায় নিন্দুকের সংখ্যা ছিল অনেক বেশী। তখন যতীন্দ্রমোহনের মতো সাহসী তরুন বুদ্ধিজীবি রবীন্দ্রনাথের জয়গান করে প্রকৃত আধুনিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁর কবিতার প্রকৃতির উপস্থাপন ও সৌন্দর্যবয়ান জীবনানন্দ দাশ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে সঙ্গতিশীল। অবশ্য এ কথা খুবই স্পষ্ট যে, যতীন্দ্রমোহন বাগচী সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দ্বারা। তাঁর প্রভাব ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠলেও সম্পূর্ণভাবে তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতাকে এড়াতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথের বয়স যখন চল্লিশের নিচে তখন থেকে ত্রিশ বৎসরকাল ধরে যতীন্দ্রমোহন রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যসাধনা , সামাজিক চিন্তা , সাহিত্যের চিন্তা ও গতিবিধির পুংখানুপুংখ সংবাদ রাখেন । যতীন্দ্রমোহন বহুবার কবির সাহচর্যও লাভ করিয়াছিলেন, তাঁর গৃহে বহুবার আতিথ্যগ্রহণ করেছেন, নিজগৃহেও রবীন্দ্রনাথকে বহুবার আমন্ত্রণ করে এনেছিলেনন । রবীন্দ্রনাথ যে-সব সংঘ, সংসদ ও সভা-সমিতির পরিচালনা করতেন, সে সব সম্মেলনে যতীন্দ্রমোহন উপস্থিত থাকতেন। রবীন্দ্র প্রতিভার সব কিছু  কবির নখদর্পনে ছিল।  সেকালের সর্বপ্রকার সাহিত্যিক গোষ্ঠী, সংসদ, অনুষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যতীন্দ্রমোহনের ঘনিষ্ঠ সংযোগ ছিল । সেকালের প্রথম শ্রেণীর প্রত্যেক সাময়িকপত্রে যতীন্দ্রমোহনের রচনা প্রকাশিত হত ।  যতীন্দ্রমোহনই সেকালের বঙ্গসাহিত্যের সর্বাঙ্গীন পরিচয় দানের অনন্যসাধারণ অধিকারী।
প্রাবন্ধিক যতীন্দ্রমোহনের সঙ্গে কবি যতীন্দ্রমোহন মিলিত হয়েই সৃষ্ট হয় এক নতুন রীতির প্রবন্ধ তাঁর কলমে।  ‘রবীন্দ্রনাথ ও যুগসাহিত্য’ তাঁর বিশেষ একটি গদ্য গ্রন্থ। রবীন্দ্রচর্চার ইতিহাসে একটি মূল্যবান গ্রন্থ। রবীন্দ্র সান্নিধ্য ও তাঁর পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের সঙ্গে সঙ্গে তৎকালীন বাংলা সাহিত্যের বহু তথ্য সম্বলিত এই গ্রন্থ উনিশ-বিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের এক অনাবিষ্কৃত দলিল হয়ে আজও বিরাজমান । তাকে রবীন্দ্র পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের একজন প্রধান সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচনা করে হয়।

যতীন্দ্রমোহন বাগচী শিক্ষাজীবন শেষে নদীয়ার জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব নেন। জমিদারিতে তার মন বসল না। পরে কয়েক জায়গায় চাকরি করেন।

সাহিত্য জীবনে তিনি বহু পত্রিকায় গঠনমূলক অবদান রেখেছেন। তিনি মানসী, বঙ্গদর্শন, সাহিত্য, ভারতী, প্রবাসী, সাধনা, সবুজপত্র, মর্মবাণী, পূর্বাচল, যমুনা ইত্যাদি পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে  লিখেছেন।

যতীন্দ্রমোহন ব্যক্তিজীবনে ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল ও রসিক মানুষ। তিনি ছিলেন গীতিকার। তাৎক্ষণিক গান রচনা করে সুর দেওয়ায় ছিলেন পারদর্শী। ‘কাজলা দিদি’ ও ‘অন্ধবন্ধু’ তার দুটি বিখ্যাত কবিতা।
যতীন্দ্রমোহন বাগচীর অনান্য উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলো হলো লেখা, কেয়া, বন্ধুর দান, জাগরণী, নীহারিকা প্রভৃতি।

