29 July 2021

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ১৩০ তম মৃত্যু বার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ১৩০ তম মৃত্যু বার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি। বিদ্যাসাগরের কর্মজীবনকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত, সমাজ সংস্কারমূলক আন্দোলন, দ্বিতীয়ত শিক্ষাসংস্কার ও শিক্ষাপ্রসারে ভৃমিকা,তৃতীয়ত ভাষা ও সাহিত্যে ঐতিহাসিক ভূমিকা। কঠোরতা ও কোমলতার অপূর্ব সমন্বয়ে গঠিত বিদ্যাসাগরের চরিত্র আমাদের একদিকে যেমন অভিভূত করে অপরদিকে যোগ্যতার সহিত তিন পর্যায়ের কর্মধারাকে বাস্তবে পরিণত করার প্রচেষ্টাকে আমরা প্রশংসা না করে পারি না। বিদ্যাসাগরের মতো মানুষ সত্যিই বিরল আমাদের অনেক কিছু করার আছে ঊনবিংশ শতাব্দীর মহাপ্রাণ মানুষ টির প্রতি যোগ্য সন্মান আর একনিষ্ঠ শ্রদ্ধা জানাবার। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কলকাতা বিশ্যবিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠিতা সদস্য ছিলেন। মাতৃভক্তির জন্য তাঁর নাম কিংবদন্তী হয়ে আছে। চিরদিন তিনি গোঁড়ামি, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন। রামমোহনের সতীদাহ প্রথার উচ্ছেদ হবার ফলে কৌলিন্য প্রথা ও বহু বিবাহ রদ হওয়ায় সমাজে বিধবাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ১৮৫৬ সালে বিধবাবিবাহ আইন বিধিবদ্ধ হয় তাঁরই প্রচেষ্টায়। তাঁকে বাংলা গদ্যের জনক বলা হয়। স্কুল বিভাগের শিক্ষার জন্য তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেন। বর্ণপরিচয়, কথামালা, চরিতাবলী, শকুন্তলা, সীতার বনবাস প্রভৃতি রচনা করে বাংলা ভাষার বল সঞ্চয় করে ছিলেন। এছাড়া তিনি সম্পাদনা করেছিলেন উত্তররামচরিত, রঘুবংশ সন্দর্ভ সংগ্রহ, কুমারসম্ভব, কাদ্ম্বরী, মেঘদূত প্রভৃতি গ্রন্থ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে ১৮২০ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ছিলেন ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় আর মা ভগবতী দেবী। ঈশ্বরচন্দ্রের পিতামহ রামজয় তর্কভূষণ ছিলেন সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে সুপন্ডিত ব্যক্তি। পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতায় স্বল্প বেতনের চাকরি করতেন। সেই কারণে ঈশ্বরচন্দ্রের শৈশব তাঁর মা ও ঠাকুরমার সাথে কাটে। ঈশ্বরচন্দ্র ছেলেবেলায় খুব দুরন্ত হলেও খুব বুদ্ধিমান ছিলেন। গ্রামের পাঠশালায় মন দিয়ে পড়াশোনা করে অল্প দিনেই সব শিখে ফেলেন। ছেলে লেখাপড়া শিখুক এটাই ঠাকুরদাসের ইচ্ছা। অল্প মাইনের চাকরি করলেও সাহস করে ছেলেকে উচ্চ শিক্ষা দেবার জন্য নিয়ে চললেন কলকাতায়। সেই সময় রেল গাড়ি ছিল না। বীরসিংহ গ্রাম থেকে কলকাতা অনেক দূর। ছেলের হাত ধরে ঠাকুরদাস হাঁটা পথেই কলকাতা রওনা দিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র পথের ধারে মাইল পোস্ট দেখে ইংরাজি সংখ্যা গুলো শিখে নেন কলকাতা পৌঁছনোর আগেই। কলকাতায় ঈশ্বরচন্দ্র সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন। খুব কষ্টকরে ঈশ্বরচন্দ্র পড়াশোনা শুরু করেন। বাড়ির সব কাজ তাঁকে করতে হত। রান্না করা, বাসন মাজা সব কিছুর মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যান। কিছু দিনের মধ্যেই তিনি সাহিত্য, অলঙ্কার, ব্যাকরণ, সংস্কৃত সহ আরও কিছু বিষয় আয়ত্ত করে ফেললেন। পরীক্ষায় সকলের চেয়ে বেশি নম্বর নিয়ে বৃত্তি পেলেন। তাঁর পান্ডিত্য দেখে দেশের পন্ডিতবর্গ তাঁকে বিদ্যাসাগর উপাধিতে ভূষিত করেন। তখন বিদ্যাসাগরের বয়স মাত্র কুড়ি। কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে ঈশ্বরচন্দ্র তখন চাকরিতে যোগ দেন।১৮৪১ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে হেডপন্ডিতের পদ পান ঈশ্বরচন্দ্র। ঈশ্বরচন্দ্র দানশীলতার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তাঁকে 'দয়ার সাগর' বলা হত।গভীর মানবতাবোধ ও পরদুঃখ কাতরতা তাঁকে দয়ার সাগরে পরিণত করে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্যারিসে থাকাকালীনবেহিসেবী খরচের ফলে অর্থসঙ্কটে পড়লে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর টাকা পাঠিয়ে মাইকেলকে সাহায্য করেছিলেন। বাঙালি জাতি প্রথম বড় হবার, যোগ্য, মানবিক, আধুনিক, প্রগতিশীল ও বিশ্বজনীন হবার দৃষ্টান্ত খুঁজে পেয়েছিল ঈশ্বরচন্দ্রের মধ্যে।তাঁর সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উক্তি-"তিনি হিন্দু বা বাঙালি ব্রাহ্মণ ছিলেন না। তাঁর মহৎ চরিত্রের যে অক্ষয় বট তিনি বঙ্গভুমিতে রোপণ করে গেছেন, তার তলদেশ জাতির তীর্থস্থান হয়েছে"। মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন-"আমি যে দরিদ্র বাঙালি ব্রাহ্মণকে শ্রদ্ধা করি তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।" এই মহাপুরুষ ৭১ বছর বয়সে ১৮৯১ সালের ২৯শে জুলাই আমাদের ছেড়ে চলে যান।

23 July 2021

২০২১ সালের ২৩শে জুলাই বাল গঙ্গাধর তিলকের ১৬৫তম জন্ম বার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

 


সংগ্রামী জাতীয়তাবাদের জনক, শিবাজির আদর্শে অনুপ্রাণিত ও কংগ্রেসের চরমপন্থী নেতারূপে বাল গঙ্গাধর তিলক ঊনবিংশ শতাব্দীর সপ্তম দশক হতে বিংশ শতাব্দীর প্রথম  দুইশতক পর্যন্ত সুনাম অর্জন করে ছিলেন। 

তিনি পুনা কলেজ হতে বি, এ পাশ করে  আইন  পরীক্ষায় উত্তীর্ণ  হয়ে পুনার বিখ্যাত নিউ ইন্ডিয়ান  ইস্কুলের শিক্ষক হন।

এ সম য় তিনি সরকারের দোষ ত্রুটি তুলে ধরার জন্য  কেশরী ও মারাঠা নামক দুটি  সংবাদপত্র চালু করেন।

তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম নেতা ছিলেন। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাঁকে ভারতীয় অস্থিরতার পিতা বলতেন। তাঁকে আরও সন্মানসুচক লোকমান্য বলা হত, যার অর্থ "জনগণ দ্বারা গৃহীত" (নেতা হিসাবে)। 

ভারতের জাতীয়তাবাদ আন্দোলনের জনক বালগঙ্গাধর তিলক। এককথায় তাঁকে বিশেষিত করা দুঃসাধ্য। তিনি ছিলেন একাধারে সমাজসংস্কারক, স্বাধীনতা সংগ্রামী, জাতীয় নেতা আবার অন্যদিকে ভারতীয় ইতিহাস, সংস্কৃত, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা ও হিন্দুদর্শনে অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী।  স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি বলিষ্ঠ কন্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, ‘স্বরাজ আমাদের জন্মগত অধিকার এবং আমরা তা অর্জন করবই’। তিলকের এই উক্তি উদ্বুদ্ধ করেছিল লক্ষ লক্ষ মানুষকে।

