28 February 2019

আজ মহান দানবীর, আইনজীবী, সমাজকর্মী এবং জনহিতৈষী রাসবিহারী ঘোষের ৯৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।


মহান দানবীর, আইনজীবী, সমাজকর্মী এবং জনহিতৈষী রাসবিহারী ঘোষ বর্ধমান জেলার খণ্ডঘোষ থানার তোরকোনা গ্রামে ২৩শে ডিসেম্বর ১৮৪৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি খুবই মেধাবী ছাত্র ছিলেন। সব পরীক্ষায় সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করে শিক্ষাজীবনে তিনি বিশেষ প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। ১৮৬৭ সালে স্বর্ণপদক সহ আইন পরীক্ষায় পাশ করেন। কিছুদিন তিনি বহরমপুরের কলেজে অধ্যাপনা করেন।

পরবর্তী জীবনে এই মেধাবী ছাত্রটি  কলকাতা হাইকোর্টের খ্যাতনামা অসামান্য আইনজীবী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এবং ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ তাঁর সহকারী ছিলেন। আইন ব্যবসা থেকে উপার্জিত অর্থের বেশিরভাগই তিনি দরিদ্র সেবায় বা বৃত্তিদানে খরচ করেন।

১৯১৩ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানচর্চার জন্য দশ লক্ষ টাকা দান করেন। আজকের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে তাঁর অবদান অপরিসীম। রাসবিহারী ঘোষ মৃত্যুর আগে প্রায় ষোল লক্ষ টাকার সম্পত্তি কারিগরি শিক্ষার প্রতিষ্ঠান "বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট" কে দান করে যান। সেই টাকাতেই ১৯২২ সালে যাদবপুরে প্রায় ৩৩ একর জায়গা কিনে বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট ‘কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি’ নাম নিয়ে যাদবপুরে স্থানান্তরিত হয় এবং ১৯৫৬ সালে তা পরিণত হল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। এছাড়াও তিনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, আর জি কর মেডিকেল কলেজ এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রচুর দান করেন। 

রাসবিহারী ঘোষ ছিলেন একজন বিশিষ্ট স্বদেশপ্রেমী এবং মধ্যপন্থী কংগ্রেসকর্মী। প্রগতিতে গভীর বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন আমূল সংস্কারের বিরোধী।
যোগ্যতা ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের Tagore Law Professorship ও সম্মানসূচক ডি.এল ডিগ্রি , বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্যপদ  এবং ইংরেজ সরকারের নাইট  উপাধি লাভ করেন।

১৯২১ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়। ১৯২৯ সালে দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা যেটা গোড়ায় পরিচিত ছিল ‘মেন সয়্যর রোড’ বা বালিগঞ্জ অ্যাভিনিউ নামে সেই রাস্তাটি পরে প্রয়াত ব্যরিস্টার রাসবিহারী ঘোষের নামানুসারে রাসবিহারী অ্যাভিনিউ নামে চিহ্নিত করা হয়।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেইল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।


আজ ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদের ৫৬তম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

আজ ২৮শে ফেব্রুয়ারী, ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদের মৃত্যুদিন। তাঁর শেষের দিনগুলি খুবই দুর্দশার মধ্যে কাটে। আমরা জেনে নি শেষের দিনগুলি তাঁর কেমন কেটেছিল। এর মধ্যে কি জওহরলাল নেহেরুর কোনো হাত ছিল?

ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ ছিলেন একজন মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী, স্বাধীন ভারতবর্ষের প্রথম রাষ্ট্রপতি, জাতীয় কংগ্রেস নেতা ও একজন প্রথিতযশা আইনজীবী। তিনি ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের অন্যতম স্থপতি।

তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই  প্যাটেল, খাদ্য ও সরবরাহ মন্ত্রী কে এম মুন্সি ও কংগ্রেসের অন্যান্য নেতারা সোমনাথ মন্দির পুনর্নির্মাণের প্রস্তাব নিয়ে মহাত্মা গান্ধীর কাছে গেলে, গান্ধীজি তাঁদের  পুনর্নির্মাণের কাজে উৎসাহ দেন। কিন্তু এ বিষয়ে নেহেরুর মত ছিল না। গান্ধীজি ও সর্দার প্যাটেলের মৃত্যুর পর নেহেরুর  সোমনাথ মন্দির পুনর্নির্মাণের বিরোধিতা চরমে ওঠে। তিনি কে এম মুন্সিকে নানা ভাবে মন্দির পুনর্নির্মাণের কাজটি এগিয়ে নিয়ে যেতে বাধা দেন। কিন্তু কে এম মুন্সিক নেহেরুর কথায় সায় না দিয়ে মন্দির পুনর্নির্মাণের কাজটি এগিয়ে নিয়ে যান। ১৯৫১ সালের মে মাসে কে এম মুন্সি  ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদকে দিয়ে মন্দিরের শিলান্যাস করান।

এই সময় প্রধানমন্ত্রী  জওহরলাল নেহেরুর সঙ্গে রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ ও কে এম মুন্সির মধ্যে তিব্র মতান্তর দেখা দেয়। নেহেরু  মুন্সীর বিরুদ্ধে ‘হিন্দু-পুনরুত্থানবাদ’ তথা ‘হিন্দুত্ববাদ’ প্রচারের তকমা লাগিয়ে তীব্র ভর্ৎসনাও করেন। কিন্তু মুন্সী  তাঁর সিদ্ধান্তে অটল।

মন্দির নির্মান সমাপ্ত হলে, মুন্সী স্বাধীন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদকে শুভ-দ্বারোদঘাটনের জন্য সসম্মানে আমন্ত্রণ জানান। তখন নেহেরু রাজেন্দ্র প্রসাদ কে সোমনাথ মন্দিরের উক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে নিষেধ করেন। কিন্তু নেহেরুর রক্তচক্ষুকে আমল না দিয়ে তিনি উপস্থিত হলেন সোমনাথ মন্দিরে এবং সেখানে উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণও দিলেন।

এই ঘটনার পর থেকে নেহেরু রাজেন্দ্র প্রসাদের সঙ্গে  নজিরবিহীন আচরণ শুরু করেন। রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অবসর গ্রহণের পর তাঁর দিল্লীতে বসবাসের ব্যবস্থা করতে অস্বীকার করেন নেহেরু। একজন ভূতপূর্ব রাষ্ট্রপতির যা যা সম্মান বা অধিকার পাবার কথা ছিল, তার সব কিছু থেকেই ওই রাজেন্দ্র প্রসাদকে বঞ্চিত করা হয়। অগত্যা নিরুপায় রাজেন্দ্র প্রসাদ তাঁর আদি নিবাস পাটনায় ফিরে আসতে বাধ্য হন। কিন্তু সেখানেও তাঁর নিজস্ব কোন সংস্থান ছিল না। শেষমেশ পাটনার সদাকৎ আশ্রমের একটি আলো-বাতাসহীন বদ্ধ কুঠুরিতে রাজেন্দ্র প্রসাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই মেলে। আবদ্ধ ঘরে থাকতে থাকতে ক্রমশঃ দেখা দিল শ্বাসকষ্ট আর কাশির সঙ্গে উঠতে লাগল কফ।

শুধু নেহেরুই নন, সেদিন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির অসুস্থতার খবর পাবার পরও এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি, যিনি নূন্যতম চিকিৎসার সুবিধা তাঁর কাছে পৌঁছে দেবার চেষ্টা করেছিলেন! বিহারে তখন কংগ্রেসেরই রাজত্ব, সুতরাং বলাইবাহুল্য কোন এক অদৃশ্য অঙ্গুলিহেলনে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর সুচিকিৎসা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে চিরবঞ্চিত রইলেন।

রাজেন্দ্র প্রসাদ আর দশজন সাধারণ রোগীর মতোই চিকিৎসার জন্য প্রায়ই পাটনার মেডিক্যেল কলেজে যেতেন। সেখানে যে মেশিনটিতে তাঁর চিকিৎসা হত, সেটিকেও পর্যন্ত দিল্লী পাঠিয়ে দেওয়া হয় বলে জানা যায়। অর্থাৎ রাজেন্দ্র প্রসাদকে প্রকারান্তরে তিলে তিলে মারার সব ব্যবস্থা পাকাপোক্ত ভাবেই সম্পন্ন করা হয়েছিল।

একবার  জয়প্রকাশ নারায়ণ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে সদাকৎ আশ্রমে গিয়ে পৌঁছান। রাজেন্দ্রপ্রসাদের অবস্থা দেখে তিনি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান! আর একমূহুর্তও অপেক্ষা না করে তিনি তাঁর অফিসারদের নির্দেশ দেন, রাজেন্দ্র প্রসাদের ঘরটিকে অবিলম্বে বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য। সেই মত কাজও শুরু হয়। কিন্তু রাজেন্দ্র প্রসাদ আর বেশি দিন বাঁচেন নি। সেই ঘরেই ২৮শে ফেব্রুয়ারী ১৯৬৩ সালে তাঁর জীবনাবসান হয়।

ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ ৩রা ডিসেম্বর ১৮৮৪ সালে বিহারের সেয়ান জেলাতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ১৯১৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আইনের স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় স্বর্ণপদক সহ পাশ করেছিলেন। ১৯৩৭ সালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় হতে পি এইচ ডি ডিগ্রী প্রাপ্ত হন।

আজ ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদের ৫৬তম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেইল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

আজ ২৮শে ফেব্রুয়ারী বাংলা থিয়েটারের জনক গিরিশচন্দ্র ঘোষের ১৭৫তম জন্ম বার্ষিকীতে জানাই আমাদের শ্রদ্ধা।

২৮শে ফেব্রুয়ারী ১৮৪৪ সালে বাংলা থিয়েটারের জনক গিরিশচন্দ্র ঘোষ কলকাতার বাগবাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন সংগীতস্রষ্টা, কবি, নাট্যকার, উপন্যাসিক, নাট্য পরিচালক, মঞ্চাভিনেতা। বাংলার থিয়েটারের স্বর্ণযুগ মূলত তারই অবদান।

গিরিশচন্দ্রে পিতা নীলকমল ঘোষ ছিলেন একজন একাউন্টেন্ট। মাতার নাম ছিল রাইমনি। তাদের ১২টি সন্তানের অনেকেই অল্প বয়সে মারা যায়। গিরিশচন্দ্র ছিলেন তাদের অষ্টম সন্তান। ১১ বছর বয়সে গিরিশচন্দ্র তাঁর মাকে হারান এবং পিতাকে হারান তখন তার বয়স মাত্র ১৪। তখন বোন কৃষ্ণ কিশোরী সংসারের অভিভাবক হন। গিরিশচন্দ্র ছোটবেলার উশৃংখল ছিলেন। যখন গিরিশচন্দ্রের বয়স ১৫ ভাইকে শুধরাতে বোন কৃষ্ণ কিশোরী গিরিশচন্দ্রের বিয়ে দিলেন প্রমোদিনীর সাথে।

গিরিশচন্দ্র বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে পড়াশুনা শুরু করেন কিন্তু সেখানে তার মন বসে না। ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়ে পড়াশুনা ছেড়ে দেন। কিন্তু তার ছিল প্রবল ইচ্ছা শক্তি আর প্রখর স্মরণ শক্তি। তিনি বিয়ের যৌতুক বাবদ যে টাকা পেয়েছিলেন সেই টাকা দিয়ে তিনি ক্লাসিক ইংরাজী সাহিত্যের অনেক বই কিনে নিজেই পড়াশুনা শুরু করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে তিনি ইংরাজী ভাষা রপ্ত করে নেন এবং সাথে বায়রন, শেক্সপিয়ারের পাতার পর পাতা লেখা কন্ঠস্থ করে ফেলেন।  গিরিশচন্দ্রের জীবনে বেশ কিছুটা উশৃংখলতা স্বেচ্ছাচারিতা দেখা দেয়। তখনকার সময় ইংরাজী জানলে ভালো চাকরি পাওয়া যেত। তার শ্বশুরমশাই গিরিশচন্দ্রকে একটা বুককিপিং এর চাকরির জোগার করে দেন।

বই পড়ার প্রবল আগ্রহ থাকায় তিনি এসিয়াটিক সোসাইটির সদস্যপদ নিয়ে রামায়ণ, মহাভারত সহ বহু পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক বই পড়ে ফেলেন। সেই সঙ্গে শুরু করেন বাংলায় অনুবাদ। বন্ধুরা বললেন  শেক্সপিয়ারের ম্যাকবেথের সংলাপ বাংলায় অনুবাদ করা সম্ভব নয়। কারণ তার সংলাপগুলি খুবই কঠিন। ইংরাজীতেই ঠিক করে বোঝা দায়। কিন্তু গিরিশচন্দ্র ম্যাকবেথ বাংলায় অনুবাদ করে ফেলেন।