১৯৪৮ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি দূর আকাশের তারার মধ্যে মিশে যান কবি ও সাংবাদিক যতীন্দ্রমোহন বাগচী। কবির প্রতি রইলো গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

31 January 2019

আজ ৩১শে জানুয়ারী, শিবনাথ শাস্ত্রীর ১৭১তম জন্মবার্ষিকী। চিন্তাবিদ, সাহিত্যিক, শিক্ষাব্রতী, সমাজ-সংস্কারক, পন্ডিত এবং ব্রাহ্মধর্ম প্রচারক হিসেবে তিনি ছিলেন সমধিক পরিচিত।


আজ ৩১শে জানুয়ারী, শিবনাথ শাস্ত্রীর ১৭১তম জন্মবার্ষিকী। চিন্তাবিদ, সাহিত্যিক, শিক্ষাব্রতী, সমাজ-সংস্কারক, পন্ডিত এবং ব্রাহ্মধর্ম প্রচারক হিসেবে তিনি ছিলেন সমধিক পরিচিত। আসুন আজকের দিনে ওঁনার সম্বন্ধে কিছু তথ্য জেনে নি।

সমাজ উন্নয়নের ধারায় তাঁর অবদান আজো গভীয় শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। উনিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ এবং উজ্জ্বল আলোকিত মানুষ শিবনাথ শাস্ত্রী। ১৮৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩১শে জানুয়ারি দক্ষিণ চবিবশ পরগনার চাংড়িপোতা গ্রামে (বর্তমানে সুভাষগ্রাম নামে পরিচিত) মামার বাড়ীতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হরানন্দ ভট্টাচার্য আর মাতা কামিনী ভট্টাচার্য। উনিশ শতকের আরেক আলোকিত মানুষ, বিশিষ্ট সমাজ-সংস্কারক, সোমপ্রকাশ পত্রিকার সম্পাদক দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ ছিলেন তাঁর মামা। শৈশব-কৈশোরে মামার বাড়ীতেই থাকতেন শিবনাথ এবং মামার আদর্শেই তিনি বড় হতে থাকেন। মামা দ্বারকানাথ শিবনাথকে খুব ভালোবাসতেন এবং আপন আদর্শে তাঁকে বড় করে তুলতে থাকেন।শৈশব- কৈশোরেই নানা বিষয়ে তিনি কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। অন্য বালকদের মতো খেলাধুলায় তেমন মন ছিল না শিবনাথের, বরং মামার তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন বিষয়ের গ্রন্থপাঠে আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি।

শিবনাথ শাস্ত্রীর পৈতৃক নিবাস ছিল চবিবশ পরগনার মজিলপুর গ্রামে। মজিলপুর পাঠশালায় তাঁর বাল্যশিক্ষা আরম্ভ হলেও তিনি সেখানে বেশিদিন পড়ালেখা করেননি। মামাবাড়ির প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল তীব্র। এ-কারণে মামা দ্বারকানাথের তত্ত্বাবধানেই
শেষ হয় তাঁর বাল্যের পাঠ। অতঃপর মামার ইচ্ছানুসারে শিবনাথ ভর্তি হলেন সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুলে। কলেজিয়েট স্কুলের পাঠ শেষ হলে শিবনাথ ভর্তি হন কলকাতার বিখ্যাত সংস্কৃত কলেজে। সংস্কৃত কলেজ থেকে ১৮৭২ সালে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে তিনি এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এমএ পরীক্ষায় ভালো ফল লাভ করায় তিনি অর্জন করেন ‘শাস্ত্রী’ উপাধি। অতঃপর পারিবারিক পদবি ভট্টাচার্যের পরিবর্তে তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘শাস্ত্রী’ উপাধি এবং তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন শিবনাথ শাস্ত্রী নামে।