১৮৫৬ সালের ২৩শে জুলাই মহারাষ্ট্রের রত্নগিরিতে চিৎপাবন ব্রাহ্মণ বংশে তিলকের জন্ম। ছোটবেলা থেকেই তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন এবং গণিতে তাঁর বিশেষ আকর্ষণ ছিল। তিনি অন্যায় অবিচার একেবারেই বরদাস্ত করতে পারতেন না। সত্যের প্রতি ছিলেন অবিচল। তিলক ছিলেন ভারতের যুবকদের মধ্যে প্রথম প্রজন্ম যাঁরা আধুনিক কলেজ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছিলেন। তিলক গণিতে প্রথম শ্রেণির স্নাতক হন এবং তারপর আইন পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হন । তিলকের কর্মজীবন শুরু হয় গণিতের শিক্ষকতার মাধ্যমে। পরবর্তীকালে তিনি সাংবাদিকতার কাজ গ্রহণ করেন। পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থায় ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রতি অশ্রদ্ধার ভাব তাঁকে পীড়া দিত এবং এ কারণেই তিনি পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবল সমালোচনা শুরু করেন। প্রতিষ্ঠা করেন ‘ডেকান এডুকেশন সোসাইটি’ ভারতীয় যুবকদের প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার জন্য। এর পরের বছরই তিনি দুটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করতে শুরু করলেন – ‘কেশরী’ যেটি মারাঠি ভাষায় মুদ্রিত হত এবং ‘মারাঠা’ যার ভাষা ছিল ইংরেজী। তাঁর পত্রিকায় তিনি দেশের মানুষের প্রকৃত দুরবস্থার স্পষ্ট চিত্র এঁকেছিলেন। জ্বালাময়ী ভাষায় তিনি ঘুমন্ত ভারতবাসীদের জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন। দুটি পত্রিকাই বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে।বালগঙ্গাধর তিলকের রাজনৈতিক জীবনের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগদান করেন ১৮৯০ সালে। এছাড়াও তিনি পুণে মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন এবং বম্বে বিধানমণ্ডলের সদস্য ছিলেন এবং তিনি বম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফেলো’ নির্বাচিত হন। সমাজসংস্কারমূলক কাজেও তাঁর মহৎ ভূমিকা ছিল। তিনি বাল্যবিবাহের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন এবং বিধবা বিবাহের পক্ষে ছিলেন। গণপতি উৎসব এবং শিবাজীর জন্মোৎসব পালনের মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষকে একত্র করতে চেয়েছিলেন। 

১৮৯৭ সালে তিলকের বিরুদ্ধে বৃটিশ সরকার অভিযোগ আনে যে তিনি জনগণের মধ্যে বৃটিশ সরকারের প্রতি বিরুদ্ধ মনোভাব জাগিয়ে তুলছেন তাঁর লেখনীর মাধ্যমে এবং আইন ও শান্তি ভঙ্গ করছেন। এই অভিযোগে তিনি জেলবন্দী হন দেড় বছরের জন্য। ১৮৯৮ সালে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিলক স্বদেশী আন্দোলন শুরু করেন। সংবাদপত্র এবং বক্তৃতার মাধ্যমে তিলক মহারাষ্ট্রের গ্রামে গ্রামে স্বদেশী আন্দোলনকে জোরদার করে তোলেন এমনকি তাঁর বাড়ির সামনে স্বদেশী জিনিসের বাজারও খোলা হয়।

ভারতের জাতীয় রাজনীতিও এই সময় থেকেই অন্য দিকে বাঁক নেয়। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায় – নরমপন্থী এবং চরমপন্থী এই দুই মতবাদে। এতদিন যেখানে নরমপন্থী নেতৃত্বগণ ইংরেজ সরকারের প্রতি আবেদন-নিবেদন নীতিতেই বিশ্বাসী ছিলেন, সেখানে চরমপন্থীদের দাবী হল স্ব-শাসন। বলা বাহুল্য, চরমপন্থীদের নেতৃত্ব দেন বাল গঙ্গাধর তিলক। ১৯০৬ সালে বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে রাজদ্রোহিতার অপরাধে তিনি গ্রেফতার হন। ছয় বছরের কারাদণ্ড হয় তাঁর বার্মার মান্দালয় জেলে। এই দীর্ঘ সময় তিনি জেলের ভেতর লেখাপড়াতেই অতিবাহিত করেন। ‘গীতা-রহস্য’ তাঁর এই সময়ের রচিত গ্রন্থ। ১৯১৪ সালের ৮ই জুন তিনি জেল থেকে ছাড়া পান। তিলক কংগ্রেসের নরমপন্থী ও চরমপন্থী মতবাদকে একত্রীভূত করতে চেষ্টা করলেও সে চেষ্টা সফল হয় নি। অবশেষে তিনি একটি পৃথক সংগঠন স্থাপন করেন – ‘হোমরুল লীগ’। এর উদ্দেশ্য ছিল স্বরাজ। বালগঙ্গাধর তিলক গ্রামে গ্রামে ঘুরে স্বরাজের অর্থ আপামর ভারতবাসীর মনে ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে শরিক করতে চেয়েছিলেন সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে। ‘হোমরুল লীগ’ এর কার্যপদ্ধতি গ্রামে গ্রামে ঘুরে সকলকে বুঝিয়ে তাদের হৃদয়ে স্বাধীন ভারতের চিত্র অঙ্কন করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তিনি জীবদ্দশায় ক্রমাগত ভ্রমণ করে গেছেন মানুষকে সংঘটিত করার জন্য। মানুষের জন্য, দেশের স্বাধীনতার জন্য বাল গঙ্গাধর তিলকের এই আত্মত্যাগ তাঁকে মহীয়ান করে তুলেছে। 

১৮৯০ সালে তিনি  শিবাজি উৎসবের ব্যবস্থা করেন। এই উৎসব সারা ভারতে  ছড়িয়ে  পড়লে ভারতবাসীর  মনে দেশাত্মবোধ জাগ্রত হয়। 

১৯০২ এবং ১৯০৪ সালে কলকাতায় শিবাজি উৎসব পালিত হয়। কবিগুরু  রবীন্দ্রনাথ ১৯০৪ সালে শিবাজি উৎসব কবিতাটি  সভায়  পাঠ করেন। চরমপন্থীরা ১৯০৫ সালে কলকাতায় শিবাজি উৎসবের ব্যবস্থা করলে তাতে  বাল গঙ্গাধর তিলক যোগ দেন।

১৮৯৭ সাল। মহারাষ্ট্রে প্লেগ মহামারীরূপে দেখা দিল। এক বৃটীশ অফিসার – পুণে শহরে মানুষের উপর নির্দয় ব্যবহারের জন্য যিনি কুখ্যাত ছিলেন – সেই অফিসার র‍্যাণ্ড প্লেগ কমিশনার নিযুক্ত হলেন। প্লেগ দমনে র‍্যাণ্ড অত্যন্ত অশোভন আচরণ শুরু করলেন। জোর করে শহর খালি করে দিতে লাগলেন এবং গোরা সৈন্যদের নিযুক্ত করা হল প্লেগ নিবারণের জন্য। তারা বাড়ি বাড়ি ঢুকে যুবতী মেয়েদের গা টিপে দেখতে লাগল প্লেগ হয়েছে কি না। প্লেগ রোগ নির্ণয় করা এবং তার চিকিৎসা করা গোরা সৈন্যদের কাজ নয় এবং প্লেগ বেছে বেছে যুবতী মেয়েদের দেহেই বাসা বাঁধে না। গোরা সৈন্যদের বদ মতলব সম্বন্ধে মারাঠা মানুষদের মনে আর কোন সংশয় রইল না। এই ঘটনায় সমগ্র মারাঠা সমাজে প্রচণ্ড অসন্তোষ দেখা দিল ও মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। লোকমান্য তিলক তাঁর ‘কেশরী’ পত্রিকায় লিখলেন, ‘এর চেয়ে প্লেগ অনেক ভাল’। কিন্তু কিছুতেই বৃটীশ সরকার র‍্যাণ্ডকে অপসারিত করল না প্লেগ কমিশনারের পদ থেকে। অবশেষে দামোদর চাপেকার এবং তার বন্ধুরা সিদ্ধান্ত নিলেন যে সরিয়ে দিতে হবে এই ঘৃণ্য অফিসারটিকে। ১৮৯৭ সালের ২২শে জুন রাতে এল সুযোগ। রানী ভিক্টোরিয়ার রাজ্যাভিষেকের ষাট বছর পূর্তির উৎসব শেষে র‍্যাণ্ড এবং আর এক অফিসার লেফটেন্যান্ট আয়ার্স্ট যখন পুণে সরকারী ভবন থেকে ফিরছেন তখন একটি নির্জন স্থানে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে দামোদর এবং তাঁর ভাই বালকৃষ্ণ চাপেকার গুলি করে হত্যা করে তাদের। লেফটেন্যান্ট আয়ার্স্ট সঙ্গে সঙ্গে মারা যান। গুরুতর আহত অবস্থায় র‌্যান্ডকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কয়েকদিন পর র‌্যান্ডের মৃত্যু হয়।