তখন একটা নাটক বহু দিন ধরে মঞ্চস্থ করা হোত। গিরিশচন্দ্র শ্রোতাদের এক ঘেয়েমি দূর করতে প্রতি দু মাস অন্তর নতুন নতুন নাটক লিখতেন। একবার দুর্গাপুজোর সময়  গিরিশের বয়স যখন ২০ তখন তিনি দীনবন্ধু মিত্রের "সধবার একাদশী"তে নিমচাঁদ চরিত্র অভিনয় করেন। এই চরিত্রে মাতালের ভূমিকায় অভিনয় করার সময় পরিচালক বোতলের মধ্যে জলে লাল রং মিশিয়ে দেয়। কিন্তু গিরিশচন্দ্র বলেন তিনি মাতালের ভূমিকায় অভিনয় করবেন আর মদ থাকবে না। তাঁকে মদ দিতেই হবে, তাহলেই অভিনয় করবেন। নিরুপায় হয়ে পরিচালক রাজি হন এবং গিরিশচন্দ্র মদ খেয়েই অভিনয় করেন এবং খুবই প্রসংসা অর্জন করেন।

স্টার থিয়েটারে গিরিশচন্দ্রের চৈতন্যলীলা নাটকে ঠাকুর রামকৃষ্ণ চৈতন্য চরিত্রে বিনোদিনীর অভিনয় দেখে মুগ্ধ হন এবং বিনোদিনীর মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেন। ঠাকুর রামকৃষ্ণ গিরিশচন্দ্রের মোট পাঁচটি নাটক চৈতন্যলীলা, প্রহ্লাদ চরিত্র, বৃষকেতু, নিমাই সন্ন্যাস ও দক্ষযক্ষ দেখেন। স্বেচ্ছাচারী বেপরোয়া গিরিশচন্দ্র পরবর্তীকালে ঠাকুর পরমহংসের সংস্পর্শে আসেন এবং তাঁর মধ্যে নৈতিক পরিবর্তন হয় এবং আধ্যাত্মিক ভাব জাগরিত হয়।

একবার গিরিশচন্দ্র ঠাকুর রামকৃষ্ণের কাছে নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন প্রভু আমি পাপী, আমার কি করা উচিত। আমি এত মদ খেয়েছি যে মদের বোতল গুলি একটার ওপরে একটা রাখলে হিমালয়ের সমান উঁচু হবে। ঠাকুর বলেন তুমি যা করছো তাই করো। অভিনয় চালিয়ে যাও। গিরিশচন্দ্র বললেন আমি ওসব করি পেটের জ্বালায়। তখন ঠাকুর বলেন তাহলে সকাল সন্ধ্যে দুবেলা ঈশ্বরের নাম নিতে। গিরিশচন্দ্র বলেন কখন সকাল হয় কখন সন্ধ্যে হয় তা আমার জ্ঞানে থাকে না। ঠাকুর বলেন তাহলে শুধু খাবার আগে এবং শোবার সময় ঈশ্বরের নাম করতে। তখন গিরিশচন্দ্র বলেন কখন আমি খাই আর কখন ঘুমাই শুধু ঈশ্বরই জানেন। ঠাকুর বলেন তুমি এটাও যদি না করতে পারো তাহলে থাক আমিই তোমার হয়ে ঈশ্বরের নাম করবো।

রামকৃষ্ণের শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ যেমন আমেরিকা  সহ বিশ্বব্যাপী বেদ বাদান্তের  প্রচার করেছিলেন তেমনি তার আর এক শিষ্য গিরিশচন্দ্র রামকৃষ্ণের কথা ও বাণী প্রচার করে ছিলেন।

১৮৮৬ সাল। ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংস সেই সময় দুরারোগ্য গলার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং তাঁর শারীরিক অবস্থারও যথেষ্ট অবনতি ঘটেছিল। উত্তর কলকাতার  কাশীপুর অঞ্চলের একটি বাগানবাড়িতে চিকিৎসার সুবিধার জন্য তাঁকে নিয়ে আসা হয়েছিল। ১ জানুয়ারি একটু সুস্থ বোধ করায় তিনি বাগানে বিকালের দিকে হাঁটতে বেরিয়ে ছিলেন। সে দিন ছুটির দিন। ভক্তরা বাগান বাড়ীতে এসে বিভিন্ন জায়গায় বসে গল্প করছেন। গিরিশচন্দ্রও সুরেন্দ্রনাথ, রামচন্দ্র দত্ত ও অনান্যদের সাথে একটি গাছ তলায় বসে কথাবার্তা বলছেন। হঠাৎ তারা দেখলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ তাদের দিকে এগিয়ে আসছেন। ঠাকুর সুস্থ হয়ে বেড়াতে বেরিয়েছেন দেখে তারাও খুব খুশি। ভক্তরাও উঠে দাঁড়ালেন। ঠাকুর সেই গাছ তলায় এসে সেখানে তিনি তাঁর অনুগামী নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষকে বলেন "গিরিশ তুমি আমার সম্বন্ধে কি সব বলে বেড়াচ্ছো, তুমি কি দেখেছো, তুমি কি জানো আমার সম্বন্ধে, তোমার কী মনে হয়, আমি কে?"। গিরশচন্দ্র হাঁটু গেঁড়ে বসে হাত জোড় করে বললেন "বাল্মিকী যাঁর সম্বন্ধে বলে শেষ করতে পারেন নি, আর আমি কে যে আপনার সম্বন্ধে বলবো"। রামকৃষ্ণ পরমহংস তখন বলেন, “আমি আর কী বলব? তোমাদের চৈতন্য হোক"। এরপর তিনি  সমাধিস্থ হয়ে তাঁর প্রত্যেক শিষ্যকে স্পর্শ করেন। গিরিশচন্দ্র সহ রামকৃষ্ণ অনুগামীদের মতে, তাঁর স্পর্শে সেদিন প্রত্যেকের অদ্ভুত কিছু আধ্যাত্মিক অনুভূতি হয়েছিল।

সিরাজউদ্দৌলা, মীর কাসিম আর ছত্রপতি শিবাজী নাটক করে গিরিশচন্দ্র ইংরেজদের রোষানলে পড়েন। সিরাজউদ্দৌলা বাংলার শেষ নবাব। তার সেনাপতি মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কারনে ২৩শে জুন ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হন। রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার শাসনভার গ্রহন করে।  মীর কাসিম  ইংরেজদের সাথে সামরিক যুদ্ধে জড়িয়ে পরেন।  বক্সারের যুদ্ধে তিনি ইংরেজ বাহিনির হাতে পরাজিত হন। বলা হয়ে থাকে এই যুদ্ধই ছিল বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার সর্বশেষ সুযোগ।  ইংরেজ-মারাঠা যুদ্ধে ব্রিটিশদের কাছে মারাঠা সাম্রাজ্য চূড়ান্ত পরাজয় স্বীকার করে। এর ফলেই কার্যত ভারতের উপর ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। তারা গিরিশচন্দ্রকে ঐ তিনটি নাটক মঞ্চস্থ করতে নিষেদ করে দেন। এর পর গিরিশচন্দ্র ঝাঁসী রানী লক্ষ্মীবাঈকে নিয়ে লেখা শুরু করেন। ভারতবর্ষের ইতিহাসে বিপ্লবী নেতা এবং ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহের অন্যতম পথিকৃত হিসেবে চিরস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব লক্ষ্মী বাঈ। কিন্তু ব্রিটিশ রাজ জানিয়ে দেন ঝাঁসী রানী লক্ষ্মীবাঈ নাটক করলে তাকে জেলে পাঠানো হবে। গিরিশচন্দ্র এই নাটক লেখা শুরু করলেও শেষ করতে পারেন নি।

সে সময় মেয়েদের চরিত্রে ছেলেরাই অভিনয় করতো। গিরিশচন্দ্রই বাংলা নাটকে প্রথম মহিলাদের থিয়েটারে সুযোগ করে দেন। তিনি পতিতালয় থেকে মেয়েদের নিয়ে শিখিয়ে নাটকে নামান। তিনি একটি অভিনয় স্কুল খুলে ফেলেন। সেখান থেকে বহু প্রতিভাবান অভিনেত্রী তৈরী করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন বিনোদিনী, তিনকড়ি, তারাসুন্দরী সহ অনেকে।

গিরিশচন্দ্র অভিনয়ের উপযোগী নতুন ছন্দের সূচনা করেন। নাটক গুলিকে ছোট ছোট ছন্দে বিন্যস্ত করেন। তার ছন্দের নাম হয় গৈরিক ছন্দ।

১৯১২ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি ৬৮ বছর বয়সে নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষের মৃত্যু হয়।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেইল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।







  

23 February 2019

আজ ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের ১১৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।


আধুনিক ভারতবর্ষের নব যুগের সূচনায় প্রাণপুরুষ রাজা রামমোহন রায়ের শিষ্য ছিলেন ডঃ মহেন্দ্রলাল সরকার। হাওড়া জেলার পাইকপাড়া গ্রামে ১৮৩৩ সালের ২রা নভেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন । মাত্র ৫ বছর বয়সে পিতৃমাতৃহীন হয়ে ছোটমামা মহেশচন্দ্র ঘোষের কাছে থেকে পড়াশুনা আরম্ভ করেন। 

১৮৪৯ সালে হেয়ার স্কুল থেকে “জুনিয়র বৃত্তি” নিয়ে মহেন্দ্রলাল সরকার হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানের দিকে তাঁর খুব ঝোঁক ছিল। প্রিয় বিষয় ছিল অংক। এই সময় তার হাতে আসে মিল সাহেবের বিখ্যাত বই “ট্যুর রাউন্ড দি ক্রিয়েশন”। বইটি পড়ে হাতে কলমে কি ভাবে বিজ্ঞান শেখা যায় তার প্রতি আগ্রহ জন্মায়। কিন্তু সে সময় দেশে ফলিত  বিজ্ঞান শেখার কোনো সুযোগ ছিল না। শুধু মাত্র মেডিকেল কলেজে হাতে কলমে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞান শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল। ১৮৫৪ সালে মহেন্দ্রলাল মেডিকেল কলেজে ভর্ত্তি হন। ১৮৬৩ সালে এম ডি পরীক্ষায় তিনি প্রথম হন। চন্দ্র কুমার দে’র পরে তিনিই হলেন  দ্বিতীয় বাঙালি এম.ডি।

কর্মজীবন শুরু হয় স্বাধীন ডাক্তারী পেশা হিসাবে এবং তখন তিনি নাম আর যশ দুই অর্জন করেন। পরবর্তী সময় ডঃ মর্গানের একটি বই পড়ে  তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার প্রতি আনুপ্রাণিত ও আকৃষ্ট হন। মহেন্দ্রলাল এ্যালোপ্যাথি ছেড়ে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা শুরু করেন। সে সময়ের খ্যাতনামা হোমিওপ্যাথ রাজেন্দ্রলাল দত্তের ক্লিনিকে যোগ দেন।  তিনি বন্দেমাতরম সঙ্গীতের স্রষ্টা ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের চিকিৎসার ভার নেন। পরবর্তী সময়ে Bengal Medical Association (BMA) প্রদত্ত বক্তৃতায় তিনি চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে হোমিওপ্যাথিকে এ্যালোপ্যাথির চেয়ে শ্রেয়তর বলে ঘোষণা করেন। এ কারণে কলকাতার ব্রিটিশ চিকিৎসকগণ তাকে অ্যাসোসিয়েশন থেকে বহিষ্কার করেন। কিছুকালের জন্য চিকিৎসা ক্ষেত্রে তাঁর পসার কমে যায়। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার জন্য রোগী সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। পরবর্তী সময়ে তিনি দেশের সবচেয়ে  বিখ্যাত হোমিওপ্যাথ চিকিৎসকে পরিণত হন।

ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার  ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসেরও  চিকিৎসা করতেন। তিনি জানতেন যে রামকৃষ্ণ পরমহংসের শিষ্যরা তার ওষুধের ওপরে পুরোপুরি ভরসা রাখতে না পেরে এ্যালোপ্যাথিক, বায়োকেমিক, কবিরাজি, হেকিমি, ঝাড়ফুঁক ইত্যাদি কোনও কিছুই বাকি রাখেনি। পরমহংসের স্ত্রী সারদামণি তারকেশ্বর হত্যে দিয়েও এসেছেন। মহেন্দ্রলাল আপত্তি করেননি। তার মতন বড় ডাক্তাররা সাধারণত এরকম হলে আর কোনও দায়িত্ব নিতে চান না, কিন্তু মহেন্দ্রলালের অহংবোধ এক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করেনি। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, দেখুন না চেষ্টা করে, যদি কিছু ফল হয় তা ভালো কথা!

