22 March 2019

ভারতের বিপ্লবী মাষ্টারদা সূর্য সেনের ১২৫তম জন্ম বার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।


বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবের ইতিহাসে মাষ্টারদা সূর্য সেনের নাম ভারতবাসীরা চিরদিন মনে রাখবে। ব্রিটিশ ভারতের এই বিপ্লবী ১৯৩০ সালের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন-সহ অনেক  বিপ্লবের কান্ডারী ছিলেন। মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বেই কিছুকালের জন্য বাংলার এক নিভৃত স্থানে বাঙালির স্বাধীনতার পতাকা উড়েছিল। পুরো নাম সূর্যকুমার সেন। তবে মাষ্টারদা নামে সবার কাছে পরিচিত ছিলেন। ওঁনার স্মরণে কলকাতার কলেজ স্কোয়ারের পাশ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাটির নাম হয়েছে সূর্য সেন স্ট্রীট। তাছাড়া বাঁশদ্রোনী এলাকার মেট্রো স্টেশনের নাম হয়েছে মাস্টারদা সূর্য সেন। 
মাস্টারদা সূর্য সেন ১৮৯৪ সালের ২২শে মার্চে চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানার নোওয়াপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বহরমপুর কলেজে পড়ার সময় তিনি বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। চট্টগ্রামে ফিরে তিনি গণিতের শিক্ষক হিসেবে ওরিয়েন্টাল স্কুলে শিক্ষকতা গ্রহণ করেন এবং সেখানে ছাত্রসমাজ ও যুবসমাজের মধ্যে বিপ্লবী অন্দোলনের প্রচারের মাধ্যমে শক্তিশালী বিপ্লবী সংগঠন তৈরী করেন। সকলের প্রতি তাঁর দরদ ছিল অপরিসীম এবং খুব শীঘ্রই তিনি সকলের শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে উঠে মাস্টারদা নামে পরিচিতি হন।
মাস্টারদা সূর্য সেন ১৯২১ সালে  গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই অহিংস আন্দোলন এক বৎসরের ভিতর ভারতের স্বারজ আনতে ব্যর্থ হলে, বিপ্লবীরা আবার সশস্ত্র বিপ্লবের পথ বেছে নেন।  
১৯২৩ সালে ২৪ই ডিসেম্বর চট্টগ্রাম শহরে একপ্রান্তে  পাহাড়ী এলাকায় পুলিশের সাথে খন্ডযুদ্ধে  মৃতপ্রায় মাস্টারদা ও অম্বিকা চক্রবর্তী পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। পরে পুলিশ হাসপাতালে তাঁদের চিকিৎসা করার পর তাঁরা সুস্থ হয়ে ওঠেন। এঁদের বিরুদ্ধে পুলিশ ডাকাতির মামলা রুজু করেছিল হয়েছিল। যতীন্দ্র মোহন এই মামলা পরিচালিত করেন এবং প্রায় ৯ মাস কারাবন্দি থাকার পর প্রমাণাভাবে তাঁরা মামলা থেকে তাঁরা খালাস পান।

১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের নোয়াপাড়ায় একটি অস্ত্রলুটের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় মাস্টারদার নাম শোনা যায়। বিপ্লব আন্দোলন সংগঠিত করতে পুলিশের চোখ এড়িয়ে তাঁকে প্রায়ই কলকাতায় এসে শোভাবাজারে বিপ্লবীদের আস্তানায় উঠতেন। ১৯২৫ সালের ১০ই নভেম্বর সেখানে পুলিশ হানা দেয়। পুলিশ শোভাবাজারে মাস্টারদাকে ধরতে গেলে তিনি গামছা পরে চাকরের বেশে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে যান। 
এর প্রায় একবছর পর ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের ৮ অক্টোবর কলকাতার আমহার্স্ট স্ট্রিটের এক মেস থেকে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় 'মুরারিপুকুর ষড়যন্ত্র মামলা'। এ মামলায় ১৯২৮ সাল পর্যন্ত  তাঁকে মেদিনীপুর প্রেসিডেন্সি জেল, পুনার রায়েরোড়া জেল ও বম্বের রত্নগিরি জেলে কারাবাস করতে হয়।