ভারতে বিপ্লবীদের সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ সম্বন্ধে অনুসন্ধান করে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য স্যার রাউলাটের অধীনে একটি কমিশন গঠিত হয়। রাউলাট কমিটি এই হত্যাকে ভারতের প্রথম বৈপ্লবিক হত্যা বলে অভিহিত করে। এ সময়ে তিলককে এই হত্যার  প্ররোচনার দায়ে গ্রেপ্তার  করা হয়। দোষ প্রমানিত  না হলেও  তিলককে ১৮ মাস কারাদন্ড দেওয়া হয়। ১৯০৮ সালে ক্ষুদিরামের মজফ্ফরপুরে বোমা ফেলার ঘটনাকে সমর্থন করে কেশরী  পত্রিকায় জোরালো বক্তব্য  লেখার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে  রাজদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হলে ৬ বছর কারাদন্ড হয়।তাঁকে মান্দালয়ে পাঠানো হয়।

বাল গঙ্গাধর তিলক ছিলেন  ধার্মিক  মানুষ। ভারতের প্রধান ধর্মশাস্ত্র - গীতা, বেদ প্রভৃতি সম্পর্কে তাঁর গভীর  জ্ঞান ছিল। তিনি বেদের কাল নির্ণয় করেন এবং  হিন্দু  ধর্মের প্রাচীনত্ব নিয়ে 'আর্কটিক হোম ইন দি বেদস' নামক গ্রন্থ প্রকাশ করে পাশ্চাত্য দেশে সুনাম  অর্জন করেন। 'উত্তর মেরুতে  আর্যনিবাস' নামক গ্রন্থ তাঁর বিরাট অবদান।মান্দালয়ে নির্বাসনকালেই তিনি গীতা সম্বন্ধীয় পুস্তক  রচনা  করেন।

বলা বাহুল্য, বিচারে দামোদর চাপেকারের মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়। জেলে থাকাকালীন বালগঙ্গাধর তিলক দামোদরকে শ্রীমদ্ভগবৎ গীতা উপহারস্বরূপ পাঠিয়েছিলেন। ১৮৯৮ সালের ১৮ই এপ্রিল পুণের ইয়েরওয়াড়া জেলে দামোদর চাপেকারের ফাঁসি হয়। সেই সময় তাঁর হাতে ছিল গীতা এবং তিনি আবৃত্তি করছিলেন গীতার শ্লোক।

বাল গঙ্গাধর তিলক ছিলেন  কর্মযোগী পুরুষ এবং তাঁর জীবন  কর্মবহুল ছিল। একদিকে তিনি বিশাল  জাতির শিক্ষক, নেতা, কর্মযোগী, নিষ্ঠাবান  ব্রাহ্মণ, চিন্তাশীল ব্যক্তি, দৃঢ়চেতা সাংবাদিক, অপরদিকে তিনি সমাজসেবক, দেশসেবকও রাজনীতিবিদ। ১৯২০সালের ১লা আগস্ট  তাঁর দেহাবসান ঘটে। 


 





 









21 July 2021

যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি


স্বাধীনতার দাবিতে বিংশ শতাব্দীর প্রথম তিন শতকে ভারতের আকাশ বাতাস মুুখরিত হয়ে ওঠে।ভারতের শ্রেষ্ঠ  সন্তান
 দের যৌথ প্রচেষ্টায় শৃঙ্খলিত ভারতের মুক্তি  ও স্বাধীনতা আন্দোলন সে যুগে তীব্র  আকার ধারণ করেছিল। ওই সমস্ত শ্রেষ্ঠ  সন্তানদের একজন হলেন দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত। ১৮৮৫ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রামের ধরবা গ্রামে জন্মগ্রহণ  করেন।

দক্ষিণ কলকাতার একটি খেলার  মাঠ দেশপ্রিয় পার্ক বা উদ্যানটির নামকরণ হয় জাতীয়তাবাদী ব্যারিস্টার  যতীন্দ্রমোহন  সেনগুপ্তর নামে।

দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত ১৯০২ সালে হেয়ার স্কুল হতে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। ১৯০৪ সালে বিলেতে যান উচ্চশিক্ষার্থে। ১৯০৮ এ কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় হতে বি.এ. এবং ১৯০৯ সালে ব্যারিস্টারি পাশ করেন। ওখানে তার আলাপ ও প্রনয় হয় ইংরেজ মহিলা নেলী গ্রে'র সাথে। যিনি যতীন্দ্রমোহনকে ১৯০৯ সালে বিবাহ করে নেলী সেনগুপ্তা হন। নেলী সেনগুপ্তা নিজেও অসামান্য সমাজকর্মী ও দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে ভারতে সমুজ্জ্বল হয়েছেন।যতীন্দ্রমোহন ব্যারিস্টারি পাশ করে কলকাতায় আইন ব্যবসা শুরু  করেন।

যতীন্দ্রমোহন ১৯১০ সালে কলকাতা হাইকোর্টে যোগ দেন এবং আইনজীবী হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হন। মাঝে কিছুদিন রিপন কলেজে (অধুনা সুরেন্দ্রনাথ আইন কলেজ) আইনের শিক্ষকতা করেন।অগ্নিযুগের বহু বিপ্লবীকে নিশ্চিত ফাঁসির দড়ি থেকে বাঁচিয়ে এনেছেন তার অসামান্য দক্ষতায়। ১৯২৩ সালে দ্বিতীয় আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলায় তার কৃতিত্বপূর্ণ সওয়ালে সাতজন বিপ্লবী মুক্ত হন। স্বেচ্ছায় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পক্ষ নিয়ে আদালতে লড়াই করতেন। ভারতবর্ষ থেকে বার্মাকে বিচ্ছিন্ন করার প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে যোগ দিতে যতীন্দ্রমোহন রেঙ্গুন যান। সেখানে জনসমাবেশে বক্তৃতা দেয়ার সময় তিনি পুনরায় গ্রেফতার হন। যতীন্দ্রমোহন ১৯২২ সালে জাতীয় কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য হন। পরবর্তী সময়ে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ স্বরাজ পার্টি প্রতিষ্ঠা করলে যতীন্দ্রমোহন স্বরাজ পার্টিতে যোগ দেন। ১৯২৩ সালে তিনি চট্টগ্রাম থেকে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদে সদস্য নির্বাচিত হন। চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পর (১৯২৫) যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত স্বরাজ পার্টির বিশেষ অধিবেশনে দলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি মোট ৫ বার কলকাতার মেয়র হন।

১৯৩০ সালে তিনি জাতীয় কংগ্রেসের আস্থায়ী  সভাপতি  ছিলেন। ওই বছর  ২৫শে অক্টোবর   জালিয়ানওয়ালাবাগে রাজদ্রোহমূলক বক্তৃতা দেওয়ার পরে গ্রেপ্তার  হন এবং মুক্তি পেয়ে বিলেতে যান। চট্টগ্রামে পুলিশি অত্যাচার ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিলেতে গিয়ে জোরালো প্রতিবাদ করেন। তার দেওয়া তথ্য, ছবি ইত্যাদির ভিত্তিতে চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার নেলসন অপসারিত হন। এছাড়া জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ক্রেগ অবসর পুলিশ সুপার স্যুটার আত্মহত্যা করেন। ফলত সরকারের রোষানল তার ওপর পড়ে। কমিশনার টেগার্ট তখন বিলেতে ছিলেন। তিনি সরকারকে জানান যতীন্দ্রমোহন অহিংসবাদী নন। তিনি সশস্ত্র বিপ্লবীদের সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগকারী ও মদতদাতা। পুলিশ দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে বোম্বাই বন্দরে তাকে গ্রেপ্তার করে যারবেদা জেল ও পরে দার্জিলিং এ অন্তরীণ করে পাঠায়। অসুস্থ হয়ে পড়লেও উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে দেয়নি পুলিশ।১৯৩৩ সালের ২২শে জূলাই কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়।

05 May 2020

অগ্নিকন্যা প্রথম বিপ্লবী স্বাধীনতা সংগ্রামী মহিলা শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ৫ই মে জন্ম বার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