মহেন্দ্রলাল ১৮৬৮ সালে "ক্যালকাটা জার্নাল অব মেডিসিন" নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং ১৮৭০ সালে “ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি কাল্টিভেশন অব সায়েন্স” প্রতিষ্ঠা করেন। কলকাতার ২১০ নং বৌবাজার স্ট্রীটে এর দপ্তর স্থাপিত হয়।যেখানে অনেক বিজ্ঞানী গবেষণা করার সুযোগ পেয়েছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানটি হয়ে ওঠে বাঙালী বিজ্ঞানীদের মিলনমেলা। পদার্থবিজ্ঞানে ভারতের প্রথম নোবেল বিজয়ী চন্দ্রশেখর ভেঙ্কটরমন এই প্রতিষ্ঠানেই তার নোবেল বিজয়ী গবেষণাটি সম্পন্ন করেছিলেন। ১৯০৭ সালে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রমন এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

সেকালের অনেক মনীষীর মতো তাঁর সমাজ মনস্কতার দিকটাও উল্লেখযোগ্য। বাল্য বিবাহ প্রথার বিরুদ্ধে তিনিই প্রথম মেয়েদের বিবাহের ন্যুনতম বয়স ১৬ বছর ধার্য করার প্রস্তাব দেন। এটি পরে আইনি স্বীকৃতিও পায়। কুষ্ঠ রোগীদের জন্য স্ত্রী রাজকুমারীর নামে বৈদ্যনাথ ধামে একটি কুষ্ঠাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি জীবনের সমস্ত সঞ্চয় "সায়েন্স এস্যোসিয়েশন" এর কাজে দান করে যান।

১৯০৪ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারী এই কিংবদন্তী মানবের জীবানাবসান ঘটে। আজ ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের ১১৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেইল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

22 February 2019

আজ ২২শে ফেব্রুয়ারি, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের ১৩৪তম জন্মবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাই।

যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত ছিলেন ভারতীয় রাজনৈতিক মনীষী, বাংলার মুকুটহীন সম্রাট, সর্বভারতীয় কংগ্রেস দলীয় সভাপতি, কলকাতা  কর্পোরেশনের পাঁচবারের নির্বাচিত মেয়র। আজ ২২শে ফেব্রুয়ারি, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের ১৩৪তম জন্মবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাই। আসুন আমরা জেনে নি ওঁনার সংগ্রামী জীবনের কিছু কথা।

যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত ১৮৮৫ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের প্রাচীন জনপদ বর্তমান চন্দনাইশ উপজেলার বরমা গ্রামে সেন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা যাত্রামোহন সেনগুপ্ত ছিলেন আইনজীবী। কলকাতায় বাবার কাছে থাকার সময় তিনি ব্রাহ্ম বয়েস স্কুল, সুবার্বান স্কুল এবং হেয়ার স্কুলে পড়াশুনা করেন। হেয়ার স্কুল থেকেই তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

পড়াশুনার পাশাপাশি ছোট থেকেই তিনি খেলাধূলায় পারদর্শিতা অর্জন করেন। ক্রিকেট, টেনিস,হকি সব খেলাতেই বিশেষ পারদর্শিতা দেখিয়ে ছিলেন। তাঁর খেলাধুলায় আগ্রহ দেখে কলকাতার লোকেরা তাঁর নাম দিয়েছিলেন ক্রীড়ামোদী মেয়র।

যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত  বিলেতে যান উচ্চশিক্ষার্থে এবং ১৯০৯ সালে ব্যারিস্টারি পাশ করেন। কেমব্রিজের ডাউনিং কলেজে বি-এ পড়ার সময় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের আলাপ ও প্রেম নেলী গ্রে-র সঙ্গে। প্রথম দিকে বিয়েতে কোনো পক্ষেরই মত না থাকায় বিয়ে মুলতুবি রেখেছিলেন যতীন্দ্রনাথ। পরে মত বদলে ১৯০৯ সালের ১লা আগস্ট যতীন্দ্রমোহন নেলী গ্রেকে বিয়ে করেই কলকাতায় ফেরেন। এদিকে বাবা যাত্রামোহন এক ব্যারিস্টার বন্ধুর রূপসী কন্যার সঙ্গে ছেলের বিবাহ দেওয়ার ইচ্ছা ছিল। তিনি যখন শুনতে পেলেন যে, তার ছেলে এক বিদেশিনিকে বিয়ে করে দেশে ফিরছেন তখন তিনি নিজে চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে এসে নব-দম্পতিকে সস্নেহে তাদেরকে রহমতগঞ্জের বাড়িতে মহাসমারোহে নিয়ে যান। বাঙ্গালী বধূর সাজে নেলী গ্রেকে যতীন্দ্রমোহনের মা পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নিয়েছিল।

দেশে ফিরে এসে যতীন্দ্রমোহন চট্টগ্রাম জেলা আদালতে আইন পেশায় নিয়োজিত হন। এক বছর পর তিনি  কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশায় যোগ দেন। এ সময় কিছুদিন তিনি কলকাতা রিপন ল’ কলেজে (সুরেন্দ্র নাথ কলেজ) অধ্যাপনা করেন। ধীরে ধীরে কলকাতা হাইকোর্টে তার সুনাম বৃদ্ধি পেতে থাকে।

আইন পেশা ছেড়ে যতীন্দ্রমোহন কোলকাতা ছেড়ে চট্টগ্রাম চলে আসেন এবং সেখানে  জনগণের মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন জোরদার করেন। ১৯১১ সালে তিনি চট্টগ্রামের প্রতিনিধি হয়ে ফরিদপুরে অনুষ্ঠিত দলীয় কংগ্রেসে যোগদান করেন। সে সময় পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ সৈন্যদের নৃশংস হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে সারাদেশে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। চট্টগ্রামেও আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠে। শ্রমিক স্বার্থ রক্ষার জন্য তিনি শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন করেন।

যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত ১৯২১ সালের এপ্রিল মাসে বার্মা অয়েল কোম্পানির শ্রমিক ধর্মঘটের নেতৃত্ব দেন। এরপরে আরম্ভ হয়েছিল আসামের শত সহস্র চা-বাগান কুলিদের আন্দোলন। এই কুলিদের উপর অমানুষিক নিপীড়ন, নির্যাতনের প্রতিবাদে শুরু হয় আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে ধর্মঘট। ধর্মঘটের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করে গান্ধীজী সমর্থন করলেন ধর্মঘটকে। যতীন্দ্রমোহনের বিস্ময়কর সংগঠন প্রতিভা এবং সুষ্ঠু নেতৃত্ব অভিনন্দিত করলেন।

যতীন্দ্রমোহন স্বীকৃতি পেলেন সমগ্র ভারত শ্রমিক আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে। প্রিয়শিষ্যের কৃতিত্বে গর্বিত দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। আন্তরিক ভালোবাসা জ্ঞাপন করলেন যতীন্দ্রমোহনকে। বিপুল গৌরবে কংগ্রেস প্রতিষ্ঠানের সর্বভারতীয় নেতার পদে অধিষ্ঠিত হলেন যতীন্দ্রমোহন। শ্রমিক আন্দোলনের স্থপতি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার নেতাকে সংবর্ধনা জানালেন, যতীন্দ্রমোহনের অভিনন্দন সভায় সুন্দর ভাষণ দিলেন প্রবীণ নেতা প্রসন্ন কুমার সেন। যতীন্দ্রমোহনের ত্যাগ, সাহস ও জনসেবার উজ্জ্বল ছবি তুলে ধরলেন শ্রোতৃবর্গের সম্মুখে। আবেগে, উচ্ছ্বাসে, কৃতজ্ঞচিত্তে প্রস্তাব করলেন, যতীন্দ্রমোহনকে “দেশপ্রিয়” আখ্যায় ভূষিত করা হোক। সানন্দে প্রস্তাব সমর্থন করলেন বর্ষীয়ান নেতারা।  উৎসাহে, উদ্দীপনায়, উল্লাসে, সভা উদ্বেলিত। সহস্র কণ্ঠের বন্দেমাতরম, আল্লাহু আকবার, দেশপ্রিয় জয় ধ্বনিতে প্রস্তাব সংবর্ধিত হল। চট্টগ্রামের মানুষ তাকে ‘মুকুটহীন রাজা’ নামে আখ্যায়িত করে।

কলকাতার মেয়র দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন এর আকস্মিক মৃত্যুতে বাংলার যুব সমাজের নেতা কে হবেন এই নিয়ে  প্রাদেশিক কংগ্রেসে প্রশ্ন তোলেন মহাত্মাজী। প্রফুল্লচন্দ্র রায় ও মৌলানা আবুল কালাম আজাদের অভিমত ছিল, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত ছাড়া এই মুহুর্তে আর কাউকে বাংলার নেতা হিসাবে স্বীকার করা সম্ভব নয়। তার ফলস্বরূপ দেশবন্ধুর সিংহাসন যতীন্দ্রমোহনকে দেওয়া হল। যতীন্দ্রমোহন পরপর পাঁচবার কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন।

যতীন্দ্রমোহন ১৯৩২ সালে কিছুদিনের জন্য তার স্ত্রী কে নিয়ে লন্ডন যান এবং  লন্ডন থেকে ফেরার পথে জাহাজ বোম্বে বন্দরে ভিড়তেই ২০শে জানুয়ারি  পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে রাজদ্রোহাত্মক কাজে লিপ্ত থাকার অভিযোগে কিছুদিন কলকাতায় বন্দী থাকার পর ১৯৩৩ সালের ৫ জুন যতীন্দ্রমোহনকে বন্দী অবস্থায় রাঁচীতে পাঠানো হয়। সেখানে সুচিকিৎসার কোনো সরকারি সুব্যবস্থা ছিল না। পাড়া প্রতিবেশীবিহীন প্রায় নির্জন অঞ্চল ‘কাঁকে রোড’ এর ‘নগেন্দ্র লজ’ রাঁচিতে দেশপ্রিয়’র অন্তরীন-আবাস। যতীন্দ্রমোহন ১৯৩৩ সালের ২২শে জুলাই রাঁচিতেই বন্দী অবস্থায় পরলোকগমন করেন।

দেশপ্রিয়ের মৃত্যুর পর রাঁচি মিউনিসিপ্যালিটি, দেশপ্রিয়ের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনার্থে রাঁচির কাঁকে রোড-এর নতুন নামকরণ করেছিলেন “দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন রোড”।

যতীন্দ্রমোহনের স্মরণে দক্ষিণ কলকাতায় স্থাপিত হয়েছে ‘দেশপ্রিয় পার্ক’। জন্মস্থান চট্টগ্রামের বরমা গ্রামে বাড়ির সামনে স্থাপিত হয়েছে যাত্রামোহন সেনগুপ্ত, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত ও নেলী সেনগুপ্তর আবক্ষ মূর্তি।


প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেইল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

আজ আবুল কালাম মহিউদ্দিন আহমেদ আজাদের ৬১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি। উঁনি মৌলানা আজাদ নামেই পরিচিত ছিলেন।


আজ আবুল কালাম মহিউদ্দিন আহমেদ আজাদের ৬১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি। উঁনি মৌলানা আজাদ নামেই পরিচিত ছিলেন। তিনি  ছিলেন পণ্ডিত, কবি, সাংবাদিক, স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি। এছাড়া তিনি আরবি, ফার্সি, উর্দু, হিন্দি, ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় দক্ষ ছিলেন। জেনে নিন ওঁনার কিছু কথা।

১) মৌলানা আজাদর পিতার নাম মাওলানা খাইরুদ্দিন ও তাঁর মা ছিলেন শেখ মোহাম্মদ জাফর ওয়াত্রির মেয়ে। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের সময় পীর খাইরুদ্দিন স্বপরিবারে মক্কায় চলে যান। ১৮৮৮ সালের ১১ই নভেম্বর মৌলানা আজাদ মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। 
২) ১৮৯০ সালে মৌলানা আজাদের বাবা স্বপরিবারে কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। মৌলানা আজাদ কলকাতার মাদ্রাসায় ৮ বছরের পাঠক্রম মাত্র ৪ বছরেই শেষ করেন।

৩) তিনি মিশরে যান এবং মাত্র ১৯ বছর বয়সে আজাহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাঠ শেষ করে স্বদেশে ফেরেন। তখন মিশরে স্বাধীনতা সংগ্রাম চলছিল এবং তাতে তিনি অনুপ্রাণিত হন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি পীরের পদ গ্রহণ করেননি।