উনিশ শতকের মধ্যপাদে কলকাতা শহরে ব্রাহ্মধর্ম ব্যাপকভাবে বিকশিত হয়। সে-সময়ে শিক্ষিত যুবকদের পক্ষে ব্রাহ্মধর্মের প্রভাব এড়ানো সম্ভব ছিল না। শিবনাথও ব্রাহ্মধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। তাঁর বাবা হরানন্দ ছিলেন রক্ষণশীল গোঁড়া ব্রাহ্মণ। কাজেই ছেলের ব্রাহ্মধর্মপ্রীতি তিনি ভালো চোখে দেখলেন না। সে সময়টায় ছিল ব্রাহ্মধর্মের জোয়ার। ব্রাহ্মধর্মের প্রভাব এড়ানো শিক্ষিত যুবকদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। শিবনাথও ছাত্রজীবনে ব্রাহ্মসমাজ ও ব্রাহ্ম- আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়লেন। ১৮৬৯ সালের ২২ আগস্ট শিবনাথ আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেন। উপবীত ও মূর্তিপূজা ত্যাগ করেন শিবনাথ, ছেদ করেন পরিবারের সঙ্গে সকল সম্পর্ক। ক্রমে শিবনাথ ব্রাহ্মসমাজের নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হন। ইতোমধ্যে ১৮৬৮ সালে ব্রাহ্ম-আন্দোলনের নেতা কেশবচন্দ্র সেন  প্রতিষ্ঠা করেন Indian Reforms Association। এ সংস্থার উদ্দেশ্য ছিল মদ্যপান নিবারণ, শিক্ষা প্রসার, সুলভ সাহিত্য ও কারিগরি
জ্ঞানের প্রচার, নারীশিক্ষা তথা নারীমুক্তি। এসব আদর্শের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করে শিবনাথ যোগ দেন Indian Reforms Association-এ। শিবনাথ কেশবচন্দ্রের প্রধান সহযোগী হিসেবে এসময় সমাজ সংস্কারমূলক অনেক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। নারীশিক্ষার পক্ষে তিনি গ্রহণ করেন দৃঢ় অবস্থান, বিধবাদের বিয়ের পক্ষে তিনি উচ্চারণ করেন জোরালো বক্তব্য। কেশবচন্দ্রের অনুপ্রেরণায় এসময় শিবনাথ মদ্যপান নিবারণ এবং শিক্ষা- সাহিত্য-কারিগরি বিদ্যা প্রচারে বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেন। সমাজে মদ্যপানের ভয়াবহতা দেখে তিনি ক্ষুব্ধ হন। তরুণ সমাজকে মদ্যপানের ছোবল থেকে রক্ষা করার মানসে তিনি প্রকাশ করেন মদ না গরল শীর্ষক পত্রিকা।
শিবনাথ শাস্ত্রী, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, আনন্দমোহন বসু প্রমুখের উদ্যোগে ১৮৭৬ সালে গঠিত হয় Indian Association’। এই সংস্থাই হলো ভারতীয় রাজনীতির প্রথম সংঘবদ্ধ প্রয়াস। এই সংস্থার অনুপ্রেরণাতেই ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। দেশের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় ১৮৭৭ সালে শিবনাথ শাস্ত্রী গঠন করেন ‘গুপ্ত বৈপ্লবিক সমিতি’। এই সংস্থার প্রধান কর্মসূচি ছিল – জাতিভেদ অস্বীকার, সরকারি চাকরি প্রত্যাখ্যান, সমাজে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা, অশ্বারোহণ ও বন্দুক চালনা শিক্ষা, জাতীয়তামূলক ও সমাজ সংস্কারমূলক শিক্ষা এবং পূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা। এসব উদ্দেশ্য থেকেই শিবনাথ শাস্ত্রীর রাজনৈতিক চেতনার পরিচয় পাওয়া যায়।