প্রথম বিপ্লবী স্বাধীনতা সংগ্রামী মহিলা শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ১৯১১ সালের ৫ই মে চট্টগ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।  ছোট বেলায় স্বপ্ন ছিল বিজ্ঞানী হবার। ছোট বেলা থেকেই পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল।  সেই সময়ে ঝাঁসীর রানী তাঁর চেতনাকে উদ্দীপ্ত করে। প্রীতিলতা চট্টগ্রামের খাস্তগীর বালিকা বিদ্যালয় থেকে ১৯২৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন। এরপর তিনি ১৯২৯ সালে ঢাকা ইডেন মহিলা কলেজে ভর্তি হন এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে প্রথম স্থান অধিকার করেন। এর দুই বৎসর পর প্রীতিলতা কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে দর্শনশাস্ত্রে ডিস্টিংশনসহ গ্রাজুয়েশন করেন।গ্রাজুয়েশন করার পর তিনি চট্টগ্রামের নন্দনকানন অপর্ণাচরণ নামে একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন
১৯৩০ সালে সমগ্র বাংলা জুড়ে অনেক বিপ্লবী দল সংগ্রামরত ছিল। ঐসব দলের সদস্যরা বিশ্বাস করত যে, কেবল সশস্ত্র বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ভারতের স্বাধীনতা অর্জিত হতে পারে। এক্ষেত্রে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের গোপন দলিলপত্র পাঠ থেকে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার বিপ্লবে উদ্বুদ্ধ হন। প্রীতিলতার এক ভাই মাস্টারদাকে তাঁর বিপ্লবী চেতনা সম্পর্কে অবহিত করেন। প্রীতিলতা সূর্যসেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী দলের প্রথম মহিলা সদস্য হন। তিনি টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ অফিস ধ্বংস এবং রিজার্ভ পুলিশ লাইন দখল অভিযানে যুক্ত ছিলেন। তিনি জালালাবাদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রীতিলতা পাহাড়তলীতে ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
‘কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষিদ্ধ’ এইরূপ অবমাননামূলক কথার জন্য ক্লাবটির দুর্নাম ছিল। ক্লাব আক্রমণ সফল করে পুরুষবেশী প্রীতিলতা সামরিক কায়দায় তাঁর বাহিনীকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এই সময়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হলে পটাসিয়াম সায়ানাইড খেয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর আত্মদান বিপ্লবীদের সশস্ত্র সংগ্রামে আরো উজ্জিবিত করে তোলে।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

02 May 2020

সত্যজিৎ রায়ের ৯৯ তম জন্ম বার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

আজ ২রা মে, ২০২০ সত্যজিৎ রায়ের  ৯৯ তম জন্ম বার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।
সত্যজিৎ রায়কে আমরা শুধু একজন আন্তর্জাতিক খ্যতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রকার হিসাবে সম্মান জানাই তা নয় বাংলা এবং বাঙালিকে যে সব মহামানব সারা বিশ্বে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি তাঁদের মধ্যে একজন।

সত্যজিৎ রায় বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছেন।১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি ২৮টি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন যা বিশ্বের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। ১৯৯২ সালে চরম অসুস্থার সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'লাইফ টাইম এচিভমেন্টের' জন্য অস্কার পুরস্কার পান। অসুস্থতার কারণে তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকততে না পারার দরুন অনুষ্ঠানের কর্তারা  শয্যাশায়ী সত্যজিৎ রায়ের কাছে গিয়ে  পুরস্কার প্রদান করেন। এটা টিভিতে লাইভ সম্প্রচারনও করা হয়।

পিতা সুকুমার রায় ও ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী-

সত্যজিৎ রায়ের জন্ম  কলকাতায় বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য শালী রায় পরিপবারে ১৯২১ সালের ২ রা মে। পিতা সুকুমার রায় ও পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীছি লেন স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব। গড়পারের  বাড়িতে এক তলায় ছিলউ পেন্দ্রকিশোরের ছাপাখানা। সেখানেই চলত 'সন্দেশ' পত্রিকার লেখা ছাপান, বাঁধান।ছেলেবেলায় এই সব দেখতে দেখতেই সত্যজিৎ বেড়ে ওঠে এবং ইচ্ছে জাগে পত্রিকার জন্য লিখতে এবং আঁকতে।তাই তিনি কাগজে কিছু এঁকে বুড়ো চাকর রামদহনের হাতে দিতেন  'সন্দেশ' পত্রিকায় ছাপানোর জন্য।

শিক্ষাও কর্মজীবন-
সত্যজিতের বয়স যখন তিন বছর তখন পিতা সুকুমার রায় মারা যান। সত্যজিতের জন্মের ছবছ র আগে মারা যান ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। সুতরাং সত্যজিতের লালন পালনের দায়িত্ব এসে পড়ে মাতা সুপ্রভা দেবীর ওপর। মা সুপ্রভা দেবী সত্যজিৎকে রাত্রে কোনান ডয়েলের গল্প  বাংলায় শোনাতেন।
১৯৩৬ সালে সত্যজিৎ ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাশ করেন। ১৯৪০ সালে প্রেসিডেন্সি  কলেজ থেকে গ্রাজুয়েট হন। এরপর  রবীন্দ্রনাথের  শান্তিনিকেতনে কিছুদিন  কাটিয়ে চিত্রশিল্পে পারদর্শিতা অর্জন করেন। কলকাতায় ফিরে এসে কমার্শিয়াল  আর্টিস্ট  হিসাবে সিগনেট প্রেসে যোগদান করেন। এই সময় সিগনেট প্রেস থেকে প্রকাশিত  হয় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ' পথের পাঁচালি' উপন্যাস।

সত্যজিৎ রায়ের বাবা সুকুমার রায় ছিলেন বাংলা রম্য এবং শিশুসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভা। সাহিত্যিক হিসাবে তিনি
একসময়  কিংবদন্তী জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। সত্যজিৎ রায়ের ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীও ছিলেন একজন নামকরা লেখক, চিত্রকর, দার্শনিক ও প্রকাশক। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর প্রথম স্ত্রী মারা যাবার পর তিনি বিয়ে করেন কাদম্বিনী দেবীকে। দ্বিতীয় স্ত্রী কাদম্বিনী দেবী ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮৮২ সালে প্রথম মহিলা গ্রাজুয়েট। এর পরে কাদম্বিনী বসু ডাক্তার হয়ে ছিলেন।  সত্যজিতের মা এবং রায় বংসের অন্য নারীদের জীবনেও সুগভীর প্রভাব ছিল এই নারীর। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী তার সমবয়সী রবীন্দ্রনাথের তিনি অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং প্রায়সই তিনি জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে যাতায়াত  করতেন।

বিখ্যাত ফরাসি চিত্র পরিচালক জাঁ রেনোয়া ১৯৫০ সালে কলকাতায় আসেন তাঁর ছবি 'রিভার' এর দৃশ্য গ্রহণ করার জন্য। সত্যজিৎ রায় তাঁর সাথে দেখা করেন এবং  আলাপচারিতার মাধ্যমে আধুনিক চলচ্চিত্র শিল্প সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন।এই সময় সত্যজিৎ ডি. জে.  কিমার কোম্পানিতে আর্ট ডিরেক্টর হিসাবে কাজ করছিলেন। তখন সত্যজিৎ প্রথমবার ইংল্যান্ড যাবার সুযোগ পান। ১৯৫০ সালে সত্যজিৎ সস্ত্রীক ইংল্যান্ডে যান।। সেখানে তিনি দেখেন 'বাই সাইকেল থীভস'।  এর পর চার মাসে তিনি ৯৯ টি বই দেখেন। চলচ্চিত্র পরিচালনা করার একটা ইচ্ছা তীব্রতা বাড়তে থাকে 'বাই সাইকেল থীভস' দেখার পর। ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পথে সত্যজিৎ পথের পাঁচালির চিত্রনাট্য  লিখে ফেলেন। প্রথম দিকে ছবির প্রযোজক না পাওয়ায় নিজের অর্থের ওপর নির্ভর  করে ছবিটি  শুরু  করেন। পরে পশ্চিমবঙ্গ-এর মুখ্যমন্ত্রী ডঃ বিধান চন্দ্র রায়ের আর্থিক সাহায্যে  ছবির কাজ শুরু হয়।১৯৫৫ সালের মাঝামাঝি  সময় ছবিটি মুক্তি পায়। পরের বছর
কান চলচ্চিত্র  উৎসবে পথের পাঁচালি পুরস্কার পায়। এর পরে  সত্যজিৎকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি।এরপর একের পর একটা ছবি করে চলেন। পথের পাঁচালি, অপরাজিত এবং অপুর সংসার এই তিনটি একত্রে অপু ত্রয়ী নামে পরিচিত। এই ত্রয়ী সত্যজিতের
জীবনের শ্রেষ্ঠ কর্মজীবন হিসেবে স্বীকৃত। অপুর ট্রিলজি গোটা পৃথিবীর মানুষ কে একটা চিরন্তন সত্যের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। জীবনে দুঃখ, কষ্ট,মৃত্যু, যন্ত্রণা থাকলেও জীবন থেমে থাকে না। সত্যজিৎ রায় স মাজের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতাথেকেই একের পর এক ছবি করে গেছেন। নির্মাণ করেন, পরশ পাথর , জলসা ঘর(জমিদারি প্রথার অবক্ষয় নিয়ে নির্মিত ‘জলসাঘর’)।  অপুর সংসার, অভিযান, মহানগর,
কাপুরুষ ও মহাপুরুষ , নায়ক, গুপি গাইন বাঘা বাইন      (উপেন্দ্রকিশোরের গল্প অবলম্বনে)। অরণ্যের দিন রাত্রি, সীমাবদ্ধ, অশনি সংকেত সোনার কেল্লা, জন অরণ্য, শতরঞ্জ কি খিলাড়ী, জয় বাবা ফেলুনাথ, হীরক রাজার দেশে, ঘরে বাইরে, গণশত্রু, শাখা প্রশাখা এবং সর্বশেষ বানানো সত্যজিতের সিনেমার নাম আগুন্তুক।