৪) বিদেশ থেকে ফিরে এসে মৌলানা আজাদ বিপ্লবী শ্রীঅরবিন্দ ঘোষ ও শ্রীশ্যামসুন্দর চক্রবর্তীর অনুপ্রেরণায় ব্রিটিশ শাসন বিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দেন। প্রকৃতপক্ষে একদিকে তিনি ছিলেন একজন গোপন বিপ্লবী এবং অন্য দিকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রকাশ্য কর্মী।

৫) মৌলানা আজাদের সম্পাদনায় ‘আল-হেলাল’  নামে একটি প্রগতি চেতনার পত্রিকা প্রকাশিত হত। পত্রিকাটি ছিল সংস্কারমুক্ত এবং আধুনিক চিন্তা-চেতনায় সমৃদ্ধ। পত্রিকাটি ব্রিটিশ সরকারের রোষাণলে পড়ে। কলকাতা থেকে তাকে ১৯১৬ সালে রাঁচিতে নির্বাসিত করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তার ওপর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়।

৬) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে তিনি বিভিন্ন স্থানে তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ ভাষণের মাধ্যমে হিন্দু-মুসলমান ঐক্য ও ইসলামী ঐক্য আন্দোলনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন।

৭) মৌলানা আজাদ মহাত্মা গান্ধীর  অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং তিনি ভারতীয় ন্যশনাল কংগ্রেসে যোগ দেন। স্বদেশী আন্দোলনে অংশগ্রহণ এবং সার্বিকভাবে সহযোগিতা করার জন্য ১৯২১ সালের ১০ ডিসেম্বর মৌলানা আজাদ গ্রেপ্তার হন এবং এক বছর কারাগারে ছিলেন।

৮) ১৯২৩ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে সর্বকনিষ্ট হিসেবে মৌলানা আজাদ কংগ্রেসের একটি সেশনে সভাপতিত্ব করেন। তিনি  দু’বার ভারতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন।রাজনৈতিক জীবনের ১১ বছর তিনি কারাগারে কাটান।

৯) মৌলানা আজাদ জালিয়ানওয়ালাবাগ ও খিলাফৎ আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা  পালন করেন।

১০) তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হবে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য, আর সে ঐক্যের ভিত্তিমূল হবে রাজনীতি ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার সেক্যুলার ধারণা। তিনি সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে ছিলেন। ভারতকে ভাগ করা তিনি মেনে নিতে পারেন নি।

১১) ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হবার পর তিনি পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু সরকারের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার জন্য আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করেন। তিনি ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন স্থাপন করেন।

১২) মৌলানা আজাদ ছিলেন তুখোড় বক্তা। তিনি ১৯০৪ সালে লাহোরে বিদ্বজন সভায় আমন্ত্রণ পেয়ে যোগদান করেন। সেখানে তিন ঘন্টা বক্তৃতা দিয়ে সবাইকে অবাক করে দেন। ইন্দিরা গান্ধী তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, যখনই আজাদ আনন্দ ভবনে থাকতেন, খাবারের টেবিল মানুষে ভরপুর থাকত; এমনকি অনেকে তার কথা শুনতে দাঁড়িয়ে থাকতেন। দীর্ঘ বাক্যকে এক বা দুই বাক্যে ভেঙে বলার এক জাদুকরী ক্ষমতা ছিল আজাদের, যা শ্রোতাদের ওপর অসামান্য প্রভাব বিস্তার করত।

১৩) রাজনীতির পাশাপাশি ইসলামের ওপরও তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার মুক্তচিন্তা সমৃদ্ধ গ্রন্থের জন্য তিনি সমানভাবে খ্যাতি লাভ করেছেন। ‘ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম’ তার লেখা ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি মূল্যবান গ্রন্থ।

১৪)  ২২শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৮ সালে দিল্লিতে তিনি মারা যান। ১৯৯২ সালে ভারত সরকার মৌলানা আজাদকে  ভারতরত্ন পুরষ্কারে ভূষিত করে। 

১৫) তার জন্মবার্ষিকীতে ভারতে "জাতীয় শিক্ষা দিবস" হিসেবে পালিত হয়।

১৬) ২০১৯ সালের জানুয়ারী মাসে এই মহান গুণী মানুষকে নিয়ে তার আত্মজীবনীর উপর প্রথম সিনেমা "ও জো থা এক মাসিহা মৌলানা আজাদ" সারা দেশে মুক্তি পায়।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেইল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

আজ ২২শে ফেব্রুয়ারী, ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের ১৯২তম জন্মবার্ষিকীতে জানাই আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

আজকের দিনে জাতীয়তাবোধ,স্বদেশপ্রীতি ইত্যাদি শব্দগুলি খুব আলোচিত হচ্ছে। আজ ২২শে ফেব্রুয়ারি, শিক্ষাবিদ, চিন্তাবিদ, সাহিত্যিক ও জাতীয়তাবাদী ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের ১৯২তম জন্মবার্ষিকী। তাঁর সম্বন্ধে এই বিষয়ে নিচের  অনুচ্ছেদটি খুবই প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

"স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস" গ্রন্থে ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের  ইতিহাসবোধ, স্বদেশপ্রীতি এবং কল্পচেতনার এক অনবদ্য সমন্বয় ঘটেছে। এ গ্রন্থে তিনি কাল্পনিক ঘটনার মাধ্যমে ভারতের জাতীয় চরিত্রের দুর্বলতার দিকগুলি চিহ্নিত করেছেন। এখন যে সময়টার কথা বলছি তখন বঙ্কিমচন্দ্র ঠিক লিখতে শুরু করেননি। হিন্দু কলেজের  ছাত্র মাইকেল মধুসূদন দত্তের বন্ধু জাতীয়তাবাদী ভূদেব মুখোপাধ্যায় লেখালেখি করছেন। হিন্দু কলেজের এক ইংলিশ শিক্ষক একবার লিখলেন, "ভারতীয়দের কোন জাতীয়তাবোধ নেই"। এর উত্তরে ভূদেব মুখোপাধ্যায় লিখলেন-"স্বামীর প্রতি পিতৃগৃহের অপমানে দেহত্যাগ করেছিলেন সতী, সুদর্শন চক্রে কাটা সতী’র দেহের নানা অংশ যেখানে যেখানে পড়েছে সেখানেই ভারতের তীর্থস্থান। তবে সতী সব মিলিয়ে এক: সব তীর্থ মিলে একই ভারত মাতা। সেটাই ভারতীয় জাতীয়তাবোধ। সদা জাগ্রত"। একবার তিনি বলেছিলেন "ভারতবর্ষ একটা মহাদেশ। এই মহাদেশের অন্তর্গত প্রত্যেক বিভাগের নেতাদের যত্নে যদি সমস্ত দেশ মিলিত হতে পারে তাহা হইলে এক মহাজাতির অভ্যুত্থান কল্পনা করিতে পারি..... "। এরকমই ছিল ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের  জাতীয়তাবোধ ও স্বদেশপ্রীতির ভাবনা।

১৮২৭ সালের এই দিনে ভূদেব মুখোপাধ্যায় কলকাতার হরীতকীবাগান লেনে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা খ্যাতনামা পন্ডিত বিশ্বনাথ তর্কভূষণ। ভূদেব মুখোপাধ্যায় পেশাগতভাবে ছিলেন এক শিক্ষক এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর বঙ্গের নবজাগরণের এক অন্যতম পুরোধা। তাঁর লেখায় আধুনিক চিন্তাসমুহ তৎকালীন নবীন সাহিত্যগোষ্ঠীর মধ্যে এক গভীর প্রভাব সৃষ্টি করে যাঁদের অন্যতম হলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও  হেমচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়।

১৮৫৭ সালে বাংলা সাহিত্যে প্রথম ঐতিহাসিক উপন্যাস "অঙ্গুরীয় বিনিময়" নামে একটি বই প্রকাশ করেন ভূদেব মুখোপাধ্যায়। এই বইয়ে "অঙ্গুরীয় বিনিময়" ছাড়া অন্য  আরেকটি উপন্যাস ছিলো যার নাম "সফল স্বপ্ন"। উপন্যাস দুটিতে ঐতিহাসিক তথ্যনিষ্ঠার সাথে সচেতন ফিকসনের যোগ আছে। বলা হয় বাংলা সাহিত্যে ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখবার প্রথম উদাহরণ ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের। পরে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ উপন্যাসে অঙ্গুরীয় বিনিময়-এর প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়।

হিন্দি ভাষার উন্নয়নেও ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের অবদান স্মরণীয়। স্কুল পরিদর্শক থাকাকালীন তাঁর প্রচেষ্টায় বিহারে অসংখ্য হিন্দি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়াও তিনি বাংলা পুস্তকের হিন্দি অনুবাদকরণ এবং মূল হিন্দি পুস্তক রচনায় সচেষ্ট ছিলেন। তাঁরই প্রস্তাব অনুযায়ী বিহারের আদালতসমূহে ফারসির পরিবর্তে হিন্দি ভাষা প্রবর্তিত হয়। হিন্দিকে সর্বভারতীয় ভাষারূপে গ্রহণ করা উচিত বলেও তিনি মনে করতেন।

সংস্কৃতর প্রতি তাঁর আত্মিক অনুরাগের পরিচয় হিসেবে (মূলত ভাষার উন্নতির জন্য) তিনি তাঁর পিতার নামে বিশ্বনাথ ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করেছিলেন। এছাড়াও বিশ্বনাথ চতুষ্পাঠী এবং মায়ের নামে ব্রহ্মময়ী ভেষজালয় স্থাপন করেছিলেন। ভূদেব মুখোপাধ্যায়কে ভারতচিন্তার পথপ্রদর্শক হিসেবে অভিহিত করা হয়।

ভূদেব মুখোপাধ্যায় ছাত্রদের পাঠোপযোগী অনেক গ্রন্থও রচনা করেছেন। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য: প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, পুরাবৃত্তসার, ইংল্যান্ডের ইতিহাস, রোমের ইতিহাস, ক্ষেত্রতত্ত্ব , বাংলার ইতিহাস, পুষ্পাঞ্জলি  ইত্যাদি। সাহিত্য, ধর্মশাস্ত্র, সমাজ, শিক্ষা, ইতিহাস, বিজ্ঞান প্রভৃতি ক্ষেত্রে ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের গভীর পান্ডিত্যের স্বাক্ষর মেলে। তাঁর কর্মের সম্মান স্বরূপ ১৮৭৭ সালে তিনি সরকার কর্তৃক সি.আই.ই উপাধি লাভ করেন। ১৫ই মে ১৮৯৪ সালে কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়।

আজ ২২শে ফেব্রুয়ারী, ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের ১৯২তম জন্মবার্ষিকীতে জানাই আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেইল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

20 February 2019

শরৎচন্দ্র বসু ছিলেন  ব্যারিস্টার, জাতীয়তাবাদী রাজনীতিক, কংগ্রেস দলীয় ও ফরোয়ার্ড ব্লক এর নেতা। আজ ওঁনার ৬৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর ভাই বোনেদের মধ্যে মেজদা শরৎচন্দ্র বসুর সঙ্গে ছিল তাঁর অন্তরঙ্গতা। প্রথম থেকেই শরৎচন্দ্র বসু নেতাজীর বৈপ্লবিক চিন্তাধারাকে সমর্থন করতেন। দুজনের ব্যস্তময় জীবনেও জড়িয়ে থাকতো কিছু মজার মজার ঘটনা। একবার খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনে দেখা যায় সুভাষচন্দ্র লিখেছেন "আমি বনকুসুম তৈল মাখিয়া দেখিলাম উহা অত্যন্ত উপকারী"। এই বিজ্ঞাপন দেখে শরৎচন্দ্র বসু তাঁকে ডেকে বলেন " সুভাষ তুই একটা কাজ কর। বিজ্ঞাপনের সঙ্গে তোর আগের এবং এখনকার দুটো ছবি পাঠিয়ে দে, তাহলেই তেলের উপকারিতা বোঝা যাবে।" ছোটবেলায় নেতাজীর ঘন চুল থাকলেও পরে তা কমে গিয়েছিল। আর একদিনের ঘটনা। মিটিং-এ নেতাজীকে যেতে হবে দূরে ট্রেনে করে। সবাই তৈরী হয়ে আছেন কিন্তু নেতাজী যখন তৈরী হলেন তখন ট্রেন ছাড়তে বাকি মাত্র সাত মিনিট। এর পরে আর কোনো ট্রেন নেই। এই ট্রেন মিস করলে আর মিটিং এ যাওয়া হবে না। তখন কলকাতার জ্যাম না থাকলেও সাত মিনিটে এলগিন রোড থেকে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছানো সম্ভব নয়। শেষমেশ শরৎচন্দ্র বসু হাওড়া স্টেশনে ফোন করে নানা কারণ দেখিয়ে ট্রেনটিকে আটকান। নেতাজীও হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। গান্ধিজী কলকাতায় শরৎচন্দ্র বসুর বাড়ীতে উঠলে গান্ধিজীর অটোগ্রাফ নেবার জন্য সেখানে জমা পড়তো অনেক খাতা। প্রতি অটোগ্রাফের জন্য গান্ধিজী নিতেন ৫ টাকা। একদিন  শরৎচন্দ্র বসু নেতাজীকে বলেন "তোরও টাকার খুব দরকার। তোর সইয়ের জন্য ২ টাকা নে না।" নেতাজী এর উত্তরে বলেন "ওসব আমার দ্বারা হবে না"। এ রকমই ছিল শরৎচন্দ্র বসুর সঙ্গে নেতাজীর সম্পর্ক। আজ শরৎচন্দ্র বসুর ৬৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে জানাই আমাদের শ্রদ্ধা।