১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রামে ফিরে এসে তিনি চট্টগ্রামের বিপ্লবী সংগঠনে তাঁদের গোপন বৈঠকে চূড়ান্ত সংগ্রামের এক পরিকল্পনা করেন। মাস্টারদা স্বীয় কর্মপন্থাকে কার্যকরী করার জন্য ছক তৈরী করে ফেলেন। এর চূড়ান্ত রূপ লাভ করে ১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিল গুডফ্রাইদের দিনে যখন ইংরেজরা বিভিন্ন আনন্দ উৎসবে মত্ত থাকে। মোট ৬৫ জন বিপ্লবী যোদ্ধা নিয়ে পাঁচ প্রকার কর্মসূচী গ্রহণ করেছিলেন। ১) পুলিশ ঘাঁটি দখল করে অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়া ২) চট্টগামের সৈন্যবাহিনীর অস্ত্রাগার ঘাঁটি ধ্বংস করে অস্ত্র লুট করা ৩) কলকাতা ও ঢাকার সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করা ৪) চট্টগ্রামের সাথে  রেল ও টেলিগ্রাফ সংযোগ বন্ধ করা ৫) ইউরোপিয়ান ক্লাবগুলো আক্রমণ করে ইংরেজদের বন্দি করা। সিন্ধান্ত অনুযায়ী কাজও চলল। রাত ১০টা নাগাদ চট্টগাম অস্ত্রাগারে বেশ কিছুক্ষণ খন্ডযুদ্ধ চলে এবং অস্ত্র লুট করে গাড়ী বোঝাই করে বিপ্লবীরা পুলিশ ব্যারাক ও টেলিফোন এক্সচেঞ্জে আক্রমণ চালায়। এই অতর্কিত আক্রমণে মোট ১১ জন পুলিশ নিহত হয়। অল্প সময়ের মধ্যে সব বিপ্লবীরা পুলিশ ব্যারাকে সমবেত হন। মাস্টারদাকে অধিনায়ক করে এক অস্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয় যা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায়। 
এই সময় শহরের অপর প্রান্ত থেকে কিছু ব্রিটিশ সৈন্য বিভ্রান্তি অবস্থার মধ্য থেকেও ডবল মুরিং জেটিতে রক্ষিত স্বয়ংক্রিয় ম্যাশিনগান থেকে গুলি বর্ষণ শুরু করেছিল। বিপ্লবীরা জানতো স্বয়ংক্রিয় ম্যাশিনগানের বিরুদ্ধে তাঁরা যুদ্ধে পারবেন না। এই আক্রমণের সময় রাত্রের অন্ধকারে অনন্ত সিং, গণেশ ঘোষ, আনন্দগুপ্ত, জীবন ঘোষাল মূল দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। বাকি সদস্যদের নিয়ে  মাস্টারদা সূর্যসেন  পাহাড়ে আশ্রয় নিল। ২২শে ‌এপ্রিল বিকালে  বৃটিশ বাহিনী জালালাবাদ পাহাড়ে অভিযান শুরু করে। ব্রিটিশ সৈন্যরা পাহাড় বেয়ে উঠ আসার সময় বিপ্লবীরা আক্রমণ চালায়। জালালাবাদ যুদ্ধে প্রথম শহীদ হন ১৪ বৎসর বয়সী টেগরা বল। এরপর আগে পরে একে একে বিপ্লবীরা যুদ্ধে প্রাণ হারাতে থাকেন। এই দিনের যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনী জালালাবাদ পাহাড় দখল করতে পারেনি। বিপ্লবীদের নিয়ে  মাস্টারদা সূর্যসেন রাতের অন্ধকারে জালালাবাদ পাহাড় ত্যাগ করেন। 
মাস্টারদা কোয়েপাড়ার বিনয় সেনের বাড়িতে আশ্রয় নেন। এই সময় তাঁর সাথে ছিল অপর বিপ্লবী নির্মল সেন।মাস্টারদা সূর্য সেনের দলের অনেকেই গ্রেফতার হয়েছিলেন। কিন্তু সূর্যসেন ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেলেন। এই সময় তাঁর গ্রেফতারের জন্য পুরস্কার ঘোষণাও করা হয়েছিল। এরই ভিতরে ১৩ জুন পটিয়ার ধলঘাটে সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে বিপ্লবীরা মিলিত হন। এই বাড়িতে তখন ছিলেন সূর্যসেন, নির্মল সেন,  প্রীতিলতা এবং অপূর্ব সেন। সেখানে আচম্বিতে গুর্খা সৈন্য নিয়ে হানা দেয় ক্যাপ্টেন ক্যামেরন। যুদ্ধে ক্যাপ্টেন ক্যামেরন নিহত হয়। পরে প্রীতিলতা ও অপূর্ব সেনকে নিয়ে মাস্টারদা সন্তর্পণে এই বাড়ি ত্যাগ করেন। এই সময় সৈন্যদের গুলিতে অপূর্ব সেন মৃত্যবরণ করেন।    
এরপর  মাস্টারদা সূর্য সেন চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে অবস্থিত ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণের পরিকল্পনা করলেন। এ অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হল প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে। ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে আক্রমণ করা হল ইউরোপীয়ান ক্লাব। সফল আক্রমণ শেষে ফেরার পথে এক ইংরেজ অফিসারের গুলিতে প্রীতিলতা আহত হলেন। ধরা না দেবার প্রত্যয়ে সঙ্গে রাখা সায়ানাইড বিষ পান করে তিনি আত্মাহুতি দিলেন। ভারতের মুক্তিসংগ্রামের প্রথম নারী শহীদের নাম প্রীতিলতা।
মাস্টারদা সূর্য সেন ১৯৩৩ সালে ২রা ফেব্রুয়ারি গৈরালা গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এই সময় ইংরেজ সরকার তাঁর মাথার দাম ধার্য করেছিল দশ হাজার টাকা। মাস্টারদা সূর্য সেনের গোপন অবস্থানের কথা জানতে পেরে ক্যাপ্টেন ওয়ামস্‌লীর নেতৃত্বে একদল গুর্খা সৈন্য মাস্টারদাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। 
বিচারে মাস্টারদার ফাঁসির আদেশ হয়। ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি মধ্য রাতে  ফাঁসির মঞ্চে প্রাণ দেন বাংলার বীর বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেন।  
প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেইল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

আজ ২২শে মার্চ ভারতের বিপ্লবী ও কমিউনিস্ট নেতা মানবেন্দ্রনাথ রায়ের ১৩২তম জন্ম বার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।


ভারতের বিপ্লবী ও কমিউনিস্ট নেতা   মানবেন্দ্রনাথ রায় ১৮৮৭ সালের ২২শে মার্চ পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার আড়বেলিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। ১৯১৬ সাল পর্যন্ত এ নামেই তিনি পরিচিত ছিলেন। তিনি গ্রেফতারি এড়ানোর জন্য সানফ্রান্সিসকোতে মানবেন্দ্রনাথ রায় এই ছদ্মনামটি গ্রহণ করেন। এই বিপ্লবী কমিউনিজমের ধ্যান-ধারণা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন।

মানবেন্দ্রনাথ রায় জাতীয় বিপ্লববাদী দল ‘অনুশীলন সমিতি’র সদস্য ছিলেন। অস্ত্র সংগ্রহের জন্য তিনি পাড়ি দেন বিদেশে। জাপান, চীন হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান।বিপ্লবী জীবনে নানা দেশে ছুটে বেড়িয়েছেন। একসময় তিনি ফিলিপিনস জাপান হয়ে ১৯১৬ সালে নিউইয়র্ক চলে আসেন। এখানেই দেখা হয় লালা লাজপত রায়ের সাথে। এখানে এসে মানবেন্দ্রনাথ মার্কসবাদের সঙ্গে পরিচিত হন এবং মার্কসবাদ চর্চা শুরু করেন। একদিন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একটি সভা শেষ করে ফেরার পথে গ্রেফতার হন। জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর মার্কিন গোয়েন্দাদের চোখে ধুলো দিয়ে মেক্সিকোতে পালিয়ে যান।

১৯১৭ সালে মেক্সিকোতে গিয়ে সমাজবাদী চিন্তা তাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। সেখানকার সমাজবাদী দল সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টিতে যোগ দেন। সেই পার্টির সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন মানবেন্দ্রনাথ রায়। ১৯১৯ সালে রুশ কমিউনিস্ট নেতা লেনিনের দূত মাইকেল বরোদিনের সঙ্গে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের পরিচয় হয়। কমরেড বরোদিনের কাছে রায় মার্কসবাদের শিক্ষা লাভ করেন। ১৯১৯ সালে তিনি সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টিকেই মার্কসবাদী দলে রূপান্তরিত করেন এবং মেক্সিকোর কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের মধ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইরে পৃথিবীর প্রথম কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা হয়। মানবেন্দ্রনাথ রায় ১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর তাসখন্দে প্রবাসী ভারতীয় ও দুজন বিদেশি মহিলাকে নিয়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেন। এই দু জন মহিলাদের মধ্যে একজন ছিলেন মানবেন্দ্রনাথ রায়ের স্ত্রী ইভলিন ট্রেন্ট এবং অন্যজন ছিলেন অবনী মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী রোজা ফিটিনগফ। ১৯২১ সালে তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি আন্তর্জাতিকের অনুমোদন পায়।
১৯২৭ সালের মে মাসে তিনি  চীন দেশে হয়ে তিনি বার্লিন  যান। সেখানে এক বছর কাটান। এ সময় ইভলিন ট্রেন্টের সঙ্গে তার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। মানবেন্দ্রনাথ মস্কোতে ফিরে আসেন।