সত্যজিৎ রায় কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের ওপর একটি  তথ্যচিত্র  নির্মান করেন। ১৯৬১ সালে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সাথে যুগ্ম সম্পাদনায় 'সন্দেশে'র পুনঃ প্রকাশ  শুরু করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি গুরুতর ভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। আমেরিকায় গিয়ে বাইপাস সার্জারি  করেন এবং বুকে পেসমেকার বসান। তারপরও তিনি একাধিক  ছবির  কাজ করে গেছেন।

১৯৯২ সালের ২৩ শে এপ্রিল চিরনিদ্রায়  ঢলে পড়েন এই মহান ব্যক্তিত্ব। ভারত  সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ সন্মান 'ভারতরত্ন' উপাধিতে ভূষিত করেছিল।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।






30 April 2020

আনন্দময়ী মা আধ্যাত্মিক সাধিকার জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

আনন্দময়ী মা ছিলেন একজন  আধ্যাত্মিক সাধিকা ১৮৯৬ সালের ৩০ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার খেওড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল একই জেলার  বিদ্যাকুট গ্রামে। পিতা বিপিনবিহারী ভট্টাচার্য মুক্তানন্দ গিরি নামে সন্ন্যাসজীবন গ্রহণ করেন।

আনন্দময়ী মায়ের প্রথম জীবনে নাম ছিল নির্মলা। তাঁর জন্মের আগে চার ছেলে জন্মেছিল তাঁর মায়ের। কিন্তু একজনও বাঁছেনি। এরপরেই নাতি চেয়ে  জাগ্রত কালী বাড়ির দোর ধরেন নির্মলার ঠাকুমা। কিন্তু দেবী তাঁকে জানান, ছেলে নয়, মেয়ে আসবে তাঁর পরিবারে। মা অন্নপূর্ণা রূপে। একই সঙ্গে নির্মলার মা স্বপ্নে নির্দেশ পান বিষ্ণুর অবতার জন্ম নেবে তাঁর গর্ভে। জন্মের দিন প্রবল ঝড়-বৃষ্টি সকাল থেকে। কিন্তু মায়ের জন্মের ঠিক আগে মেঘ কেটে আলোয় আলো চারিদিক। তারপরেই মায়ের কোল আলো করে জন্ম নেয় নির্মলা। নবজাতকের রূপ দেখে পরিবার  নাম রেখেছিলেন নির্মলা।

ছোট থেকেই যাঁর জীবন ঈশ্বরের লীলাক্ষেত্র। আনন্দময়ী মা শিশু অবস্থা থেকেই ঈশ্বরের নানা রূপ দেখতে পেতেন। শোনা যায়, তাঁর জন্মলগ্নে গ্রহনক্ষত্রের অবস্থানই ঠিক করে দিয়েছিল যে তিনি সাধারণ নন। তাঁর মধ্যে ঈশ্বরচেতনার বিকাশ হয় শৈশব থেকেই। তিনি বলতেন, ”খণ্ড আনন্দে প্রাণ তৃপ্ত হইতেছে না, তাই মানুষ অখণ্ড আনন্দ পাইবার জন্য অখণ্ডের সন্ধান করিতেছে।’ এই আনন্দের জন্যই তাঁর জীবন কেটেছে সাধনায়। কৈশোরে এবং পরবর্তীকালে বিবাহিত জীবনেও তিনি ভাবজগতে বেশিরভাগ সময় ডুবে থাকতেন বলে জানা যায়। তিনি বলতেন 'সংসারটা ভগবানের; যে যে অবস্থায় আছে, সেই অবস্থায় থেকে কর্তব্যকর্ম করে যাওয়া মানুষের কর্তব্য।’ সংসারীদের জন্য আনন্দময়ী মা বলতেন ভগবানের নাম নেবার জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করতে। সারাদিনের ২৪ ঘন্টার মধ্যে, মাত্র ১ ঘন্টার ৪ ভাগের এক ভাগ সময় অর্থাৎ নির্দিষ্ট ১৫ মিনিট সময় নির্ধারণ করে ভগবানের নাম নিতে। সে সময় যেখানেই থাকো সেখানেই ঈশ্বরের নাম নেবে বা স্মরণ বা ধ্যান করবে। সেই সময়টা শুধু মাত্র ঈশ্বরের জন্য, সে সময় মুখে কথা বলবে না। মৌন থাকবে।

আন্দময়ীর প্রকৃত নাম নির্মলা সুন্দরী; দাক্ষায়ণী, কমলা ও বিমলা নামেও তিনি পরিচিত ছিলেন। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না বললেই চলে। ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে বিক্রমপুরের রমণীমোহন চক্রবর্তীর সঙ্গে তার বিবাহ হয়। স্বামীও পরবর্তীকালে সন্ন্যাস গ্রহণ করে ভোলানাথ নামে পরিচিত হন। রমণীমোহন ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকার নবাবের বাগানের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হলে নির্মলা তার সঙ্গে শাহবাগে চলে আসেন এবং সিদ্ধেশ্বরীতে কালীমন্দির (১৯২৬) প্রতিষ্ঠা করে ধর্মকর্মে আত্মনিয়োগ করেন।এই মন্দিরেই একদিন দিব্যভাবে মাতোয়ারা নির্মলা আনন্দময়ী মূর্তিতে প্রকাশিত হন এবং তখন থেকেই তাঁর নাম হয় আনন্দময়ী মা। প্রথম প্রথম তাঁর ভাবসমাধির কারণ বুঝতে পারতেন না কাছের লোকজন। কিন্তু আস্তে আস্তে তাঁর স্বামীও আনন্দময়ী মায়ের মধ্যে ঈশ্বরচেতনাকে উপলব্ধি করেন। শোনা যায় তাঁর স্বামী বাবা ভোলানাথ, কালীপুজোর সময়ে আনন্দময়ীকেও একই রূপে দেখতেন এবং তখন তিনিও আনন্দময়ীকে মা রূপে পুজো করতেন।