জানকীনাথ বসুর পুত্র ও সুভাষচন্দ্র বসুর মেজ ভাই শরৎচন্দ্র বসু  ৬ই সেপ্টেম্বর,১৮৮৯ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন।  শরৎচন্দ্র বসু  ছিলেন  ব্যারিস্টার, জাতীয়তাবাদী রাজনীতিক, বঙ্গীয় আইন সভায় বিরোধী কংগ্রেস দলীয় নেতা ও ফরোয়ার্ড ব্লক এর নেতা।  কলকাতায় স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ করে তিনি ১৯১১ সালে ইংল্যান্ড যান। চিত্তরঞ্জন দাশের অনুপ্রেরণায় শরৎচন্দ্র বসু রাজনীতি শুরু করেন। ১৯৩৬ সালে তিনি বেঙ্গল কংগ্রেসের সভাপতি হন। ১৯৩৬ থেকে ১৯৪৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ছিলেন। কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা নিয়ে কংগ্রেসের ভূমিকা সম্পর্কিত ইস্যুতে তিনি ১৯৪৭ সালে তাঁর সদস্য পদ ত্যাগ করেন। একজন দেশপ্রেমিক বাঙালি হিসেবে শরৎচন্দ্র বসু বাংলা বিভাগের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি সমাজ ও ভাষার ভিত্তিতে গঠিত স্বশাসিত সমাজতান্ত্রিক রাজ্যের সমন্বয়ে একটি অখন্ড ভারত গঠনের পক্ষে ছিলেন। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে তাঁর চিন্তাধারার যথেষ্ট মিল ছিল। সোহরাওয়ার্দীও এ সময় আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মিলিত স্বাধীন বাংলা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। উভয় নেতা পরবর্তী সময়ে একটি অখন্ড স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এক হয়ে কাজ করেন।

শরৎচন্দ্র বসু ভারতীয় সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের একজন নৈতিক সমর্থক ছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের হয়ে আদালতে বিনা পারিশ্রমিকে সওয়াল করতেন। তার স্ত্রী শ্রীমতি বিভাবতী বসুও গান্ধীবাদী আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামে সহযোগী ভূমিকা নেন। ১৯৫০ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি শরৎচন্দ্র বসুর কলকাতায় মৃত্যু হয়।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেইল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।






19 February 2019

আজ ১৯শে ফেব্রুয়ারী, রাণী রাসমণির ১৫৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। রাণী রাসমণির জীবণী নিয়ে বর্তমানে টিভি সিরিয়াল চলছে রমরমিয়ে।

রাণী রাসমণি ছিলেন কলকাতার জানবাজারের বাসিন্দা প্রসিদ্ধ মানবদরদি জমিদার। তিনি দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ির প্রতিষ্ঠাত্রী এবং রামকৃষ্ণ পরমহংসের অন্যতমা পৃষ্ঠপোষক। আজ ১৯শে ফেব্রুয়ারী, রাণী রাসমণির ১৫৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। রাণী রাসমণির জীবণী নিয়ে বর্তমানে টিভি সিরিয়াল চলছে। 'করুণাময়ী রানী রাসমনি’-এই ধারাবাহিকটি ইতিমধ্যেই খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এমনকি এই ধারাবাহিক এতটাই সাড়া ফেলেছে সেই কারণে বন্ধ হতে বসেছে বেশ কিছু সিরিয়াল। বর্তমানে চলছে এপিসোড ৫৭০। জানবাজারের দাস পরিবারের বউ হয়ে আসা থেকে শুরু করে করুণাময়ী রাণী রাসমনি হয়ে ওঠার কাহিনী দেখানো হচ্ছে এই ধারাবাহিকে। হালি শহরের এক ঘুঁটেকুড়ানি মেয়ে ভাগ্যের বসে একদিন হয়ে ওঠে অসাধারণ। গল্পটা এতো সুন্দর যে সেটি বেশ কিছুদিনের মধ্যেই মন ছুঁয়ে যায় দর্শকের। ওঁনার আজকের দিন স্মরণে একটা প্রতিবেদন লেখার ইচ্ছা ছিল। টিভি ধারাবাহিকের  দৌলতে আজ পাঠকদের রাণী রাসমনির অনেক জানা অজানা কাহিনী গোচরে এসেছে। তাই পাঠককে আর নতুন করে রাণী রাসমনির কাহিনী শোনাতে চাই না।

বাংলার সাহিত্যিক ও কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকায় ১৯৮১ সালে "সেই সময়" নামে একটি ধারাবাহিক উপন্যাস লেখেন। সেখানে প্রথম পর্বে প্রকাশিত ধারাটি এখানে উপস্থাপন করে রাণী রাসমনির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জানালাম। আশা করি আবার পড়লে সকলের ভালো লাগবে।

"জানবাজারের বিখ্যাত ধনী প্রীতিরাম মাড়ের পুত্ৰবধু রাসমণি বিধবা হবার পর নিজেই তাঁদের বিপুল সম্পত্তি ও বৃহৎ সংসারের হাল ধরেন। মাহিষ্য বংশীয়া এই রমণীটি বিদ্যাশিক্ষা করেননি বটে, কিন্তু তাঁর জাগতিক জ্ঞান অতি প্রখর। তাঁর স্বামী রাজা ছিলেন না, কিন্তু স্বামীর নাম ছিল রাজচন্দ্ৰ, সেই সুবাদে রাজচন্দ্রের পত্নীকে অনেকে রানী বলে অভিহিত করেন। এবং তিনি রানী নামের যোগ্যও বটে। শ্ৰীমতী রাসমণি যেমন রূপবতী, তেমন তেজস্বিনী।

রূপের জন্যই সামান্য দরিদ্র পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি এত সম্পদশালী পরিবারের বধু ও কর্ত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিতা হন। জন্মস্থান হালিশহরের কাছে গঙ্গাতীরে কিশোরী রাসমণি একদিন স্নান করতে এবং জল তুলতে এসেছিলেন। তখন তাঁর বয়েস এগারো। সেই সময় যুবক রাজচন্দ্ৰ গঙ্গাবক্ষে বজরায় বন্ধুবান্ধব সমভিব্যাহারে যাচ্ছিলেন কোনো তীর্থে। রাজচন্দ্রের তখন হৃদয় ভগ্ন, জীবনে শান্তি নেই। পর পর দুটি স্ত্রী পরলোকগমন করায় রাজচন্দ্রের আর বিবাহে মতি নেই। কিন্তু নদীকূলে ঐ রূপলাবণ্যবতী কিশোরীটিকে তাঁর চোখে লেগে গেল। রাজচন্দ্রের বন্ধুবান্ধবরাও বললো, সত্যি, এমনটি আর হয় না। তারা অনুসন্ধান করে জানলো যে, জাতের অমিল নেই, কন্যাটি পালটি ঘরের। পুত্রের বন্ধুদের মুখে সব কথা জানতে পেরে প্রীতিরাম ঐ মেয়েটিকে পুত্রবধু করে নিয়ে এলেন। বন্ধু সুলক্ষণা, তিনি আসবার পর এই পরিবারের উত্তরোত্তর শ্ৰীবৃদ্ধি হতে লাগলো।

রাজচন্দ্রের মৃত্যুর আগে রানী রাসমণির নাম সর্বসাধারণের মধ্যে বিশেষ পরিচিত ছিল না। স্বামীর শ্রাদ্ধের সময়ই তাঁর খানিকটা পরিচয় পাওয়া গেল। এমন দানশীলা রমণী কেউ আর আগে দেখেনি। দানসাগর শ্রাদ্ধে পর পর দুদিন ধরে তিনি মুঠো মুঠো ধন দান করতে লাগলেন। তাঁর নির্দেশ, কোনো প্রার্থই যেন ফিরে না যায়। তৃতীয় দিনে তিনি করলেন তুলট। শুদ্ধ বস্ত্ৰ পরে রানী রাসমণি বসলেন দাঁড়িপাল্লার একদিকে, অন্যদিকে চাপানো হলো শুধু রূপোর টাকা। তাঁর দেহের ওজন হলো ছ হাজার সতেরোটি রৌপ্যমুদ্রা, সেগুলি সেই দণ্ডেই বিতরণ করা হলো পণ্ডিত ব্ৰাহ্মণদের মধ্যে। তারপর থেকে যে কোনো মহৎ কর্মের উদ্দেশ্যে কেউ প্রার্থী হয়ে এলে রানীর কাছ থেকে আশাতীত দান পেয়ে যায়।

রানী রাসমণি যেমন একদিকে অকাতরে দান করেন তেমনি অন্যদিকে বিষয় সম্পত্তিও বাড়িয়ে চলেছেন। কী জমিদারি পরিচালনায়, কী ব্যবসায় কাৰ্যে, তিনি পরিচয় দেন অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার। অর্থ উপার্জনে তাঁর যেমন আনন্দ, তেমনি ব্যয়ে। কলকাতার অন্য ধনীদের প্রায় সবার সঙ্গে রাসমণির একটি পরিষ্কার পার্থক্য চোখে পড়ে। অন্যরাও অনেক সময় দান ধ্যান করেন বটে, কিন্তু বিলাসে প্ৰমোদেও তাঁরা কম অর্থব্যয় করেন না। কিন্তু রানী রাসমণি শুদ্ধাচারিণী, বিশেষ বিশেষ তিথিতে তিনি ভূমিশয্যায় নিদ্রা যান।

কলকাতার ধনীদের মধ্যে একমাত্র ঠাকুর বাড়ির দেবেন্দ্ৰবাবু সমস্ত বিলাসিত পরিত্যাগ করে ধর্ম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেছেন। এক হিসেবে দেবেন্দ্ৰবাবুও রানী রাসমণির প্রতিপক্ষ। দেবেন্দ্ৰবাবু প্রচার করছেন, দেশবাসী পুতুল পূজা পরিত্যাগ করে নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা করুক। আর রানী রাসমণি পূজা করেন সাকার ঈশ্বরের। সমস্ত দেব-দেবীর প্রতি তাঁর অচলা ভক্তি। হিন্দু ধর্মের মহিমা বিস্তারের জন্য তাঁর ধনভাণ্ডার উন্মুক্ত। প্রিন্স দ্বারকানাথ তাঁর স্বামীর কাছ থেকে এক সময় দু লক্ষ টাকা কার্জ নিয়েছিলেন, যথাসময়ে তা শোধ করতে পারেননি বলে ঠাকুরদের জমিদারির একটি পরগণা এখন রানী রাসমণির অধীনে। সুতরাং, প্রকারান্তরে দ্বারকানাথেরই জমিদারির টাকায় দেবেন্দ্ৰবাবু ও রানী রাসমণি পরস্পরবিরোধী দুই ধৰ্মকর্মে ব্যাপৃত।

আতুরালয় স্থাপন, গঙ্গায় ঘাট নিমণি, বিভিন্ন তীর্থের দেবদেবীর অলঙ্কার সজ্জা, এ সব তো আছেই, তা ছাড়া এই নগরের উন্নতিকল্পেও তাঁর যত্নের অন্ত নেই। জানবাজারে রানী রাসমণির প্রকাণ্ড অট্টালিকায় দোল-দুর্গোৎসবের জাঁকজমকও কয়েক বৎসরের মধ্যে প্রবাদ-প্রসিদ্ধি পেয়ে গেল। দুর্গোৎসব করতেন বটে পোস্তার রাজা সুখময় রায়, তারপর এই রানী রাসমণি। এই সব উৎসবে সারা শহরের লোক ভেঙে পড়ে তাঁর বাড়িতে। রথের দিন পথে বেরোয় প্রাসাদতুল্য সম্পূর্ণরূপোয় নির্মিত রথ, তার পিছনে প্ৰায় আধ ক্রোশব্যাপী শোভাযাত্রা, তাতে অবিরাম শোনা যায় গীত, বাদ্য আর হারি বোল ধ্বনি।