শিবনাথ শাস্ত্রী বেশ কিছুদিন শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৮৭৪ সালে শিবনাথ শাস্ত্রী দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরস্থ সাউথ সুবার্বন স্কুলের প্রধান শিক্ষক পদে যোগ দেন। দুবছর পর সাউথ সুবার্বন স্কুল ছেড়ে তিনি যোগ দেন হেয়ার স্কুলে, সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক রূপে। এ সময় মামা দ্বারকানাথ শিবনাথ শাস্ত্রীর ওপর হরিনাভী স্কুল পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেন। শিক্ষা ক্ষেত্রের সকল দায়িত্বই তিনি পরম নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করেন। তাঁর দক্ষ পরিচালনায় উল্লিখিত স্কুলগুলোতে পঠন-পাঠনে ইতিবাচক নানা পরিবর্তন সূচিত হয়। রাজনৈতিক কারণে ১৮৭৮ সালে হেয়ার স্কুলের শিক্ষকতার চাকরি থেকে তিনি স্বেচ্ছায় ইস্তফা গ্রহণ করেন।

শিবনাথ শাস্ত্রীর বর্ণাঢ্য ও উজ্জ্বল কর্মজীবনের এক গৌরবজনক অধ্যায় তাঁর সাংবাদিক-জীবন। মামা দ্বারকানাথ- প্রতিষ্ঠিত সোমপ্রকাশ পত্রিকার সঙ্গে তিনি নানাভাবে জড়িত ছিলেন। দ্বারকানাথের ব্যস্ততার কারণে দুবছর শিবনাথ শাস্ত্রীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সোমপ্রকাশ পত্রিকা। বস্ত্তত, দ্বারকানাথই ছিলেন শিবনাথের সাংবাদিক জীবনের প্রধান অনুপ্রেরণা। ১৮৮৩ সালে শিবনাথ শাস্ত্রীর সম্পাদনায় ব্রাহ্মসমাজের পক্ষ থেকে সখা নামে ভারতের প্রথম কিশোর মাসিক প্রকাশিত হয়। অভিন্ন সময়ে তত্ত্বকৌমুদী (১৮৮২) এবং ইন্ডিয়ান মেসেজ (১৮৮৩) নামে দুটি ক্ষণস্থায়ী পত্রিকা সম্পাদনা করেন শিবনাথ শাস্ত্রী। ১৮৯৫ সালে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় বিখ্যাত কিশোর মাসিক মুকুল। বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্য বিকাশে এই পত্রিকা পালন করে ঐতিহাসিক ভূমিকা। উল্লিখিত
পত্রিকাসমূহ সম্পাদনায় শিবনাথ শাস্ত্রী বিশেষ দক্ষতা ও কৃতিত্বের পরিচয় দেন।

রামমোহন রায় প্রবর্তিত ব্রাহ্মধর্মের দুই প্রধান কান্ডারি ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর  এবং কেশবচন্দ্র সেন। প্রথম দিকে দেবেন্দ্রনাথ ও কেশবচন্দ্রের মধ্যে ছির দারুণ সখ্য। ব্রাহ্মসমাজের উপাসনা সভায় তাঁরা বসতেন পাশাপাশি। কিন্তু ১৮৭০-এর দশকে তাঁদের দুজনের সম্পর্কে চিড় ধরে। ব্রাহ্ম হলেও দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন অনেকটা প্রাচীনপন্থী। হিন্দুধর্মের আচার-অনুষ্ঠান অনেকটাই পালন করেন তিনি, ছেলেমেয়েদের বিয়ে দেন হিন্দুমতে, ব্রাহ্মণদের উপবীত ধারণে অনুমতি দেন। পক্ষান্তরে কেশবচন্দ্র অনেক বেশি আধুনিক ও বিপ্লবী। ব্রাহ্মধর্মকে তিনি হিন্দুধর্ম থেকে একেবারে আলাদা করতে চান। তাঁর মতে, ব্রাহ্মরা অ-হিন্দু। হিন্দুধর্মের সকল প্রচার কুসংস্কারমূলক আচার- অনুষ্ঠান বর্জনের তিনি পক্ষপাতী। ক্রমে এই দুই ব্রাহ্ম-নেতার বিরোধ ধারণ করে চরম রূপ। এসময় ব্রাহ্ম ধর্মসভায় নারীদের প্রকাশ্য স্থানে উপাসনা করার পক্ষে ও বিপক্ষে মত প্রকাশে দেখা দেয় নতুন বিতর্ক। এ বিতর্কের সূত্র ধরেই ১৮৭৮ সালে ভেঙে যায় ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ। এ সময় শিবনাথ শাস্ত্রীর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ’ (১৮৭৮)। অন্যদিকে কেশবচন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন ‘নববিধান ব্রাহ্মসমাজ’ (১৮৭৮)। দেবেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে ছিল ‘আদি ব্রাহ্মসমাজ’। সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে শিবনাথ শাস্ত্রী এসময় পালন করেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। তাঁর নেতৃত্বগুণে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ দ্রুত কলকাতার সমাজজীবনে প্রভাব বিস্তারে সমর্থ হয়। ধর্ম প্রচার ছাড়াও সমাজ সংস্কার ও রাজনৈতিক সংস্কার ছিল সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের প্রধান কর্মসূচি। সমগ্র ভারতবর্ষ ভ্রমণ করে শিবনাথ শাস্ত্রী সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের আদর্শ প্রচার করেন।