ঢাকার রমনায় তাঁর আশ্রম গড়ে ওঠে। তাঁর আধ্যাত্মিক ভাবধারায় অনেক গুণিজন আকৃষ্ট হন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুজন হলেন মহামহোপাধ্যায় গোপীনাথ কবিরাজ এবং ডাক্তার ত্রিগুণা সেন। মা আনন্দময়ীনৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্করও নৃত্য সম্পর্কে আনন্দময়ীর বিশ্লেষণ শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন। আনন্দময়ীর মতে জগৎটাই নৃত্যময়; জীবের মধ্যে যে প্রাণের স্কন্দন, এমনকি বীজ থেকে যখন অঙ্কুরোদগম হয় তখন সেখানেও এক ধরনের তরঙ্গময় নৃত্যের সৃষ্টি হয়। এই তরঙ্গরূপ নৃত্য যে মূল থেকে উদ্ভূত হয়, একসময় স্তিমিত হয়ে আবার সেই মূলেই মিলিয়ে যায়। এই রূপকের মধ্য দিয়ে তিনি মূলত জীবাত্মা ও পরমাত্মার সম্পর্ককেই নির্দেশ করেছেন
১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে আনন্দময়ী স্বামীর সঙ্গে উত্তর ভারতের দেরাদুনে চলে যান এবং সেখানে তাঁর লীলাক্ষেত্র ক্রমশ সম্প্রসারিত হয়। তিনি মানুষকে আধ্যাত্মিক ভাবে উদ্বুদ্ধ করার জন্য উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থান পরিভ্রমণ করেন। তাঁর একটি বিশেষ কীর্তি হলো প্রাচীন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তীর্থস্থান নৈমিষারণ্যের পুনর্জাগরণ ঘটানো। সেখানে গিয়ে তিনি নতুন করে মন্দির স্থাপন এবং যজ্ঞ, কীর্তন, নাচ-গান ইত্যাদির মাধ্যমে ভগবৎসাধনার ক্ষেত্র তৈরি করেন। এভাবে মানুষকে সুন্দর জীবনযাপনে অভ্যস্ত করার উদ্দেশ্যে তিনি ভারতের বিভিন্ন স্থানে পুরাতন তীর্থসমূহের সংস্কার সাধন এবং নতুন নতুন তীর্থস্থান প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশের রমনা ও খেওড়াসহ ভারতের বারাণসী, কনখল প্রভৃতি স্থানে তার নামে আশ্রম, বিদ্যাপীঠ, কন্যাপীঠ, হাসপাতাল ইত্যাদি গড়ে উঠেছে। তাঁর নামে এরূপ মোট ২৫টি আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়েছ।  ১৯৮২ সালের ২৭ আগস্ট ৮৭ বছর বয়সে   তিনি দেহত্যাগ করেন। তাঁর মরদেহ উত্তর ভারতের হরিদ্বারে কনখল আশ্রমে গঙ্গার তীরে সমাধিস্থ হয়।শোনা যায় আনন্দময়ী মা-কে তাঁর ভক্তরা কখনও ছিন্নমস্তার মূর্তিতে, কখনও ভুবনেশ্বরী মূর্তিতে আবার কখনও বা সরস্বতী রূপে দেখেছিলেন।

 ১৯৮২ সালে মহাসমাধিতে বিলীন হওয়ার পরে ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছিলেন, ”আমার জীবনে মা আনন্দময়ীর আশীর্বাদ ছিল প্রধান শক্তি ও ভরসা। আজ আমার মর্মবেদনা জানাবার ভাষা নেই।”

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।




23 April 2020

২৩শে এপ্রিল, ভারতের তথা বিশ্ব চলচ্চিত্র জগতের পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, শিল্প নির্দেশক, সঙ্গীত পরিচালক সত্যজিৎ রায়ে ২৮ তম মৃত্যুবার্ষিকী।

২৩শে এপ্রিল, ২০২০ সাল কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের ২৮ তম  মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি। ২৩শে এপ্রিল, ভারতের তথা বিশ্ব চলচ্চিত্র জগতের পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, শিল্প নির্দেশক, সঙ্গীত পরিচালক সত্যজিৎ রায়ে ২৮ তম মৃত্যুবার্ষিকী। চলচ্চিত্র নির্মাণের বাইরে তিনি ছিলেন একাধারে লেখক, প্রকাশক,অনুবাদক, কাহিনীকার, চিত্রকর, গ্রাফিক নকশাবিদ ও চলচ্চিত্র সমালোচক।

১৯২১ সালের ২রা মে কলকাতা শহরের ১০০ নম্বর গড়পার রোডের এক খ্যাতনামা বাঙালি পরিবারে জন্মেছিলেন সত্যজিৎ রায়।  এই বাড়ির একতলাতেইছিল ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ছাপাখানা। সত্যজিতের পৈতৃক বাড়ি বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে। চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে সত্যজিৎ ছিলেন বহুমুখী এবং তাঁর কাজের পরিমাণ বিপুল। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সত্যজিৎ চিত্রনাট্য রচনা, চরিত্রায়ন, সঙ্গীত স্বরলিপি রচনা, চিত্রগ্রহণ, শিল্প নির্দেশনা, সম্পাদনা, শিল্পী-কুশলীদের নামের তালিকা ও প্রচারণাপত্র নকশা করা সহ নানা কাজ করেছেন।

মানিক

সত্যজিৎ রায়ের জন্মের ছ বছর আগে মারা যান ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোর রায়। আর সত্যজিৎ রায়ের বয়স যখন  তিন  বছর তিনি তাঁর পিতা সুকুমার  রায়কে হারান। তাঁরা রেখে গিয়েছিলেন পারিবারিক ঐতিহ্যের সার্থক উত্তরাধিকারী বিশ্বসেরা  সত্যজিৎ রায়েকে। তবে তারা কেউই সত্যজিৎ রায়ের সাফল্য দেখে যেতে পারেননি।

বিধবা সুপ্রভবা দেবী ও পারিবারের  অন্যান্যদের সহচর্যে ছোট্ট সত্যজিৎ বড় হতে থাকলেন।

সত্যজিৎ রায়ের ডাক নাম ছিল মানিক। ' যখন ছোট ছিলাম ' গ্রন্থে  সত্যজিৎ  লিখেছিলেন- 'আমি যখন ইস্কুলে ভর্তি হই তখন আমার বয়স সাড়ে আট'। ফিফথ ক্লাসে (পরে নাম হয়েছিল ক্লাস সিক্স) ভর্তি হবার জন্য সত্যজিৎ লেবুমামার সাথে হাজির হন বালিগঞ্জ গভর্ণমেন্ট হাইস্কুলে।সেখানে ক্লাসের একটি ছেলে সত্যজিতের নাম জানতে চায়। সত্যজিৎ তখন তাকে তাঁর ডাক নাম বলেন ' মানিক'। সত্যজিতের তখন ধারণা ছিল না চট করে ইস্কুলে নিজের ডাক নাম বলতে নেই। তখন থেকে ইস্কুলে ছেলেরা তাঁকে ভালো নাম ধরে ডাকেনি সেই থেকেই সত্যজিৎ হয়ে গেল মানিক বা আমাদের  সকলের প্রিয় মানিকদা।

পিতা সুকুমার রায় ও ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী

সত্যজিৎ রায়ের বাবা সুকুমার রায় ছিলেন বাংলা কবিতা ও শিশুসাহিত্যের সেরা লেখকদের একজন। সত্যজিৎ রায়ের দাদামশাই উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীও ছিলেন একজন নামকরা লেখক, চিত্রকর, দার্শনিক ও প্রকাশক।উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী দ্বিতীয় স্ত্রী কাদম্বিনী দেবী ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮৮২ সালে প্রথম মহিলা গ্রাজুয়েট। এর পরে কাদম্বিনী বসু ডাক্তার হয়ে ছিলেন।  সত্যজিতের মা এবং রায় বংসের অন্য নারীদের জীবনেও সুগভীর প্রভাব ছিল এই নারীর। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী তার সমবয়সী রবীন্দ্রনাথের তিনি অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং প্রায়সই তিনি ঠাকুর বাড়িতে যাতায়াত  করতেন।

মাত্র তিন বছর বয়সে বাবাকে হারান সত্যজিৎ। মা সুপ্রভা দেবী বহু কষ্টে তাঁকে বড় করেন। বিশ্বখ্যাত রত্ন সত্যজিৎ বড় হয়ে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতি পড়তে যান। ১৯৪০ সালের দিকে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকবছর পড়াশোনা করেন তিনি। ১৯৪৩ সালে শান্তিনিকেতন ছেড়ে তিনি কলকাতায় এসে ৮০ টাকা বেতনে একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ শুরু করেন।

তাঁর কর্মজীবন একজন বাণিজ্যিক চিত্রকর হিসেবে শুরু হলেও পরে লণ্ডন শহরে সফরকালে ইতালীয় চলচ্চিত্র দেখার পরই তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণে উদ্বুদ্ধ হন।

সত্যজিৎ রায় প্রায় ৩৭ টি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। এরমধ্যে রয়েছে কাহিনীচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। তিনি ছিলেন একজন ঔপন্যাসিক, প্রকাশক এবং চলচ্চিত্র সমালোচকও।

'পথের পাঁচালি'