দুর্গোৎসব উপলক্ষেই রানী রাসমণির অন্য একটি রূপ প্রকাশিত হলো একবার। মহালয়ার দিনের বোধন থেকে শুরু হয় উৎসব। সপ্তমীর দিনে খুব ভোরে ব্ৰাহ্মণরা নব পত্রিকা নিয়ে গঙ্গায় স্নান করাতে যায়, তাদের পেছনে পেছনে বাজনাদাররা ঢাকা, ঢোল, সানাই, করতাল বাজাতে বাজাতে চলে। সেই তুমুল বাদ্যরবে এক সাহেবের নিদ্রার খুব ব্যাঘাত হলো। তিনি গবাক্ষ খুলে দেখলেন একদল অর্ধ উলঙ্গ নেটিভ বিকট শব্দ করে লাফাতে লাফাতে চলেছে। নেটিভদের অনেক প্রকার উদ্ভট মুখামির পরিচয় এর আগে পাওয়া গেছে, কিন্তু সূযোদয়ের আগে সকলকার ঘুম ভাঙিয়ে একি উৎকট আনন্দ! মুখ রক্তবর্ণ করে সাহেব দারুণ চেঁচামেচি করতে লাগলেন এবং তখনই হুকুম দিলেন বাজনা বন্ধ করার। কিন্তু রানী রাসমণির লোকেরা শুনবে কেন? তারা কর্ণপাত না করে তেমনভাবেই ড্যাং ড্যাং করে চলে গেল। ক্ৰোধে অগ্নিশর্মা হয়ে সাহেব খবর দিলেন কোতোয়ালিতে। পুলিসের সাহায্য চাইলেন, যাতে ফেরার পথে ঐ নেটিভরা তাঁর শান্তি ভঙ্গ করতে না পারে। দু-একজন অনুচর এ সংবাদ জানালো রানী রাসমণিকে। তিনিও দপ করে জ্বলে উঠলেন রাগে। তিনি বললেন, আমরা হিন্দু, আমাদের ধর্মকর্মে বাধা দেবার কী অধিকার আছে সাহেবের? সাহেবরা যে খৃষ্টীয় পরবে। সারারাত্রব্যাপী হিল্লা করে, তখন কি আমরা বাধা দিতে যাই? যা, আরও বেশী করে ঢাক ঢোল বাজা গে যা তোরা! শুধু তাই নয়, আজ সারাদিন ধরে এই পথ দিয়ে বাজাতে বাজাতে যাবি আর আসবি।তিনি কয়েকজন পাইকও পাঠিয়ে দিলেন ওদের সঙ্গে। দুচারজন পুলিস সেই শোভাযাত্রাকে বাধা দিতে পারলো না। রাসমণির কর্মচারীরা বললো, আমাদের মা বলে দিয়েছেন, এ রাস্তা আমাদের, এখানে আমরা যা খুশী করবো। সাহেব হাত পা কামড়াতে লাগলেন, সারাদিন ধরে অসহ্য ঢাকের বাজনা তাঁর কান ঝালাপালা করে দিল। সাহেব একটি মামলা ঠুকলেন রাসমণির নামে। ইংরেজের আদালতে ইংরেজ আনীত মামলার ফলাফল যা হবার তাই হলো, পঞ্চাশ টাকা জরিমানা হলো রাসমণির। কিন্তু এ রমণী বড় জেদী, কিছুতেই হার স্বীকার করার পাত্রী নন। জরিমানার টাকা জমা দিয়ে রাসমণি বললেন, বেশ, এর পর থেকে যে রাস্তা আমি বানিয়েছি, সে রাস্তা দিয়ে অন্য কারুর হাঁটা চলার এক্তিয়ার থাকবে না। বড় বড় গরাণ কাঠের গুড়ি দিয়ে তিনি জানবাজার থেকে বাবুঘাট পর্যন্ত রাস্তার দুদিকে শক্ত বেড়া দিয়ে দিলেন। সব যানবাহন বন্ধ হয়ে গেল, নগর পরিচালকরা পড়লেন মহা অসুবিধেয়। শেষ পর্যন্ত তাঁরা আপোস করলেন রাসমণির সঙ্গে, ক্ষমা চেয়ে তাঁরা জরিমানার টাকা ফেরত দিলেন। রাসমণিও তুলে নিলেন পথের বেড়া। এক স্ত্রীলোকের এই জয় কাহিনীতে খুব আমোদ পেল নগরবাসীরা।

রানী রাসমণি আর একবার কোম্পানী বাহাদুরকে জব্দ করেছিলেন। সরকার থেকে হঠাৎ আদেশ জারি করা হলো, গঙ্গায় আর জেলেরা ইচ্ছে মতন মাছ ধরতে পারবে না। মাঘে সরস্বতী পূজার পর থেকে সেই আশ্বিন মাস পর্যন্ত গঙ্গা থাকে ইলিশ মাছে ভরা, তখন গঙ্গাবক্ষ জেলে ডিঙিতে ছেয়ে যায়। এর ফলে জাহাজ চলাচলে অসুবিধা হয় বলে ঠিক হলো যে যার খুশী সে আর এখানে মাছ ধরতে পারবে না। এজন্য কর দিতে হবে। কর দিতে গেলেই জেলে ডিঙির সংখ্যা যাবে অনেক কমে। মৎস্যজীবীরা গিয়ে কেঁদে পড়লো রানী রাসমণির পায়ে। অনেকের জীবিকা নষ্ট হবার উপক্ৰম। এখন রানী না বাঁচালে তাদের কে বাঁচাবে? তিনি ছাড়া তাদের জাতের দুঃখে আর কে সমব্যাথী হবে? রাসমণি তখন আবার এক চমকপ্ৰদ বুদ্ধির পরিচয় দিলেন। সরকার মাছ ধরার জন্য কর চেয়েছেন, ঠিক আছে, সেই কর তিনি একাই দেবেন। দশ হাজার টাকা দিয়ে তিনি ঘুষুড়ি থেকে মেটেবুরুজ পর্যন্ত গঙ্গা ইজারা নিয়ে নিলেন সরকারের কাছ থেকে। তারপর জাহাজ লঙ্গর করার মোটা দড়ি দিয়ে ঘিরে ফেললেন গঙ্গার সেই এলাকা, জেলেদের বলে দিলেন, এবার তোরা মাছ ধর, যত খুশী মাছ ধর। দড়ি দিয়ে ঘেরার ফলে সব জাহাজ আটকে গেল। কলকাতার বন্দরে আর কোনো জাহাজ ভিড়তে পারে না, কলকাতার জীবন অচল হয়ে যাবার উপক্ৰম। কলকাতার লোক সবাই সেদিন গঙ্গার কুলে গিয়েছিল রানী রাসমণির কীর্তি দেখতে। দুলালচন্দ্রকে নিয়ে নবীনকুমারও গিয়েছিল। সে বড় অদ্ভুত দৃশ্য। মোটা দড়ির ওধারে সার বেঁধে থমকে আছে ইংরেজের জাহাজ, তার নাবিকরা সব হতভম্ব, আর এদিকে পতঙ্গের মতন অজস্র জেলে ডিঙি ভাসছে, জেলেরা উল্লাসে হো হো হা হা করছে। এই দৃশ্যে বড় মজা পেয়েছিল নবীনকুমার। সে তখন খুবই বালক, তবু ইচোড়ে পাকার ভঙ্গিতে সে দুলালকে বলেছিল, দ্যাক দ্যাক, জানবাজারের জমিদারণী ইংরেজের মুখে চুনকালি দিয়েচে। ব্যতিব্যস্ত হয়ে সরকার রাসমণির কাছ থেকে কৈফিয়ত তলব করলেন। রাসমণির উত্তর অতি সরল। মাছ ধরার জন্য তিনি গঙ্গার অংশ ইজারা নিয়েছেন, এখন সেই অংশ তিনি জেলেদের মধ্যে বিলি করতে পারেন, সে অধিকার তাঁর আছে। এখান দিয়ে জাহাজ চলাচল করলে মাছ ধরায় বিঘ্ন হবে। সরকার তাঁকে ইজারা দিয়েছেন। এখন তাঁর সুবিধে অসুবিধে দেখার দায়িত্ব তো সরকারের। পুকুর জমা নিয়ে যখন বেড়া জাল ফেলে মাছ ধরা হয়, তখন কি পাড়া-প্রতিবেশীরা সেই পুকুরে আর নাইতে আসে? অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হলো, রানীও দড়ি কাছি গুটিয়ে নিলেন।

রানীর বয়েস এখন ষাট, কিন্তু স্বাস্থ্য অটুট, আর তেজও এক বিন্দু কমেনি। পরিণত বয়সে তাঁর রূপ আরও মহিমান্বিত হয়েছে, এখনো তিনি স্বয়ং জমিদারি পরিচালনা করেন, প্রজাদের দুঃখ দুৰ্দশার কথা শোনেন। তাঁর জীবনের প্রধান ব্ৰত দুটি। প্রজাদের প্রতি অবিচার রোধ এবং সনাতন হিন্দু ধর্মের সংস্থাপন। খৃষ্টানী এবং নিরাকার ব্রহ্মের পূজা, তাঁর দুই নয়নের বিষ। হিন্দু ধর্মের গৌরব তিনি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে যাবেনই।

সম্প্রতি তিনি একটি অতি বৃহৎ কাজের দায়িত্ব নিয়েছেন এবং সেই ব্যাপারেই প্রবল আঘাত পেলেন দেশবাসীর কাছ থেকে। রানী স্বাবলম্বিনী। বিধবা হবার পর তিনি প্রায়ই এক সঙ্গে অনেক বজরা সাজিয়ে, পাইক বীরকন্দাজ সঙ্গে নিয়ে নানান তীর্থ ভ্ৰমণে গেছেন। একবার তিনি কাশীধামে গিয়ে বিশ্বেশ্বর ও অন্নপূর্ণা দর্শন করে আসবেন মনস্থ করেছিলেন। কাশী অনেক দূরের পথ, দস্যু-তস্করের উপদ্রবের ভয় আছে, কিন্তু একবার কোনো কথা মনে এলে রানী আর নিরস্ত হন না। তিনি এক সঙ্গে পঁচিশখানা বজরা সাজালেন, তাতে নিলেন ছ মাসের উপযোগী খাদ্যদ্রব্য আর প্রচুর লোকলস্কর ও অস্ত্ৰধারী প্রহরী। মধ্য রাত্রে জোয়ারের পর বজরার বহর ছাড়বে। আত্মীয় পরিজনদের নিয়ে রানী আগেই নিজস্ব বজরায় উঠে শুয়ে পড়েছেন। ঘুমের মধ্যে কখন বজরা ছেড়েচে, তিনি খেয়াল করেননি। এমন সময় রানী একটি স্বপ্ন দেখলেন। স্বপ্ন নয়, রানীর মনে হলো দৈব দর্শন। স্বয়ং জগজননী মা কালী তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়ে ভর্ৎসনার সুরে বলছেন, তোর সন্তানতুল্য ছেলেরা খেতে পরতে পাচ্ছে না, তাদের ছেড়ে তুই কোথায় চললি? কাশী? এদের সেবা কর, তাতেই আমাকে পূজা করা হবে। এখানে এই গঙ্গাতীরেই মন্দির প্রতিষ্ঠা করে সেবার ব্যবস্থা কর, সেখানেই আমি তোর হাতের পূজা গ্রহণ করবো। স্বপ্ন ভেঙে যেতেই রানী রাসমণি ধড়ফড় করে উঠে বসলেন। তাঁর সর্বাঙ্গ ঘামে সিক্ত। স্বপ্ন নয়, যেন একেবারে সত্য। মা তাঁকে আদেশ দিয়ে গেছেন। একটুক্ষণ আচ্ছন্ন ভাবে বসে রইলেন তিনি। তারপর বাইরে বেরিয়ে এসে চিৎকার করে বললেন, ওরে, বজরা থামা, বজরা থামা! পরদিন প্ৰভাতে সবগুলি বজরার অন্ন বস্ত্ৰ স্থানীয় দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে রানী ফিরে এলেন জানবাজারে। তাঁর যাত্ৰা ভঙ্গের কারণ আর কারুর কাছে ব্যক্ত না করে তিনি ডেকে পাঠালেন মথুরকে।