১৯৩০ সালের ডিসেম্বর মাসে মানবেন্দ্রনাথ  ভারতে চলে আসেন। আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় তিনি শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনকে সংগঠিত করেন। ১৯৩১ সালের ২১ জুলাই বোম্বের এক হোটেল থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় পুলিশ তার বিরুদ্ধে কানপুর যড়যন্ত্র মামলা (১৯২৪) দায়ের করে। তাঁকে ৬ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।  তিনি জেলখানায় বসে প্রচুর পড়াশোনা এবং লেখালেখি করেন।

১৯৩৬ সালের ডিসেম্বরে মানবেন্দ্রনাথ কংগ্রেসে যোগদান করেন। কিন্তু কংগ্রেসে মার্কসবাদ সুবিধা করতে পারেনি। জনমানুষের তাৎপর্য বুঝে উঠতে পারেনি। যে কারণে গান্ধীর সঙ্গে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের মতপার্থক্যের বিষয়টি আরও প্রকট হয়ে ওঠে। ১৯৪০ সালের অক্টোবরে মানবেন্দ্রনাথ রায় কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করেন। একই বছর ‘লীগ অব র‌্যাডিক্যাল কংগ্রেসমেন’-এর সিদ্ধান্ত হয় লীগের সবাই কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করবেন এবং সংগঠনের নতুন নাম হবে ‘র‌্যাডিক্যাল ডেমোক্রেটিক পিপলস পার্টি’। নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি আন্দোলনের রূপ পাল্টায়। ১৯৪২ সালে কংগ্রেসের ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনের বিরোধিতা করার কারণে মানবেন্দ্রনাথ ও র‌্যাডিক্যালদের অনেক নির্যাতন সহ্য করতে হয়।

মানবেন্দ্রনাথ রায় অসংখ্য প্রবন্ধ লিখেছেন। ১৭টি ভাষায় দক্ষ ছিলেন। তার রচিত ৬৭টি গ্রন্থ ও ৩৯টি পুস্তিকার কথা জানা যায়। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘নিউ হিউম্যানিজম’ (১৯৪৭), মাই মেমোয়ার্স (১৯৫৪), রেভলিউশন অ্যান্ড কাউন্টার রেভলিউশন ইন চায়না, রিজন রোমান্টিসিজম অ্যান্ড রেভলিউশন ইত্যাদি।

মানবেন্দ্রনাথ রায় ১৯৫৪ সালের ২৪-২৫শে জানুয়ারি মধ্যরাতে দেরাদুনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেইল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

20 March 2019

আজ ২০শে মার্চ খ্যাতনামা সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সম্পাদক বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়ের ২৬তম প্রয়াণ দিবসে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় ৩রা জুলাই, ১৯০৪ সালে বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার মাদারীপুরে জন্মগ্রহন করেন। ১৯২৩ সালে ম্যাট্রিক পাশ করে স্কটিশচার্চ কলেজ ভর্তি হন কিন্তু অর্থিক অনটনে কলেজ ছাড়তে হয়।

১৯২৫ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় তার কর্মজীবন শুরু হয়। অর্থসঙ্কটে ভুগতে থাকা ঐতিহ্যবাহী যুগান্তর পত্রিকাকে পূনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়। ১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত তিনি দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। একইভাবে অর্থাভাবে ক্লিষ্ট বসুমতীর সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করে পত্রিকাটিকে সচল করেন।

সাংবাদিকতা ছাড়া যুদ্ধ সংক্রান্ত লেখালিখিতে বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় খ্যাতি লাভ করেন। "জাপানী যুদ্ধের ডায়েরী" এবং "রুশ জার্মান সংগ্রাম" বই দুটি  পাঠক মহলে খুব সমাদৃত হয়। এরপর তিনি "দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ইতিহাস" গ্রন্থটি প্রকাশ করেন। বাংলা ভাষায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিস্তৃত ইতিহাস এর আগে বা পরে বোধ হয় লেখা হয়নি। লেখক তাঁর সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও অনুসন্ধানে বিশ্বযুদ্ধে জড়িত চার্চিল, রুজভেল্ট, স্ট্যালিন, হিটলার ও অনান্য মহানায়কদের ব্যক্তিগত চারিত্রিক বৈশিষ্ঠও দক্ষতার সাথে বর্ণনা করেছেন। এই আসীম সাহসী সাংবাদিক ১৯৫০ সালে যুগান্তর পত্রিকায় পূর্ব পাকিস্তানে ইসলামিক মৌলবাদ দ্বারা অনুষ্ঠিত ভয়াবহতম হিন্দু গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। সে সময় যুগান্তর পত্রিকা প্রায় নিষিদ্ধ হতে চলেছিল এবং সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেবার অভিযোগে বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়ের গ্রেফতারি পরোয়ানা তৈরী হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ঘটনাবলীর ভয়াবহতা স্বীকার করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রেডিওতে বক্তব্য রাখার পর গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকরী হয়নি।

বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর নানা লেখা প্রকাশিত হয়। যেখানে তিনি বাংলাদেশকে ভারতের স্বীকৃতি ও সামরিক সাহায্য দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন। যুগান্তরসহ বিভিন্ন কাগজে মুক্তিযুদ্ধের বিবরন লিখেছিলেন যা তখন বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমন্ত্রণে বাংলাদেশে যান। তিনি ভারত-সোভিয়েত সুহৃদ সংঘের সভাপতি ছিলেন। বিশ্ব শান্তি সংসদের সাথে যুক্ত ছিলেন যুদ্ধবিরোধী সাংবাদিক বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়। আণবিক পরীক্ষার বিরোধীতায় তিনি সম্পাদকীয় লেখেন তেজস্ক্রিয় পুঁইশাক। ১৯৯৩ সালের ২০শে মার্চ তিনি পরলোকগমণ করেন।

বিভিন্ন সময় নানা দেশ বিদেশের পুরষ্কার পান। ১৯৭০ সালে ভারত সরকার তাঁকে তৃতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান পদ্মভূষনে সম্মানিত করেন।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেইল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

16 March 2019

আজ ১৬ই মার্চ, সাহিত্যিক, অনুবাদক, রসায়নবিদ ও অভিধান প্রণেতা রাজশেখর বসুর ১৩৯তম জন্মবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।