১৯৫৫ সালে সত্যজিৎ রায় পথের পাঁচালি নির্মানের কাজ শেষ করেন। সেই ছবি এখনও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা দেয়। ১৯৪৯ সালে মার্চ মাসে জাঁ রেনেয়োঁর কলকাতায় আসেন তার 'দি রিভার' ছবির শুটিং করতে। এর পর থেকেই সত্যজিৎ তাঁর সাথে দেখা করতে যেতেন। তাঁদের সাথে আলোচনা হত। রেনেয়োঁর সংস্পর্শে এসে সত্যজিতের মনে গভীর ভাবে চলচ্চিত্র পরিচালনা করার একটা ইচ্ছা সযত্নে বাড়তে থাকে। ১৯৫০ সালে সত্যজিৎ সস্ত্রীক ইংল্যান্ডে যান।। সেখানে তিনি দেখেন 'বাই সাইকেল থীভস'। এর পর চার মাসে তিনি ৯৯ টি বই দেখেন। চলচ্চিত্র পরিচালনা করার একটা ইচ্ছা তীব্রতা বাড়তে থাকে 'বাই সাইকেল থীভস' দেখার পর।

১৯৫১ সালে ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পথে পথের পাঁচালির চিত্রনাট্য লিখতে শুরু করেন সত্যজিৎ। সত্যজিতের স্ত্রী বিজয়া রায়ের কাছ থেকে জানা যায় পথের পাঁচালি যে কত কষ্ট করতে হয়েছে তা ভাবলে এখন গল্পের মতন লাগে। প্রযোজকের বাড়ি গিয়ে চিত্রনাট্য পড়ে শোনাতে হত। অনেকে ঠাট্টা তামাশাও করতেন। এখানে নাচ নেই, গান নেই, প্রেমিক প্রেমিকা নেই, এ ছবি চলবে কি করে? এর মধ্যে একজন প্রযোজকের পছন্দ হল। কিন্তু বাজারে ভদ্রলোকের ছবি সবে মাত্র মুক্তি পেয়েছে। তার ছবি চললে তিনি মানিকের ছবি নিয়ে ভাববেন। দুর্ভাগ্যবশত ছবিটা বাজারে চলেনি, ফলে তিনি আর মানিকের ছবিটা করতে রাজি হলেন না। তাই শুরু হল নিজের টাকায় শুটিং। এর পর তার প্রথম ছবি পথের পাঁচালির শুটিং শুরু করেন ১৯৫২ সালের অক্টোবর মাস থেকে। বিজয়া রায়ের জন্ম দিন ২৭শে অক্টোবর  অপু দুর্গাকে নিয়ে কাশফুলের ক্ষেতে শুরু হয় শুটিং। টাকা ফুরিয়ে এলে বিজয়া রায়ের গয়না বন্ধক দিয়ে অর্থের জোগার হয়। মাঝে শুটিং বন্ধ হয়ে গেলে সত্যজিৎ রায় মহা চিন্তায় পড়লেন।চুনিবালা দেবী  বৃদ্ধা।  তার কিছু হলে পথের পাঁচালি বন্ধ করে দিতে হবে। অপু দুর্গার যা বয়স ছিল দেরী হয়ে বয়স বেড়ে গেলে তাদের আর চরিত্রে মানাবেনা। প্রায় তিন মাস শুটিং বন্ধ থাকার পর পশ্চিম্বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ডক্টর বিধান চন্দ্র রায়ের সহযোগিতায় টাকার যোগান হয়।

‘পথের পাঁচালি’ সিনেমা নির্মাণের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ রায়ের যাত্রা শুরু। তাঁর নির্মিত পথের পাঁচালি ১১টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করে। এর মধ্যে অন্যতম ১৯৫৬ কান চলচ্চিত্র উৎসবে পাওয়া “শ্রেষ্ঠ মানব দলিল” পুরস্কার।

পথের পাঁচালি, অপরাজিত এবং অপুর সংসার এই তিনটি একত্রে অপু ত্রয়ী নামে পরিচিত। এই ত্রয়ী সত্যজিতের জীবনের শ্রেষ্ঠ কর্মজীবন হিসেবে স্বীকৃত। অপুর ট্রিলজি গোটা পৃথিবীর মানুষ কে একটা চিরন্তন সত্যের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। জীবনে দুঃখ, কষ্ট,মৃত্যু, যন্ত্রণা থাকলেও জীবন থেমে থাকে না। এই ছবিতে তারই ইতি বাচক সন্ধান আমরা পাই। অনেকে মনে করেন পথের পাঁচালি কান চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার পাওয়ার পরে আমাদের দেশে সন্মান পেয়েছে। ছ সপ্তাহ বসুশ্রী হলে  ভিড় উপচে পড়ে পরে ছবিটি ইন্দিরা হলে নিয়ে যাওয়া  হয়। সেখানেও ভিড় উপচে পড়ে। ১৯৪৯ সালে দীর্ঘদিনের পরিচিত বিজয়া দাসকে তিনি বিয়ে করেন। সত্যজিৎ-বিজয়ার ছেলে সন্দীপ রায়ও বর্তমানে একজন নামকরা চলচ্চিত্র পরিচালক।

সত্যজিৎ রায় সমাজের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতাথেকেই একের পর এক ছবি করে গেছেন। এরপর একে একে নির্মাণ করেন, পরশ পাথর , জলসা ঘর(জমিদারি প্রথার অবক্ষয় নিয়ে নির্মিত ‘জলসাঘর’)।  অপুর সংসার, অভিযান, মহানগর, কাপুরুষ ও মহাপুরুষ , নায়ক, গুপি গাইন বাঘা বাইন , অরণ্যের দিন রাত্রি, সীমাবদ্ধ, অশনি সংকেত সোনার কেল্লা জন অরণ্য, শতরঞ্জ কি খিলাড়ী, জয় বাবা ফেলুনাথ, হীরক রাজার দেশে, ঘরে বাইরে, গণশত্রু, শাখা প্রশাখা এবং সর্বশেষ বানানো সত্যজিতের সিনেমার নাম আগুন্তুক। সত্যজিতের অমর সৃষ্টি ‘ফেলুদা’ তাঁর সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর বয়ে চলছে যুগ থেকে যুগান্তরে।

জলসা ঘর, দেবী ও কাঞ্চনজঙঘা সমাজ চেতনার তিনটি আসামান্য সৃষ্টি। ১৯৬২ সালে সত্যজিৎ ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ নামে প্রথম মৌলিক চিত্রনাট্যনির্ভর রঙিন চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। দার্জিলিংয়ের এক পাহাড়ি এলাকায় একটি উচ্চবিত্ত পরিবারে কাটানো এক বিকেলের কাহিনি নিয়ে জটিল ও সংগীতনির্ভর এই ছবিটি বানিয়েছিলেন তিনি।

পরস পাথর- এ তিনি হাসি-মজাও কারুণ্যের মধ্যেদিয়ে মধ্যবিত্তের অর্থলোভ, বড়োলোক হবার বাসনাকে সুন্দর ভাবে ব্যঙগ করেছেন।‘পরশপাথর’ নামের হাস্যরসাত্মক একটি ছবি। আর পরেরটি ছিল এর বাইরে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিয়ে সত্যজিৎ রায়ের ছবিগুলো হচ্ছে ‘দেবী’ (১৯৬০), ‘তিন কন্যা’ (১৯৬১) ও ‘অভিযান’ (১৯৬২)।

শতরঞ্জ কি খিলাড়ীতে তিনি বিদেশি শক্তির সাথে উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণীর ও রাজতন্ত্রের সহযোগীতা এবং এই শ্রেণীর সুবিধাবাদী চরিত্র।বাংলা চলচ্চিত্রের বাইরে সত্যজিৎ রায় ১৯৭৭ সালে ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’ নামের হিন্দি ও উর্দু সংলাপনির্ভর একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এটিই ছিল বাংলা ভাষার বাইরে অন্য ভাষায় নির্মিত সত্যজিৎ রায়ের প্রথম চলচ্চিত্র। শুধু তা-ই নয়, ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’ হচ্ছে সত্যজিৎ রায় নির্মিত সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও তারকাসমৃদ্ধ ছবি। ছবিটিতে অভিনয় করেছিলেন সঞ্জীব কুমার, সাইদ জাফরি, আমজাদ খান, শাবানা আজমি, ভিক্টর ব্যানার্জি ও রিচার্ড অ্যাটেনবরোর মতো তারকা অভিনয়শিল্পীরা।

গুপি গাইন বাঘা বাইনে বিরোধী শক্তির কথা বলেছেন। আর পরবর্তী ছবি হীরক রাজার দেশেতে দেখিয়েছেন মানুষের কাছে ফিরে আসার কথা বলেছেন সত্যজিৎ।