রানীর পুত্ৰ সন্তান নেই। চারটি কন্যা। এর মধ্যে তৃতীয়া কন্যার বিবাহ দিয়েছিলেন এই মথুরের সঙ্গে। সেই কন্যাটি অকালে মারা যায়। তারপর চতুর্থ কন্যাটির সঙ্গেও মথুরেরই বিবাহ দিয়ে তাঁকে তিনি ঘরজামাই করে রেখেছেন। এই মথুর বেশ বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান, রানীর বিষয়কর্মের ডান হাত। মথুরকে ডেকে তিনি বললেন, তুমি গঙ্গার কুলে জমি দেখো, আমি মন্দির প্রতিষ্ঠা করবো। গঙ্গার পশ্চিম কূল, বারানসী সমতুল, সুতরাং পশ্চিম পারে জমি পেলেই ভালো হয়। কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সেদিকে পছন্দমতন এক লপ্তে অনেকখানি জমি পাওয়া গেল না, বরং পূর্বপারে দক্ষিণেশ্বর গ্রামে জমি বিক্রয় আছে। সুপ্রিম কোর্টের অ্যাটনী হেস্টি সাহেবের কুঠি, মুসলমানদের একটি পরিত্যক্ত কবরখানা ও এক গাজী সাহেবের পীরের আস্তানা, সব মিলিয়ে সাড়ে চুয়ান্ন বিঘা জমি, মূল্য সাড়ে বেয়াল্লিশ হাজার টাকা। সেখানে শুরু হলো একালের বৃহত্তম মন্দিরের নির্মাণের কাজ। গঙ্গার কুলে পোস্তা বেঁধে আগাগোড়া বাঁধিয়ে দেওয়া হলো, তৈরি হলো বৃহৎ স্নান ঘাট, তারপর দ্বাদশ শিব মন্দির, বিষ্ণু মন্দির, নবরত্ন চূড়াযুক্ত কালী মন্দির ও নাট মন্দির। যত লক্ষ টাকা লাগে লাগুক, তবু সব কিছু রানীর মনোমতন হওয়া চাই।

মন্দির গঠনের কাজে যাতে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে সেইজন্য রানী কঠোর কৃচ্ছতা অবলম্বন করলেন। ত্রি-সন্ধ্যা স্নান, হবিষ্যান্ন গ্রহণ, ভূমিতে শয়ন এবং নিশিদিন ইষ্টদেবতার কাছে প্রার্থনা। কয়েক বছর ধরে চললো মন্দির নির্মাণের কাজ, প্রতিদিন তিনি মথুরের কাছ থেকে খবরাখবর নেন। এবং মাঝে মাঝে নিজে দক্ষিণেশ্বর গ্রামে গিয়ে কাজের প্রগতি দেখে আসেন। আর বেশি বাকি নেই, বৎসরকালের মধ্যেই মূর্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে, রানী এর মধ্যেই দিনক্ষণ দেখতে শুরু করেছেন। তবু বাধা এলো অন্য দিক থেকে। একদিন মথুর এসে বিষণ্ণ মুখে জানালেন সেই দুঃসংবাদ। ব্ৰাহ্মণ পণ্ডিতেরা ফতোয় দিয়েছেন, জানবাজারের জমিদার-পত্নী রাসমণি দাসী দক্ষিণেশ্বর গ্রামে মন্দির প্রতিষ্ঠা করলে, সে কাজ হবে অশাস্ত্রীয়। রানী একেবারে আকাশ থেকে পড়লেন। অশাস্ত্রীয়? তিনি শুদ্ধচিত্তে, ফলের প্রত্যাশী না হয়ে, তাঁর সমস্ত সম্পদ উজাড় করে মন্দির স্থাপন করতে চান, সে কাজ অশাস্ত্রীয় কেন হবে? মথুর জানালেন যে, ব্ৰাহ্মণরা বলেছেন, শূদ্রের কোনো অধিকার নেই দেবদেউল প্রতিষ্ঠার। শূদ্রের হাতের পূজা কোনো দেব-দেবী নেন না। টাকার গরম থাকলেই কি শাস্ত্ৰ উল্টে যাবে! এই বলে পণ্ডিতরা ঘোঁটি পাকাচ্ছে। রানী হাহাকার করে বললেন, কিন্তু মা যে স্বয়ং আমায় দেকা দিয়ে বলেচেন যে তিনি আমার হাতের পূজা নেবেন! ব্ৰাহ্মণ পণ্ডিতেরা সে স্বপ্নের কথা বিশ্বাস করবে না। স্বপ্নের কথা বলে শাস্ত্ৰ পাল্টানো যায় না। রানী রাসমণি গুম হয়ে বসে রইলেন। তাঁর শ্রদ্ধাভক্তি, ধর্ম সংস্থাপনের জন্য তাঁর ব্যাকুলতা, এ সবই তুচ্ছ? তিনি শূদ্র বংশীয়া, এটাই বড় কথা? তা ছাড়া, কে বলেছে। শূদ্র? মাহিষ্যরা মোটেই শূদ্ৰ নয়। ব্ৰাহ্মণরা যে-কোনো একটা ফতোয়া দিয়ে দিলেই হলো! জমিদারির কাগজপত্রে তাঁর নামের শিলমোহরে লেখা থাকে, কালীপদ অভিলাষী শ্ৰীমতী রাসমণি দাসী। পণ্ডিতেরা তাঁর মায়ের পদ বন্দনা করতে দেবে না। দক্ষিণেশ্বরের মন্দির বিগ্রহহীন শূন্য পড়ে থাকবে? ব্রাহ্মণরা অশাস্ত্রীয় বলে ঘোষণা করলে পাপের ভয়ে কেউ তো সে মন্দিরে যাবে না।

একটু পরে রানী চোখের জল মুছে বললেন, তা বলে তো ভেঙে পড়লে চলবে না, মথুর। হেরে যেতে আমি শিখিনি। কলকাতার পণ্ডিতরা বলেচে বলে সেটাই তো শেষ কতা নয়। তুমি লোক পাঠাও, কাশীতে, মারহাট্টাদের দেশে, দক্ষিণ ভারতে। সেখানেও বড় বড় পণ্ডিত থাকে, তেনাদের মত আনাও। কিন্তু দূর দূর দেশ থেকেও নৈরাশ্যজনক সংবাদ আসতে লাগলো। শূন্দ্রের মন্দির প্রতিষ্ঠার অধিকার ভারতের ব্ৰাহ্মণ সমাজ মেনে নেবে না কিছুতেই। কলকাতার পণ্ডিতরা প্রকাশ্যে আন্দোলন শুরু করলো। তারা প্রচার করলো, রাসমণি দাসীর এই স্পর্ধা কিছুতেই সহ্য করা হবে না। এই ঘোর অনাচার মেনে নিলে হিন্দু সমাজে প্রবল বিকার দেখা দেবে। টাকা দিয়ে আর সব কেনা যায়, ধর্ম কেনা যায় না। রাসমণি দাসী আবার সেখানে অন্নভোগ দিতে চায়! শূদ্রের অন্ন দেওয়া হবে দেবতাকে! এর মধ্যেই কি কলির পাঁচ পা বেরুলো! ধর্মপ্ৰাণা রানী রাসমণি ইংরেজের বিরুদ্ধে কূট কৌশলে লড়েছেন, কিন্তু ব্ৰাহ্মণ তাঁর চোখে দেবতুল্য, সেই ব্ৰাহ্মণের বিরুদ্ধে তিনি লড়বেন কী ভাবে! তাঁর মন ভেঙে গেল। তিনি ভূমিশয্যায় শুয়ে অনবরত রোদন করেন আর মাঝে মাঝে কাতর ভাবে বলে ওঠেন, মা, মা, আমি শূদ্র বংশে জন্মে কী অপরাধ করেছি মা, যে তোমার সেবা করতে পারবো না? তুমি কি শূদ্রেরও মা নাও?

রানীর এক এক সময় মনে পড়ে যায় নবদ্বীপের কথা। কয়েক বছর আগে তিনি নবদ্বীপে গিয়েছিলেন তীর্থ দর্শনে। চন্দ্রগ্রহণের রাতে নবদ্বীপের গঙ্গাতীরে দাঁড়িয়ে তিনি কল্পতরু হয়েছিলেন। ব্ৰাহ্মণ পণ্ডিতদের তিনি রক্তবর্ণ পট্টবস্ত্র ও রৌপ্যমুদ্রা দান করেছেন। বিশিষ্ট সব শিরোমণি, তর্কসিদ্ধান্ত, ন্যায়রত্ন ও বিদ্যারত্নদের নিমন্ত্রণ করে তাঁদের প্রত্যেককে দিয়েছেন পঞ্চাশটি করে টাকা ও লাল রঙের বনাত। পণ্ডিতরা দু হাত তুলে তাঁকে আশীর্বাদ করেছিলেন। সেই কথা মনে পড়ায় রানী দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। ব্ৰাহ্মণরা তাঁর দান গ্ৰহণ করতে পারেন, সেজন্য খুশী হয়ে আশীর্বাদ করতে পারেন, অথচ তিনি মন্দির প্রতিষ্ঠা করলেই ব্ৰাহ্মণদের আপত্তি! এ কেমন কথা? এ যে স্বার্থপর, লোভীদের মতন মনোবৃত্তি! পর মুহূর্তেই রানী আবার তিরস্কার করেন নিজেকে। না, ব্ৰাহ্মণদের সম্পর্কে এমন চিন্তা করাও যে পাপ! রানীর মুশকিল। এই যে, তিনি ব্ৰাহ্মণদের শত্ৰু বলে মনে করতে পারছেন না। নইলে তো লাঠি কিংবা বুদ্ধির জোরেই তিনি কলকাতার ব্ৰাহ্মণ সমাজকে শায়েস্তা করতে পারতেন। টাকা দিয়ে কিছু ব্ৰাহ্মণকে কিনেও ফেলা যায়। কিন্তু পণ্ডিতসমাজ পুরো ব্যাপারটিকেই অশাস্ত্রীয় বলে ঘোষণা করলে জনসাধারণ তাঁর দিকে আসবে না। তাঁর চাই শাস্ত্রের সমর্থন। ব্ৰাহ্মণ ছাড়া পূজা হয় না। দেবেন্দ্র ঠাকুরের দল পূজা আচ্চা তুলে দিয়ে বেদ পাঠ করাচ্ছে। সে সবের বিরুদ্ধেই তো রানী রাসমণি পূজার মহিমা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চান। অথচ ব্ৰাহ্মণরাই তাঁকে প্রতিহত করছেন! মথুর মাঝে মাঝে সান্ত্বনা দিতে আসেন, কিন্তু রানী কিছুতেই প্ৰবোধ মানেন না। তিনি কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না। মা কালী নিজে এসে তাঁকে অন্নভোগ দিতে বলেছিলেন, আদেশ দিয়েছিলেন মন্দির প্রতিষ্ঠা করে দরিদ্রনারায়ণের সেবা করতে, তা আর ইহজীবনে সম্পন্ন হবে না!