ইতোপূর্বেই শিক্ষাব্রতী হিসেবে শিবনাথ শাস্ত্রীর খানিকটা পরিচয় আমরা জেনেছি। এ প্রসঙ্গে তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত সিটি স্কুলের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে ১৮৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্কুল পরবর্তিকালে  সিটি কলেজে রূপান্তরিত হয়। সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজে উনিশ-বিশ শতকের বহু আলোকিত মানুষ বিদ্যা লাভ করেন। সিটি স্কুল প্রতিষ্ঠায় শিবনাথ শাস্ত্রী তাঁর ঘনিষ্ঠ দুই বন্ধু আনন্দমোহন বসু এবং সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামীর সহযোগ লাভ করেন। অভিন্ন উদ্দেশ্যে এঁরা প্রতিষ্ঠা করেন ‘স্টুডেন্ট সোসাইটি’ (১৮৭৯)। বস্ত্তত এটিই
হলো ভারতবর্ষের প্রথম ছাত্রসংগঠন।

১৮৮৮ সালে শিবনাথ শাস্ত্রী ইংল্যান্ড গমন করেন। ভারতবর্ষ ও ইংল্যান্ডের সমাজকে তুলনামূলক দৃষ্টিতে বিচার করার মানসেই তাঁর বিলেত গমন। ছয় মাস তিনি বিলেতে প্রবাসজীবন যাপন করেন। এ সময় তিনি ইংল্যান্ডের নানা স্থানে ভারতবর্ষের সমাজ ও সংস্কৃতি, বিশেষত ব্রাহ্মধর্ম বিষয়ে বহু বক্তৃতা দেন এবং অর্জন করেন প্রচুর প্রশংসা। ইংল্যান্ড ভ্রমণ শিবনাথ শাস্ত্রীর মনে গভীর রেখাপাত করে। ইংরেজদের মধ্যে তিনি লক্ষ করলেন বহু সদ্গুণ। দেশে প্রত্যাবর্তন করে ওই সদ্গুণের চর্চা করার মানসে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘সাধনাশ্রম’। জনগণের মধ্যে উচ্চ আদর্শ ও সদ্গুণ প্রচারে সাধনাশ্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলা সাহিত্যের একজন খ্যাতিমান লেখক হিসেবে শিবনাথ শাস্ত্রীর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। সমাজ সংস্কারমূলক বিচিত্র কাজে ব্যস্ত থাকলেও তিনি
সাহিত্যসৃজনেও ছিলেন সমান উৎসাহী ও আন্তরিক। তাঁর লেখা কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ইতিহাস, আত্মজীবনী বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। শিবনাথ শাস্ত্রী যেসব কাব্য প্রকাশ করেন, তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য – নির্বাসিতের বিলাপ , পুষ্পমালা, হিমাদ্রি কুসুম, পুষ্পাঞ্জলি, ছায়াময়ী,পরিণয় ইত্যাদি। নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা শিবনাথ শাস্ত্রীর কবিতার বিশিষ্ট লক্ষণ। সহজ-সরল হৃদয়বাণী গুণে শিবনাথের কবিতা সমকালে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিল। বাংলা উপন্যাস সাহিত্যের ধারায় শিবনাথ শাস্ত্রীর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান।একটি বিশিষ্ট আদর্শ তাঁর ঔপন্যাসিক চেতনায় সর্বদা থেকেছে ক্রিয়াশীল। নারীজীবনকে তিনি সমাজে-সংসারে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন স্বমহিমায়। প্রাকৃতিক লৈঙ্গিক পরিচয়ে না দেখে সামাজিক লৈঙ্গিক দৃষ্টিকোণে নারীকে বিবেচনার প্রাথমিক আভাস শিবনাথ শাস্ত্রীর উপন্যাসে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। শিবনাথ শাস্ত্রীর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে আছে মেজবৌ, নয়নতারা, যুগান্তর, বিধবার ছেলে ইত্যাদি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, তাঁর যুগান্তর উপন্যাস থেকেই উত্তরকালীন বিখ্যাত সংবাদপত্র যুগান্তরের নামকরণ করা হয়েছিল। উপন্যাসে ভাষা-ব্যবহারে শিবনাথ শাস্ত্রী ছিলেন অতিসতর্ক। কলকাতার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের কথ্যভাষা ব্যবহার তাঁর উপন্যাসের একটি বিশিষ্ট লক্ষণ। বাংলা উপন্যাস সাহিত্যের বিকাশের ধারায় শিবনাথ শাস্ত্রীর অবদান যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে এখনো মূল্যায়িত হয়নি।
প্রাবন্ধিক হিসেবেও শিবনাথ শাস্ত্রী রেখে গেছেন তাঁর সৃষ্টিক্ষম প্রজ্ঞার স্বাক্ষর। সমাজ সম্পর্কে প্রগতিশীল দৃষ্টিই তাঁর প্রবন্ধ- সাহিত্যের উপজীব্য বিষয়। হিন্দু ধর্মের নানামাত্রিক কুসংস্কার থেকে তিনি সমাজকে মুক্ত করার মানসে একের পর এক প্রবন্ধ লিখেছেন। শিবনাথ শাস্ত্রীর উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থগুলো হচ্ছে – এই কি ব্রাহ্ম বিবাহ?, খৃষ্টধর্ম, জাতিভেদ, বক্তৃতা স্তবক , মাঘোৎসব উপদেশ, মাঘোৎসব বক্তৃতা, প্রবন্ধাঞ্জলি, ধর্মজীবন  ইত্যাদি। ব্রাহ্মধর্মের তিন প্রধান তাত্ত্বিকের জীবনী লিখেছেন শিবনাথ শাস্ত্রী। তাঁর জীবনী
গ্রন্থগুলো হচ্ছে রামমোহন রায়, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ এবং ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র। ১৯১৮ সালে প্রকাশিত হয় শিবনাথ শাস্ত্রীর আত্মজীবনী আত্মচরিত। তাঁর আত্মচরিত পাঠ করলে গোটা উনিশ শতক পাঠকের চোখে ভেসে উঠবে। ১৯০৪ সালে প্রকাশিত হয় শিবনাথ শাস্ত্রীর কালজয়ী গ্রন্থ রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ, যা ইতিহাসের এক উল্লেখযোগ্য দলিল হিসেবে উত্তরকালে স্বীকৃতি লাভ করেছে। ইংরেজি ভাষাতেও শিবনাথ শাস্ত্রী কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর দুটি উল্লেখযোগ্য ইংরেজি গ্রন্থ – History of the Brahma Samaj এবং MenI have seen।

১৯১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর শিবনাথ শাস্ত্রী কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।