বাঙালির বড়ই বদনাম আছে কারোর ডাকনাম বিকৃতি করার। কিন্তু ফটিক ডাকনামটা ফটকা বা ফইটক্যা হয়ে ছিল কিনা জানা নেই তবে এই ফটিক একদিন বড়মাপের সাহিত্যিক, রসায়নবিদ্, ভাষাতাত্ত্বিক, অভিধান রচয়িতা, ধর্মগ্রন্থ রচয়িতা ও কৌতুককাহিনীর রচয়িতা হয়ে উঠেছিল। এই ফটিকই বেঙ্গল কেমিক্যালকে ফুলে ফাঁপিয়ে তুলেছিল।বেঙ্গল কেমিক্যালের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় একবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে ফটিকের নামে কৃতিম অভিযোগ করে বলেন "আপনি ফটিকের বইয়ের এত প্রশংসা করছেন যে বেঙ্গল কেমিক্যাল অসুবিধায়। প্রশংসার দরুন বেঙ্গল কেমিক্যাল ক্ষতির সন্মুখিন হবে। কারণ প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার সব কাজকর্ম শিকেয় তুলে, কেমিস্ট্রি ছেড়ে গল্প লেখায় মত্ত হবে"। রবীন্দ্রনাথ এর যথাযথ উত্তরও দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ একবার ফটিককে বলেছিলেন " তুমি এত রস কোথা থেকে পাও?" ফটিকের উত্তর ছিল "আপনি ভুলে যাচ্ছেন, আমি রসায়নের লোক।" এই ফটিকের নামের আড়ালে মানুষটা হচ্ছেন রাজশেখর বসু।

রাজশেখর নাম-
রাজশেখর বসুর বড় ভাই শশীশেখরের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায় "পিতা চন্দ্রশেখর দ্বারভাঙ্গা থেকে ঘুরে এসে বলেন ফটিকের নাম ঠিক হয়ে গেছে। তখন মহারাজ লক্ষীশ্বর সিংহ জিজ্ঞাসা করেন, তোমার দ্বিতীয় ছেলের নামও একটা শেখর হবে নাকি? আমি বললাম, ইওর হাইনেস, যখন তাকে আশীর্বাদ করেছেন, তখন আপনিই তার শিরোমাল্য, আমি আপনার সামনেই তার নামকরণ করলাম রাজশেখর।"

ছদ্মনাম-
রাজশেখর বসুর একটা ছদ্মনাম নাম ছিল "পরশুরাম"। তিনি  পরশুরাম ছদ্মনামে তাঁর ব্যঙ্গকৌতুক ও বিদ্রুপাত্মক কথাসাহিত্যের জন্য প্রসিদ্ধ। তিনি ছদ্মনাম কেন নিয়েছিলেন? পৈতৃিক বাড়ি ১৪ নং পার্শি বাগান লেনে বসত "উৎকেন্দ্র"র মজলিসে বৈঠক। উৎকট এবং কেন্দ্র এই দুটি শব্দ নিয়ে উৎকেন্দ্র। সেখানে রাজশেখর ছাড়াও  থাকতেন তাঁর চার ভাই, জলধর সেন, শৈলেন সাহার মত জ্ঞানী গুণীরা। এখানে সবরকমেরই আলোচনা হত। রাজশেখরের কথায় পরশুরাম একজন স্যাকরা। এই নামের সাথে পৌরাণিক পরশুরামের কোনো সম্বন্ধ নেই। রাজশেখরের স্বনামে গল্প লিখতে সংকোচ ছিল। বন্ধু বান্ধবরা একটা ছদ্মনাম চিন্তা করছিলেন। সেই সময় তারাচাঁদ কর্মকার নামে একজন  উৎকেন্দ্রের মজলিসে আসেন। হাতের কাছে তাকে পেয়ে তার নামটাই নিয়ে নেয়। এই নামের পেছনে অন্য কোনো গূঢ় উদ্দেশ্য ছিল না। এই উৎকেন্দ্রই রাজশেখর বসুর গড্ডালিকার গল্পগুলো পাঠ করা হতো। জলধর সেন সেগুলি তার সম্পাদিত "ভারতবর্ষ" পত্রিকায় ছাপান। পরে এটা বই আকারে প্রকাশ হলে রাজশেখর প্রথম পরশুরাম ছদ্মনামটা ব্যবহার করেন। তখন তাঁর বয়স ৪২ বছর। এখানে প্রখ্যাত সাহিত্যক সৈয়দ মুজতবা আলীর সাথে মিল আছে। মুজতবার প্রথম বই "দেশে-বিদেশে" তাঁর ৪২ বছর বয়সেই প্রকাশিত হয়।

জন্ম-
রাজশেখর বসু ১৮৮০ সালের ১৬ই মার্চ বর্ধমান জেলার বামুনপাড়া গ্রামে তাঁর মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন।তাঁর পিতা চন্দ্রশেখর বসু দ্বারভাঙ্গা-রাজ-এস্টেটের ম্যানেজার ছিলেন।

ছোটবেলা ও পড়াশুনা-
তাঁর ছোটবেলা কাটে দ্বারভাঙ্গায়। তিনি ১৮৯৫ সালে দ্বারভাঙ্গা রাজস্কুল থেকে এন্ট্রাস পাশ করেন এবং এরপর পাটনা কলেজে ভর্তি হন ফার্স্ট আর্টস পড়ার জন্য। ১৯০০ সালে রসায়নে এম.এ পরীক্ষা দিয়ে প্রথম স্থান লাভ করেন। এর দুই বছর পরে ১৯০২ সালে রিপন কলেজ থেকে বি.এল পাশ করে মাত্র তিনদিন আইন ব্যবসা করেই বুঝেছিলেন আইনের থেকে বিজ্ঞান চর্চাই তাঁর কাছে আকর্ষনীয় বেশি।

সাহিত্যচর্চা-
১৯২২ সালে পরশুরাম ছদ্মনামে তাঁর প্রথম  রচনা লেখেন। তাঁর ব্যঙ্গ রচনা "শ্রী শ্রী সিদ্ধেশ্বরী লিমিটেড" প্রকাশিত হয় জলধর সেনের "ভারতবর্ষ" পত্রিকায়। বেঙ্গল কেমিক্যালসে কাজ করার সময় থেকেই তাঁর সাহিত্য চর্চা আরম্ভ। রাজশেখরের কবি স্বভাব থাকলেও তিনি ছিলেন খুবই বাস্তববাদী। প্রতিটি কাজ নিখুঁত ছক করেই তিনি কাজে নামতেন। বেঙ্গল কেমিক্যালকে পূর্ণভাবে গড়ে তোলার কাজই হোক বা "চলন্তিকা" অভিধান, রামায়ণ- মহাভারতের অনুবাদ হোক, সব কিছুই তিনি প্লানমাফিক করতেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ মোট ২১টি।

শেষ জীবন-
রাজশেখর বসু মৃণালীনি দেবীকে বিবাহ করেন। বসু দম্পতির এক কন্যা ছিল। রাজশেখরের বয়স যখন ৫৪ বছর তখন তাঁর মেয়ের জামাই খুব অল্প বয়সে অসুস্থতাজনিত কারণে মারা যায়। এর আট বছর পর তাঁর স্ত্রী মৃণালীনি দেবীও লোকান্তরিত হন। পরবর্তী ১৮ বছর স্ত্রীবিহীন একাকী জীবনে রচিত হয় তাঁর অমূল্য সাহিত্যকর্মসমূহ। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের দুঃখ-দূর্দশার কথা তাঁর লেখাতে পাওয়া যায়নি। নাতি নাতনিকে বুকে আগলে বড় করেছেন। ভাল ঘরে বিয়ে দিয়েছিলেন নাতনির। নিজেই নিজের চিকিৎসা করতেন। ১৯৫৯ সালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লেও তিনি লেখা চালিয়ে যেতে থাকেন। শেষে ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে ২৭শে এপ্রিল দ্বিতীয় দফা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁর জীবনাবসান হয়।

বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিত রায়ের পরিচালনায় রাজশেখর বসুর দু'টি ছোটগল্প অবলম্বনে চলচ্চিত্র তৈরী হয়। সেগুলো হলো পরশ পাথর এবং  বিরিঞ্চি বাবা অবলম্বনে নির্মিত সিনেমা 'মহাপুরুষ।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেইল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

15 March 2019

স্বনামধন্য ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক,কবি, ছড়াকার, ভ্রমণকাহিনী রচয়িতা এবং চিন্তাবিদ অন্নদাশঙ্কর রায়ের ১১৫তম জন্ম বার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

ছোটবেলাকার অনেক ছড়ার গান এখনও মনে গুন গুন করে বা শুনলে মনে পড়ে যায়। সেই সব জনপ্রিয় অনেক ছড়ার গানের রচয়িতা অন্নদাশঙ্কর রায় ১৯০৪ সালের ১৫ই মার্চ উড়িষ্যার ঢেঙ্কানালে এক শাক্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁদের আদি বাড়ী পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায়।পিতা নিমাইচরণ রায় বিয়ে করেন পালিত পরিবারের মেয়ে হেমনলিনীকে যিনি বৈষ্ণব ভাবাদর্শে বিশ্বাসী। কিন্তু একই পরিবারে শাক্ত ও বৈষ্ণব বিশ্বাসের কখনও সংঘাত ঘটেনি। অন্নদাশঙ্করের পূর্বপুরুষ রামচন্দ্র ঘোষ সুবে উড়িষ্যায় জরিপ করতে গেলে  বাদশাহ জাহাঙ্গীর তাঁকে একটা লাখেরাজ তালুক ও খান উপাদি দেন। সেই সময় থেকেই কর্মসূত্রে তাঁরা বসবাস শুরু করেন ওড়িষ্যার ঢেঙ্কানালে। মোঘল আমলেই খান পদবির সাথে জুড়ে যায় রায় চৌধুরী পদবি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টিকে যায় রায় পদবি।তাঁদের পরিবারে সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিবেশ ছিল এবং তা নিয়মিত চর্চাও হতো।

শিক্ষাজীবন-
অন্নদাশঙ্করের শিক্ষাজীবন শুরু হয় ঢেঙ্কানালের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে  পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইএ পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। মাত্র দশ বারো বয়সেই আয়ত্ব করে ফেলেন কৃতিবাসের রামায়ণ, কাশীরাম দাশের মহাভারত, কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চন্ডীমঙ্গল, বিদ্যাপতি ও চন্ডীদাশের পাদাবলী। ছাত্রজীবনেই তিনি চার্লশ ডিকেন্স, বার্নার্ড শ, ইসবেন, টলস্টয় প্রমুখ লেখকের বই পড়ে তিনি ইউরোপীর সাহিত্য, সমাজ ও দেশ সম্বন্ধে জানতে আগ্রহী হন।তিনি সরকারি খরচে আই.সি.এস হতে ইংল্যান্ড যান।

প্রেম ও বিবাহ-
১৯৩০ সালে মার্কিন বিদুষী তরুণী অ্যালিস ভার্জিনিয়া ওর্নডর্ফ ভারতে আসেন ভারতীয় সঙ্গীত বিষয়ে গবেষণার জন্য। কলকাতায় অ্যালিসের সঙ্গে পরিচয় হয় অন্নদাশঙ্করের। পরিচয় থেকে প্রণয় এবং পরিণয়ে আবদ্ধ হন তাঁরা। রবীন্দ্রনাথ বিয়ের পর অ্যালিসের নতুন নাম দেন ‘লীলা রায়’। সেই সময় ‘লীলাময় রায়’ ছদ্মনামে লিখতেন অন্নদাশঙ্কর। অন্নদাশঙ্করের জীবনে লীলা রায়ের প্রভাব ব্যাপক। বহু ভাষায় পারদর্শী লীলা রায় নিজেও খ্যাতিলাভ করেন সাহিত্যিক এবং অনুবাদক হিসেবে। গুণী মার্কিন কন্যা লীলা রায় বাঙালি রমণীর মতোই জীবন যাপন করেন। তিনি অন্নদাশঙ্কর সহ বহু বই বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। তিনি সত্যজিত রায়ের অশনি সংকেত, ঘরে-বাইরে এবং অনান্য সিনেমার ইংরাজী সাব-টাইটেল তৈরী করেন।

সাহিত্য-
অন্নদাশঙ্করের প্রথম কবিতা উড়িয়া ভাষায় প্রকাশিত হয়।  বাংলা, ইংরাজী, উড়িয়া, হিন্দি ভাষার পারদর্শী হলেও সাহিত্য চর্চায় তিনি বাংলা ভাষাকেই বেছে নেন। অন্নদাশঙ্করের মাত্র ১৬ বছর বয়সে টলস্টয়ের গল্প ‘তিনটি প্রশ্ন’ বাংলায় অনুবাদ করেন তিনি এবং তা প্রবাসী পত্রিকায় ছাপা হয়। বাংলা ভাষায় তাঁর প্রথম প্রকাশিত মৌলিক রচনার বিষয় ছিল নারীর অধিকার ও স্বাধীনতা, যা ভারতী পত্রিকায় ছাপা হয়। এ ধরনের বিষয় নিয়ে তিনি ওড়িয়া ভাষায়ও লেখেন। এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ নাটকের ওপর প্রবন্ধ রবীন্দ্রনাথকেও আলোড়িত করে।  তাঁর লেখা অন্যান্য বিখ্যাত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে 'পথে প্রবাসে', 'সত্যাসত্য', 'যার যেথা দেশ' প্রভৃতি।

বাংলা ছড়া-
আধুনিক বাংলা ছড়ার জগতে অন্নদাশঙ্কর এক নতুন ধারা আনেন। এই ছড়া লেখার পিছনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বুদ্ধদেব বসুর অনুপ্রেরণা কাজ করে ছিল। তিনি ছোট- বড়, শ্রমজীবী থেকে সাধারণ মানুষ সবার জন্য ছড়া লিখেছেন। তাঁর কিছু ছড়া খুব জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং সুরকাররা গান তাঁর অনেক ছড়ায় সুরকাররা সুর দিয়ে গান তৈরী করেন। যেমন 'খোকা ও খুকু'তে সুর দিয়েছিলেন বিখ্যাত সুরকার সলিল চৌধুরী। এই ছড়ায় অন্নদাশঙ্কর দেশভাগের বেদনা তীর্যকভাবে প্রকাশ করেছেন।

'তেলের শিশি ভাঙল বলে
খুকুর পরে রাগ করো।
তোমরা যে সব বুড়ো খোকা
ভারত ভেঙে ভাগ করো!
তার বেলা?'