১৯৬৪ সালে সত্যজিৎ নির্মাণ করেন ‘চারুলতা’। যেটি ছিল তাঁর কর্মজীবনের সফল ছবি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প ‘নষ্টনীড়’ অবলম্বনে নির্মিত ছবিটিতে উনিশ শতকের এক নিঃসঙ্গ বাঙালি বধূ চারু ও ঠাকুরপো অমলের প্রতি তার অনুভূতির কাহিনি বাস্তব জীবনের নিরিখে নির্মাণ করা হয়েছে। ‘

'ঘরে বাইরে'

পথের পাঁচালির আগে সত্যজিৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘরে বাইরে (১৯১৬ সালের) উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র করতে চেয়েছিলেন। সে জন্য সত্যজিৎ ঘরে বাইরে' র প্রথম চিত্রনাট্য লিখে ফেলেন। নানা কারণে তখন ছবিটি করা হয়ে ওঠেনি।সত্যজিতের তরুণ  বয়সের ভাবনা নিয়ে ঘরে বাইরে' বাস্তবে রূপ পেয়েছিল ৩৯ বছর পর। এর ফলে ঘরে বাইরে' নিয়ে ভাবনার অনেক গর্বেষণা করার সুযোগ পেয়েছিলেন। এর ফল স্বরূপ একটি নিখুঁত ছবি ১৯৮৪ সালে তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে।১৯৮৩ সালে ছবির কাজ করার সময় সত্যজিৎ হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত। এরপর তাঁর কাজের গতি একেবারে কমে আসে। স্বাস্থ্যের অবনতির ফলে ছেলে সন্দীপ রায়ের সহায়তায় ১৯৮৪ সালে সত্যজিৎ রায় ‘ঘরে বাইরে’ ছবিটির নির্মাণকাজ সমাপ্ত করেন।

সত্যজিতের ৩৬ বছর চলচ্চিত্র জীবনে মোট ২৭টি ফিচার ফ্লিম ও ৫ টি তথ্যচ্চিত্র করে ছিলেন। ১৯৬১ সালে প্রথম তথ্যচ্চিত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যা নতুন দিগন্তের আলো দেখিয়েছিল।

সন্দেশ  ও লেখক সত্যজিৎ

উপেন্দ্রকিশোরের অন্যতম শ্রেষ্ঠকীর্তি হল ১৩২০ সালের ছোটদের "সন্দেশ" পত্রিকার প্রকাশ। সেই সময় ঐ রকম একটা সুন্দর ছোটদের মাসিক পত্রিকার কথা কেউ কল্পনা করতে পারত না। ১৯৬১ সালের মে মাসে সত্যজিৎ রায় বন্ধু কবিসুভাষ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে সত্যজিৎ 'সন্দেশ' পত্রিকার প্রকাশ পুনরায় করেন। তিনি নিজের বাড়িতে বসেই নিয়মিত 'সন্দেশ' এর লেখা, ছাপা, মলাট, ছবি আর লে আউট যত্নের সাথে তৌরী করে দিতেন।

সন্দেশের প্রয়োজনেই সত্যজিৎ চল্লিশ বছর বয়সে তার লেখক জীবন শুরু করেন।

নতুন ম লাট,  ছবি আর হেড পিস তিনি আকতে লাগলেন। ১৯৬৫ সালে তিনিতার লেখা শঙকুর কয়েকটি গল্প নিয়ে প্রথম প্রকাশিত হ ল 'প্রফেসর শঙকু' নামের বইটি। এই বইটি কিশোর গ্রন্থ রূপে একাডেমি পুরস্কার পান। সন্দেশের প্রয়োজনে 'ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি' নামে আর একটি উপন্যাস লেখেন।

১৯৪৭ সালে সত্যজিৎ চিদানন্দ দাসগুপ্ত ও অন্যান্যদের সঙ্গে মিলে কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন।সত্যজিতকে অন্যতম সাংস্কৃতিক আইকন হিসেবেও গণ্য করা হয়।

ফ্রান্সের সরকার ১৯৮৭ সালে তাঁকে সেদেশের বিশেষ সম্মনসূচক পুরস্কার ‘লেজিওঁ দনরে’ প্রদান করেন। ১৯৮৫ সালে অর্জন করেন ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র পুরস্কার দাদাসাহেব ফালকে। ১৯৯২ সালে ভারত সরকার তাকে দেশের সর্বোচ্চ পুরস্কার ভারত রত্ন সম্মাননা প্রদান করে। এছাড়াও তিনি পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।

১৯৯২ সালে মৃত্যুর কিছুদিন আগে একাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস (অস্কার) তাঁকে আজীবন সম্মান পুরস্কার প্রদান করে। মৃত্যুর কিছুদিন আগে ভারত সরকার তাঁকে ভারতরত্ন প্রদান করে। মৃত্যুর পর তাঁকে মরণোত্তর আকিরা কুরোসাওয়া পুরস্কার প্রদান করা হয়।

সেবছর প্রখ্যাত ফরাসি পরিচালক জ্যঁ রেনোয়া তার ‘দ্য রিভার’ চলচ্চিত্রটির শুটিং করতে কলকাতায় এসেছিলেন। ‘দ্য রিভার’ ছবিতে রেনোয়ার সহকারীর কাজ করেন তিনি। এই সময় থেকে চলচ্চিত্র-নির্মাতা হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার স্বপ্ন বোনেন সত্যজিৎ। জানা যায়, ‘দ্য বাই সাইকেল থিফ’ ছবিটি দেখার পর তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন।

১৯৫৫ সালে সত্যজিৎ রায় তার প্রথম চলচ্চিত্র ‘পথের পাঁচালী’ নির্মাণ করেন। প্রথম চলচ্চিত্র তাকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে যায়। ‘পথের পাঁচালী’ মোট ১১টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করে। এটি কান চলচ্চিত্র উৎসব থেকে ‘বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট’ পুরস্কারও অর্জন করে।

এই নির্মাতার বিখ্যাত ছবিগুলোর মধ্যে অপুর সংসার, মহানগর, চারুলতা, সোনার কেল্লা, হীরক রাজার দেশে, নায়ক অন্যতম।
চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে সত্যজিৎ রায়ের সৃজনশীলতা ছিল বহুমুখী। তার কাজের পরিধি ছিল অনেক। তিনি ৩৭টি পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপরাজিত’ ও ‘অপুর সংসার’—এই তিনটি চলচ্চিত্রকে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত।

সত্যজিৎ রায়  জীবদ্দশায় বহু পুরস্কার পেয়েছেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে।  ১৯৮৭ সালে ফ্রান্সের সরকার সত্যজিৎ রায়কে বিশেষ সম্মানসূচক পুরস্কার লেজিওঁ দনরে ভূষিত করে। ১৯৮৫ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র পুরস্কার দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে ভূষিত হন। ভারত সরকারের ভারতরত্নসহ বেশ কিছু পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।

২০০৪ সালে, বিবিসির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি তালিকায় সত্যজিৎ ১৩তম স্থান লাভ করেছিলেন।

কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ ও শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন সত্যজিৎ। বিশ্বভারতীতে পাঁচ বছর পড়াশোনা করার কথা থাকলেও এর আগেই ১৯৪৩ সালে শান্তিনিকেতন ছেড়ে তিনি কলকাতায় চলে আসেন। এখানে এসেই একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় মাত্র ৮০ টাকা বেতনে চাকরি নেন। ঘটনাচক্রে একই বছর প্রখ্যাত ফরাসি পরিচালক জ্যঁ রেনোয়া তাঁর ‘দ্য রিভার’ চলচ্চিত্রটির শুটিং করতে কলকাতায় আসেন। ‘দ্য রিভার’ ছবিতে রেনোয়ার সহকারীর কাজ করতে গিয়েই সম্ভবত পুরোপুরিভাবে এক চলচ্চিত্র-নির্মাতা হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার চিন্তাভাবনা শুরু করেন সত্যজিৎ। তবে ‘দ্য বাই সাইকেল থিফ’ ছবিটি দেখার পরই বোধহয় তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন।

হৃদযন্ত্রের জটিলতার কারণে সত্যজিৎ ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল  মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৭০ বছর।সত্যজিৎ রায় বেঁচে আছেন তাঁর ছবির মধ্যে, বেঁচে আছেন তাঁর লেখনির মধ্যে দিয়ে।শুধুমাত্র ভারতে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় চলচ্চিত্র জগতে সুনাম অর্জন করেছেন পরিচালক সত্যজিৎ রায়।ভারতের চলচ্চিত্র জগত বিশ্বের দরবারে  যাত্রা শুরু করে সত্যজিতের হাত ধরেই।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।