অনেক ছড়ার গান  শিশুদের প্রিয় গান হয়ে ওঠে।
'ময়নার মা ময়নামতি
ময়না তোমার কই
ময়না গেছে কুটুম বাড়ী
গাছেরডালে ওই।'

তাঁর লেখা উড়কি ধানের মুড়কি, রাঙা ধানের খই প্রভৃতি ছড়ার বই ছোটোদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। জীবনের শেষদিনেও হাসপাতালে মুখে মুখে তাঁর শেষ ছড়া বলে যান। অন্নদাশঙ্করের অনান্য ছড়াগ্রন্থগুলির নাম  ‘ডালিম গাছে মউ’, ‘শালি ধানের চিড়ে’ , ‘আতা গাছে তোতা’, ‘হৈ রে বাবুই হৈ’, ‘রাঙামাথায় চিরুনি’, ‘বিন্নি ধানের খৈ’ ও ‘যাদু, এ তো বড়ো রঙ্গ’।

বিদেশ ভ্রমণ রচনাবলী-
তিনি ইংল্যান্ড যান আই.সি.এস হতে। সেখানে তিনি দু বছর ছিলেন। এরই ফাঁকে ঘুরে বেড়ান সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, ইটালি, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশ। ফলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটে তাঁর সাহিত্যে। তাঁর ইউরোপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা ‘পথে প্রবাসে’ ভ্রমণকাহিনীর মাধ্যমেই তিনি বাংলা সাহিত্যে নিজের স্থান করে নেন। অন্নদাশঙ্করের অন্যান্য ভ্রমণকাহিনীগুলি হ’লো ‘ইউরোপের চিঠি’, ‘জাপানে’, ‘ফেরা’, ‘চেনাশোনা’ ও ‘বাংলাদেশে’।

কর্ম জীবন-
অন্নদাশঙ্কর ১৯৩৬ সালে কর্মজীবন শুরু করেন নদীয়া জেলার ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে। শেষের দিকে তিনি পশ্চিমবঙ্গের বিচার বিভাগের সেক্রেটারি হয়ে ১৯৫১ সালে তিনি স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে অবসর নেন।

শান্তিনিকেতনে-
চাকরি ছাড়ার পর অন্নদাশঙ্কর বসবাস শুরু করেন শান্তিনিকেতনে। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য বাঙালির আত্মদান তাঁর মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। পরের বছর ১৯৫৩ সালে এক ঐতিহাসিক ‘সাহিত্য মেলা’র আয়োজন করেন তিনি শান্তিনিকেতনে।

সম্মান ও পুরস্কার-
সাহিত্যকর্মের জন্য তিনি বহু পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৭৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে জগত্তারিণী পুরস্কারে ভূষিত করে। অন্যান্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার, আনন্দ পুরস্কার, বিদ্যাসাগর পুরস্কার ইত্যাদি।

২০০২ সালের ২৮শে অক্টোবর অন্নদাশঙ্কর রায় কলকাতার পি. জি হসপিটালে  পরলোকগমন করেন।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেইল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

12 March 2019

আজ ১২রা মার্চ, বিশিষ্ট বাঙালি পন্ডিত, প্রবন্ধকার, গবেষক, সংগ্রাহক এবং শিক্ষক ক্ষিতিমোহন সেনের ৫৯তম মৃত্যু বার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

ক্ষিতিমোহন সেন ১৮৮০ সালের ২রা ডিসেম্বর কাশীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের আদি নিবাস ছিল ঢাকার বিক্রমপুরে। তাঁর পিতা ভুবনমোহন সেন পেশায় ছিলেন একজন চিকিৎসক। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অমর্ত্য সেন তাঁর দৌহিত্র।

ক্ষিতিমোহন কাশীর কুইন্স কলেজ থেকে সংস্কৃতে এমএ পাস করে চম্বারাজ্যের শিক্ষাবিভাগে যোগ দেন। ১৯০৮ সালে রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে বিশ্বভারতীর ব্রহ্মাচর্যাশ্রমে যোগদান করেন ও বিশ্বভারতী বিদ্যাভবনের অধ্যক্ষরূপে কর্মজীবন শেষ করেন। ব্রহ্মচর্যাশ্রম থেকে বিশ্বভারতী এই দীর্ঘ জটিল পথ পরিক্রমায় ক্ষিতিমোহন ছিলেন রবীন্দ্রনাথের অন্যতম প্রধান সহযোগী। ক্ষিতিমোহন রবীন্দ্রনাথের সফরসঙ্গী হয়ে ভারতের বিভিন্ন স্থানে যান ও ১৯২৪ সালে রবীন্দ্রনাথের চিন ভ্রমণের সহযাত্রী ছিলেন।

মধ্যযুগের সন্তদের বাণী, বাংলার বাউল সঙ্গীত সম্পর্কে তিনি ব্যাপক অনুসন্ধান, গবেষণা ও গ্রন্থাদি রচনা করেন। তিনি প্রায় পঞ্চাশ বছরের চেষ্টার ফলে সংগৃহীত বিষয়গুলি কয়েকটি বইতে প্রকাশ করেন। তিনি হিন্দি ও গুজরাতি ভাষায়ও গ্রন্থ রচনা করেছেন। বেদ, উপনিষদ, তন্ত্র ও স্মৃতিশাস্ত্রে ক্ষিতিমোহনের পান্ডিত্য ছিল বিস্ময়কর। অভিনয়,সঙ্গীতশাস্ত্র এবং আয়ুর্বেদশাস্ত্রেও তাঁর ভাল দখল ছিল।

ক্ষিতিমোহন সেনের কয়েকটি প্রকাশিত গ্রন্থের নাম কবীর, ভারতীয় মধ্যযুগের সাধনার ধারা, ভারতের সংস্কৃতি, বাংলার সাধনা ইত্যাদি। সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য ক্ষিতিমোহন ১৯৫২ সালে বিশ্বভারতীর প্রথম দেশিকোত্তম উপাধি এবং হিন্দি চর্চার স্বীকৃতি স্বরূপ সর্বভারতীয় সম্মান লাভ করেন।

ক্ষিতিমোহন সেন ১৯৬০ সালের ১২ই মার্চ পরলোকগমন করেন।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেইল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

11 March 2019

আজ ১১ই মার্চ, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৭৯তম জন্ম বার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।


দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বিশিষ্ট বাঙালি কবি, সংগীতকার, দার্শনিক ও গণিতজ্ঞ। তিনি বাংলা সংকেত লিপি (শর্ট হ্যান্ড) ও স্বরলিপি রচনার অন্যতম অগ্রপথিক। 

দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৪০ সালের ১১ই মার্চ জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। পারিবারিক পরিচয়ে তিনি ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র ও  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা।

ছোটবেলা-
পাঁচ বছর বয়সে হাতে খড়ি। বাড়ীতেই একই শিক্ষকের কাছে সহোদর সতেন্দ্রনাথ ও খুরতূতো ভাই গণেন্দ্রনাথের সাথে লেখাপড়া শুরু। কিছুদিন বাংলা পড়েই একেবারে সংস্কৃত মুগ্ধবোধ ব্যাকরণ শুরু পন্ডিতমশায়ের কাছে। ক্রমশ মুগ্ধবোধ পার হয়ে রঘুবংশ, কুমারসম্ভব শেষ। এরপর তিনি ভর্তি হন সেন্ট পল’স স্কুলে। এই স্কুলে তিনি দু বছর পড়ার পর স্কলারশিপ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি হিন্দু কলেজে (বর্তমানে প্রেসিডেন্সি কলেজ) ভর্ত্তি হন। ক্লাসের বাঁধাধরা নিয়মে পড়াশোনা তাঁর ভালো লাগেনি। ভরসা ছিল লাইব্রেরী। সেখান থেকে বই নিয়ে বাড়ীতে পড়েই তাঁর জ্ঞান তৃষ্ণা মিটত। শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় পাশ করার জন্য পড়াশানা তাঁর পোষাল না। ছেড়ে দিলেন কলেজ।ছোটবেলা থেকেই কবিতা রচনা করার ঝোঁক থাকলেও, কবি হবার কথা ছিল না তাঁর। তিনি হতে চেয়েছিলেন চিত্রকর।

ভাইদের সাথে সম্পর্ক এবং একান্নবর্তী পরিবার-
অনুজের প্রতি দ্বিজেন্দ্রনাথের স্নেহ লক্ষ করা যায়। দ্বিজেন্দ্রনাথ তাঁর পরের ভাই সতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের  অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। যদিও দুই ভাইয়ের মধ্যে মতের কিছু পার্থক্য ছিল। দ্বিজেন্দ্রনাথ ছিলেন সমাজের প্রচলিত সংস্কারগুলির একনিষ্ঠ অনুগামী। অন্যদিকে সত্যেন্দ্রনাথ এই সংস্কারগুলিকে ভেঙে নতুন আধুনিক সমাজ গঠনের পক্ষপাতী ছিলেন।পরিবারের কথা বলতে গিয়ে দ্বিজেন্দ্রনাথ বলেন 'আমাদের ফ্যামিলি মোটো হচ্ছে ওয়ার্ক উইল উয়িন। রবি সেটা লিটার‍্যালী পালন করছে। আমাদের ভাইদের মধ্যে রবিই সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়াছেন। সতু নিরীহ ছেলেমানুষ, রবি এক্টিভ আর আমি কিছুনা'। রবীন্দ্রনাথ দ্বিজেন্দ্রনাথকে বড়োদাদা বলে ডাকতেন। ঠাকুরবাড়ীর ঐশ্বর্য তখন সর্বোচ্চ শিখরে। দ্বারকানাথ ঠাকুর তখনো বেঁচে। বাবা দেবেন্দ্রনাথ তখনো ব্রাহ্ম হননি। তখনো এবাড়ী ওবাড়ী হয়নি। যৌথ পরিবারের ছত্রচ্ছায়ায়, খুড়তুতুতো ভাই বোনেদের মধুর সাহচর্যে, বাড়ীতে দোল, দুর্গোৎসবের ভরপুর আনন্দ নিয়ে, কাকীমা যোগমায়াদেবীর স্নেহ-আদরে তাঁর ছোটবেলাটি কেটেছিল। বাড়ী ছিল তাঁদের স্বর্গ। তাঁর থেকে দু দশকের ছোট রবি এসবের স্বাদ পায়নি। পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হলে  দ্বিজেন্দ্রনাথের ছোটবেলাতেই জোড়াসাঁকোর একান্নবর্তী ঠাকুরবাড়ী দু ভাগ হয়ে যায়। দ্বিজেন্দ্রনাথ একান্নবর্তী পরিবারের বিশেষ ভক্ত ছিলেন এবং তিনি ভাবতেন তাঁর একান্নবর্তী পরিবারের মধ্যে যে প্রীতি ও সদ্ভাব ছিল আজকাল আর দেখা যায় না। সামাজিক রীতিনীতি ঠিক মত মেনে চললে এই রকম পারিবারিক ব্যবস্থাই যে ভালো সে বিষয়ে তিনি নিঃসন্দেহ ছিলেন। কিন্তু একান্নবর্তী পরিবারের একটি বিশেষ দোষ তাঁর চোখে পড়েছিল। তিনি বলতেন  'এখানে যদি কেউ ধর্ম সম্বন্ধে নতুন মত অবলম্বন করার প্রয়াস করে তাহলে এই একান্নবর্তী পরিবার বাধা দেয়। সে কিছুতেই ব্যক্তি বিশেষের মত মেনে নিয়ে এগিয়ে যেতে  চায় না, অথবা তার মত মেনে নিয়ে তাকে বৃহৎ পরিবারের মধ্যে থাকতে দিয়ে, স্বাধীন ভাবে তাকে তার নিজের স্বতন্ত্র জীবন যাত্রা নির্বাহ করতে দেয় না। এইখানেই এই জয়েন্ট ফ্যামিলি সিস্টেম এর সংকীর্ণতা'।

বিবাহ-
যৌবনারম্ভেই তিনি যশোহরে নরেন্দ্রপুরের তারাচাঁদ চক্রবর্তীর কন্যা সর্বসুন্দরীকে বিয়ে করেন। তাঁর পাঁচ পুত্রও দুই কন্যা। যৌবনেই তাঁর স্ত্রীবিয়োগ ঘটেছিল। অবশিষ্ট জীবন দ্বিজেন্দ্রনাথ বিপত্নীক অবস্থাতেই কাটিয়ে ছিলেন। স্ত্রী মারা যাবার পর তিনি শান্তিনিকেতনে চলে আসেন।

কাব্য চর্চা-
দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন কাব্যচর্চা শুরু করেন, তখন মাইকেল মধুসূদন দত্ত ছিলেন স্বীয় সাফল্যের শীর্ষদেশে। সেই যুগে বাংলার প্রত্যেক কবিই অল্পবিস্তর মধুসূদন দ্বারা প্রভাবিত হলেও, দ্বিজেন্দ্রনাথ ছিলেন এই প্রভাবের ঊর্ধ্বে। বরং মধুসূদনই দ্বিজেন্দ্রনাথকে ভবিষ্যতের কবি হিসাবে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মের ঠিক এক বছর আগে দ্বিজেন্দ্রনাথের বয়স যখন ২০ বছর তখন তাঁর প্রিয়কাব্য কালিদাসের সংস্কৃত ভাষায় রচিত মেঘদূতের বঙ্গানুবাদ গ্রন্থটি প্রকাশ হয়। এরপর তাঁর তত্ত্ববিদ্যা (তিন খণ্ডে) প্রকাশিত হয়। তাঁর দ্বিতীয় রূপক-কাব্য স্বপ্ন-প্রয়াণে এক যুবকের ভ্রমণবৃত্তান্ত বর্ণনা করা হয়েছে। ১৮৮৪ সাল থেকে সুদীর্ঘ ২৫ বছর তিনি তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা সম্পাদনা করেন।

আত্মভোলা খাঁটি মানুষ-
তাঁকে সবচেয়ে কাছ থেকে দেখেছেন পুত্রবধূ হেমলতা দেবী। তিনি তাঁর সম্পর্কে বলেছেন “সকল দিকে তিনি যে একজন খাঁটি মানুষ ছিলেন এতে কোন ভুল নাই। তাঁর ঈশ্বরভক্তি ছিল খাঁটি, পিতৃভক্তি ছিল খাঁটি, ভাইদের ও সন্তানদের প্রতি স্নেহ ছিল খাঁটি, স্বদেশপ্রীতি, বন্ধুপ্রীতি, জীবপ্রীতি ছিল তাঁর খাঁটি। দার্শনিক তত্বের বিচার ও বিশ্লেষণে অনুরাগ ছিল খাঁটি। কাব্যে প্রীতি ও বাংলা ভাষার প্রতি দরদ ছিল খাঁটি।
তিনি প্রায়ই তাঁর চশমা খুঁজে পেতেন না। তখনই প্রিয় ভৃর্ত্য মুনীশ্বরকে খুব বকাবকি করতেন। কিন্তু সেই চশমা পাওয়া যেত তাঁর পকেট থেকে বা কপালের ওপর থেকে। অনেক সময় চোখে চশমা পড়া থাকলেও আমার চশমা কোথায় বলে হাঁক পারতেন। চশমা খুঁজে পাওয়া গেলে অট্টহাসিতে বাড়ী মাতিয়ে তুলতেন। এই রকমই আত্মভোলা মানুষ ছিলেন।

হিন্দুমেলা বা স্বদেশী মেলা-
দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর আর দেবেন্দ্রনাথ মল্লিকের পৃষ্ঠপোষকতায় কলকাতায় স্বদেশী মেলার চালু হয়। ভারতবর্ষকে স্বদেশ বলে ভক্তির সাথে উপলব্ধির চেষ্টা সেই প্রথম।  এই মেলায় দেশের স্তবগান গাওয়া হত, সেই সাথে চলতো কবিতা পাঠ, দেশী শিল্প, ব্যায়াম প্রভৃতি প্রদর্শণ করা হত। সেখানে দেশী গুণী লোকদের পু র স্কৃত করা হতো। এই মেলার জন্য দ্বিজেন্দ্রনাথ দেশাত্মবোধক গানও রচনা করেছিলেন। এই মেলাকে কেন্দ্র করে অনেকেই বিভিন্ন জাতীয় সংগীত সৃষ্টি করেন। প্রকৃতপক্ষে সেই প্রথম সঠিক দেশানুরাগের গান রচিত হতে থাকলো। এই মেলাই বাংলাদেশে হয়তো বা সারা ভারতবর্ষে সর্ব প্রথম 'জাতীয় শিল্প প্রদর্শণী'র সূচনা করে। এই মেলা প্রথমদিকে চৈত্র সংক্রান্তির দিন অনুষ্ঠিত হত বলে এই মেলার নাম  'চৈত্রমেলা' ছিল।

সংসারিক বুদ্ধি-
ছিল না শুধু সংসারিক বুদ্ধি। এইজন্য তাঁর আপন জনেরা তাঁকে বিষয় -আশয় থেকে দুরে রাখতেন। তিনি অনাসক্ত গৃহী ছিলেন। তাঁর অন্তরে যেমন একটি সহজ সরল দর্পহীন তেজস্বিতা ছিল, বাহিরের পোষাক পরিচ্ছদেও তেমনি অনাড়ম্বর। একবার গরম লুচি খাবার সময় হাতে ঘি লেগে যায়। তক্ষুনি আদেশ করেন ঘিয়ের বদলে লুচি জলে ভাজতে। এরকমই ছিল তাঁর সাংসারিক জ্ঞান।

শান্তিনিকেতন ও পশুপাখী প্রীতি-
পশুপাখীদের প্রতি তাঁর আন্তরিক ভালোবাসা ছিল। শান্তিনিকেতনের নিচু বাংলার বারান্দায় তিনি যখন বসতেন তখন চড়াই পাখি, কাঠবিড়ালি, শালিখ পাখি তাঁকে ঘিরে থাকত আর তাঁর গায়ে মাথায় চড়ে বসত। অনেক সময় কাঠবিড়ালি তাঁর জামার মধ্যে ঢুকে খেলা করত। এক শালিখ ভালোবাসার আবেশে তাঁর চোখে ঠুকরে দিয়েছিল। কি বুঝে তার পরদিন থেকে সে আর আসেনি। তাকে দেখতে না পেয়ে দ্বিজেন্দ্রনাথের মন খারাপ থাকত।

মহাত্মা গান্ধী-
তিনি গান্ধিজীর খুব ভক্ত ছিলেন। গান্ধীজিও তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। দ্বিজেন্দ্রনাথ যতদিন বেঁচে ছিলেন শেষ সময় পর্যন্ত তিনি গান্ধীজির সাথে যোগাযোগ রেখে ছিলেন। এই যোগাযোগের মাধ্যম ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ও দীনবন্ধু এন্ড্রুজ। ১৯২৫ সালে মহাত্মা গান্ধি তৃতীয়বার শান্তিনিকেতনে আসেন এবং থাকেন তিন দিন। এই তিন দিনের প্রতিদিনই গান্ধীজি দ্বিজেন্দ্রনাথের সাথে সকাল সন্ধ্যায় দুবেলাই দেখা করতেন। এটাই ছিল দ্বিজেন্দ্রনাথের শেষ সাক্ষাৎ।

হারমনিয়াম ও বাঁশি-
দ্বিজেন্দ্রনাথের পিতা বাড়ীতে হারমোনিয়াম আনেন। ভারতবর্ষে সেই প্রথম এই যন্ত্রটি এল। দ্বিজেন্দ্রনাথ এই হারমোনিয়াম বাজাতে শিখেছিলেন। তিনি এক সময় বাঁশি বাজাতেন। বাড়ীতে অনেক রকমের বাঁশি থাকত।

ঈশ্বরপরায়ণ, বিষয়ভোলা, জ্ঞানবৃদ্ধ, স্বভাবশিশু প্রকৃতির কোলঘেঁষা এই আশ্চর্য মানুষটি বিদায় নিলেন ১৯২৬ সালের ১৯শে জানুয়ারী।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেইল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।