একদিন মথুর হস্তদন্ত হয়ে এসে বললেন, মা, মা, একটি সুসংবাদ আছে! এবার বুঝি একটা উপায় হয়েচে। রানী বিশেষ গরজ করলেন না, অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, কী বলো? মথুর বললেন, মা, আপনি উঠে বসুন। অনেক কথা আচে। রাসমণি উঠে মথুরের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে ঠাণ্ডাভাবে জিজ্ঞেস করলেন, কী উপায় হয়েচে, আগে শুনি! মথুর বললেন, এক চতুষ্পাঠীর পণ্ডিত জানালেন যে, আপনি যদি মন্দিরের যাবতীয় সম্পত্তি কোনো ব্ৰাহ্মণকে আগে দান করেন। আর সেই ব্ৰাহ্মণ যদি মন্দিরে বিগ্ৰহ প্ৰতিষ্ঠা করে অন্নভোগের ব্যবস্থা করেন, তা হলে আর শাস্ত্রের কোনো বাধা থাকে না। রাসমণি বললেন, এ আর এমন কি কথা। আমার গুরুদেবের নামে ঐ সব সম্পত্তি ব্ৰহ্মোত্তর করে দেবো, আমি হবো তাঁর কর্মচারী। আমি তো নাম চাই না, মায়ের সেবার অধিকার পেলেই হলো। মথুর বললেন, বেশ, এই তো উত্তম বন্দোবস্ত। রানী জিজ্ঞেস করলেন, এই পণ্ডিতের বিধান সবাই মানবে? ইনি কে? কোথায় থাকেন? মথুরবাবু বললেন, কেন মানবে না? ইনিও যে-সে। পণ্ডিত নন। আমি নিজে এই মাত্র তেনার সঙ্গে কথাবার্তা কয়ে আসচি। তিনি আমায় শাস্ত্রের বচন উদ্ধার করে শোনালেন। রাসমণি আবার প্রশ্ন করলেন, পণ্ডিতটি কে? পণ্ডিতের নাম রামকুমার ভট্টাচার্য। হুগলীর কামারপুকুরে বাড়ি। কলকাতায় এসে ঝামাপুকুরে টোল খুলেছেন। তাঁর সঙ্গে থাকে তাঁর সতেরো বছর বয়সী এক ভাই, তার নাম গদাধর। ছেলেটি বেশ ভালো গান গায়।"

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেইল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।




বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষার জন্য গোপালকৃষ্ণ গোখলের নাম ভোলবার নয়। আজ গোপালকৃষ্ণ গোখলের ১০৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

গোপালকৃষ্ণ গোখলের কথা উঠলেই তাঁর এই উক্তিটি সব বাঙালির মনে পড়ে যায়। "What Bengal thinks today, India thinks tomorrow." মানে আজ বাংলা যা ভাবে, ভারত ভাবে তা আগামীকাল।  গোপালকৃষ্ণ গোখলে ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাংলার কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই বিবৃতিটি করেন।

বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষার জন্য গোপালকৃষ্ণ গোখলের নাম ভোলবার নয়। ইম্পেরিয়াল লেজিসলোটভ কাউন্সিলে কংগ্রেস নেতা গোপালকৃষ্ণ গোখলে ১৯১১ সালে “বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা বিল” উত্থাপন করে। বিলটি অনুমোদিত না হওয়ায় তখন তা কার্যকর হয়নি। শিক্ষার অধিকার নিয়ে গোপালকৃষ্ণ গোখলে সুপারিশ করে বলেন যে সারা দেশে প্রাথমিক শিক্ষাকে বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং জনগণকে শিক্ষিত করার দায়িত্ব সরকারের পালন করা উচিত। দীর্ঘ ১০০ বছর পর তার চিন্তাধারায় ভারতবর্ষে ২০১১ সালে "শিক্ষার অধিকার" আইন প্রণয়ন করা হয়। এই আইনে প্রত্যেক ভারতীয় শিশু, মেয়ে এবং ছেলের শিক্ষার আধিকার জন্মায়। এখন প্রশ্ন থেকে যায় আজ সরকার এই আইনে দেশের শিক্ষার মান কতটা বাড়িয়েছে। এই বিষয়ে আমরা পরে আলোচনা করবো

 ৯ই মে,১৮৬৬ সালে পুরনো বোম্বে প্রেসিডেন্সির রত্নগিরি জেলার কোটলুক নামে একটি গ্রামে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের আদিযুগের এক স্বনামধন্য রাজনৈতিক নেতা এবং এক বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক গোপালকৃষ্ণ গোখলের জন্ম। গোখলে ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের এক প্রবীণ নেতা এবং সার্ভেন্টস অফ ইন্ডিয়া সোসাইটিরপ্রতিষ্ঠাতা। সোসাইটি, কংগ্রেস ও অন্যান্য আইনসভা সংস্থার মাধ্যমে গোখলে শুধুমাত্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনতা থেকে ভারতের স্বাধীনতার দাবিকেই জোরদার করেননি, লিপ্ত থেকেছিলেন নানা প্রকার সমাজ সংস্কার মূলক কাজেও। ১৯১৫ সালের ১৯শে ফেব্রুয়ারি মাত্র ঊনপঞ্চাশ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান হয়। আজ গোপালকৃষ্ণ গোখলের ১০৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেইল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।




আজ আমরা শিবাজী জয়ন্তী উপলখ্যে শিবাজী মহারাজের কয়েকটি বিষয়ের উপর আলোচনা করবো যেটা আজকের দিনে খুবই প্রাসঙ্গিক।

১৬৩০ সালের ১৯শে ফেব্রুয়ারী  শিবাজী ভোঁসলে, যিনি ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ নামে পরিচিত, মহারাষ্ট্রের পুণের কাছে একটি পার্বত্য দুর্গে জন্মগ্রহণ করেন। আজ আমরা শিবাজী মহারাজের কয়েকটি বিষয়ের উপর আলোচনা করবো যেটা আজকের দিনে খুবই প্রাসঙ্গিক।

তিনি ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ শাসক। যে সেক্যুলারিজমের কথা আজকাল বারবার বলা হয়, শিবাজি মহারাজ প্রকৃত অর্থেই ছিলেন সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ শাসক। মুসলিমদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক রেখে চলতেন। তাঁর সেনার মধ্যে অনেকে ছিলেন মুসলিম। নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ তাঁর নাটক "ছত্রপতি শিবাজী" তে শিবাজী মহারাজের ধর্মনিরপেক্ষতার নির্দশন খুব সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সেই নাটকের কিছু অংশ আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম।

 "দৃত। একজন মুসলমান সৈনিক রাজদর্শন প্রার্থনা করে।

 শিবাজী। ল’য়ে এসো।

 সুরেরাও। বোধ হয়, বিজাপুরের দূত। ( মুসলমান সৈনিকের প্রবেশ )

শিবাজী। সৈনিক, তোমার মন্তব্য প্ৰকাশ করো।

মুসলমান। মহারাজ, আমরা সপ্তশত মুসলমান, বিজাপুরের সৈনিক দল পরিত্যাগ ক’রে মহারাজের অধীনে কৰ্ম্ম প্রার্থনা করি।

শিবাজী। এ প্রার্থনার কারণ কি?

মুসলমান। মহারাজ, যদিচ বিজাপুর মুসলমান রাজ্য, তথায় আমাদের দুরবস্থার পরিসীমা নাই। জাইগিরদারের পীড়ন, উচ্চ রাজকৰ্ম্মচারীর পীড়ন, সুলতানের পীড়ন, আমরা মুসলমান হ’য়েও আমাদের স্বাধীনতা নাই- অধীনের অধীন। কিন্তু মহারাজের রাজ্যে মুসলমানেরা মহারাষ্ট্রের ন্যায় স্বাধীন। আমরা স্বাধীনতা প্ৰয়াসে মহারাজের আশ্রয় গ্ৰহণ করেছি, আশ্রিতকে বর্জন করবেন না।

শিবাজী। এ সম্বন্ধে আপনাদের মতামত কি?

যেসজনীকঙ্ক। বিজাপুরের সুলতানের সহিত আমাদের শক্ৰতা। এঁরা মুসলমান, এঁদের উপর বিশ্বাস স্থাপন কতদূর সঙ্গত, তা মহারাজ বিচার করুন।

আবাজী। মহারাজ, আমার বিবেচনায় সঙ্গত।  আমাদের বিজাপুরের সহিত শক্রতা সত্য, কিন্তু সমস্ত মুসলমানেব সহিত শক্রতা নয়। বিজাপুবের অধীনে অনেক উচ্চপদস্থ হিন্দু কৰ্ম্মচারী আছেন, এমন কি মহারাজের পিতৃদেব কর্ণাটে তাঁর সেনাপতি। আমাদের সৈনিক-কাৰ্য্যে মুসলমান কি নিমিত্ত নিযুক্ত না হবে?

শিবাজী। আবাজী, তোমার প্রস্তাব অতি সঙ্গত। হে মুসলমান বীর, আজ হ'তে তোমরা আমার সৈন্যদলভুক্ত। প্রজা আমার পুত্রের ন্যায় প্ৰিয়। তোমাদের যখন আমার প্রজা হবার বাসনা, তোমরাও জনে জনে আমার পুত্রের ন্যায় আদরণীয়! তোমাদের বাহুবলে অনেক শত্রু পরাজিত হবে, এইরূপ আমার প্রত্যাশা। আমরা ব্ৰাহ্মণ, ক্ষত্ৰিয়,বৈশ্য ও শূদ্র চারি জাতির স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র ধারণ করেছি, তোমরাও সেই স্বাধীনতার অধিকারী। স্বাধীনতার জন্য অস্ত্ৰ ধারণ ক’রে, জন্মভূমির মুখোজ্জ্বল করবে সন্দেহ নাই। আমার সম্পূর্ণ ধারণা, প্ৰজাপীড়ক ওমরাও-চালিত বিজাপুর দরবার, তোমাদের স্বাধীনতা অপহরণ করেছে। আজ হ’তে তোমরা স্বাধীন মহারাষ্ট্র প্রদেশে স্বাধীন। সাধারণ শত্রু বিরুদ্ধে জাতিভেদ কখনই হবে না। জাতিভেদ শত্রুর বাহু বলবান করে। জাতি-বিরোধে শত্রুর পদানত হওয়া অনিবার্য্য। স্বাধীন মহারাষ্ট্র প্রদেশে ধর্ম প্রভেদ বা জাতি প্রভেদে পরস্পর বিরোধের সম্ভাবনা নাই। স্বাধীনতাপ্রিয় মনুষ্যমাত্ৰই একজাতীয়। স্বাধীনতায় তারা একসূত্রে আবদ্ধ। যে স্বাধীনচেতা, তার হৃদয়ে হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ নাই। ভেদবুদ্ধি কাপুরুষের হৃদয়ে, কাপুরুষে হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ করে। সে ভেদাভেদ স্বাধীন মহারাষ্ট্রে নাই, পরমানন্দে স্বাধীন মহারাষ্ট্রে স্বাধীনতা ভোগ করো। তোমার সহচরীগণকে ল’য়ে এসো, আমি জনে জনে পুত্ৰ সম্বোধনে সম্ভাষণ করবো।

মুসলমান। মহারাজ, কৃতদাস আপনার উদারতায় চির আবদ্ধ।"

শিবাজী মহারাজ মহিলাদের যথেষ্ট সম্মান করতেন। মহিলাদের হেনস্থা বা তাঁদের ওপর কোনওরকম হিংসার ঘটনা বরদাস্ত করতেন না। কঠোর হাতে তা দমনের পক্ষপাতী ছিলেন। অনেকের বিশ্বাস, মা জিজামাতার প্রতি তাঁর অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থেকেই তিনি মহিলাদের সম্মান করতে শিখেছিলেন। সেনাদের উদ্দেশে কঠোর নির্দেশ থাকত, একজন কোনও মহিলার ওপরও অত্যাচার করা চলবে না। কেউ নির্দেশ অমান্য করলে, কঠোর শাস্তি হত। নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ তাঁর নাটক "ছত্রপতি শিবাজী" তে শিবাজী মহারাজের মহিলাদের সম্মানের নির্দশন ফুটিয়ে তুলেছেন। সেই নাটকের শিবাজী মহারাজের কিছু কথা  আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম।

"যদি কীৰ্ত্তিমান হ’বার উচ্চ আশা করো, মাতৃজ্ঞানে পরস্ত্রীর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে। ব্যভিচারীর ধ্বংশ অনিবাৰ্য্য। পুরাণ পাঠে অবগত আছ,-সীতার অপমানে লঙ্কা ধ্বংশ হয়, দ্রৌপদীকে উরু প্রদর্শনে দুৰ্য্যোধনের - উরু ভঙ্গ হয়। সাবধান, ব্যভিচারীর উন্নতি নাই। বীরগণ, হৃদয়ে ধারণা রাখো, নারীর সহ আমাদের বিবাদ নাই, কিরূপে রমণীকে সন্মান করতে হয়, মহারাষ্ট্র তা প্রচার করবে। আমরা জন্মভূমির কাৰ্য্যে ব্ৰতী, মাতৃকাৰ্য্যে ব্ৰতী, নারীর অপমানে মাতার অপমান হবে।"

আজ আমরা নিজের প্রয়োজনেই ছত্রপতি শিবাজী মহারাজকে অনেক বেশি করে মনে রাখবো। ভারতের জন্য লড়াই করতে তাঁর সাম্রাজ্যের প্রত্যটি মানুষকে তিনি উদ্বুদ্ধ করেছেন। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর আমেরিকা ভ্রমণের সময় ছত্রপতি শিবাজী সম্বন্ধে বলেছিলেন, "শিবাজী এমন একজন মহান জাতীয় নায়ক যিনি মাতৃভূমি ভারতবর্ষকে পরাধীনতার শৃঙ্খলামুক্ত করেছিলেন"।

আজ ১৯শে ফেব্রুয়ারী ৩৮৯তম শিবাজী জয়ন্তী উপলখ্যে তাঁকে জানাই আমাদের শ্রদ্ধা।


প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেইল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

17 February 2019

জীবনানন্দ প্রথম জীবনে নিকট আত্মীয়া শোভনা দাসের প্রেমে পড়েছিলেন। শোভনা ছিলেন তরুণ জীবনানন্দের মুগ্ধ পাঠক আর শ্রোতা। ঘন্টার পর ঘন্টা কবি তার নিজের কবিতা পড়ে শোনাতেন শোভনাকে। নিতান্ত অখ্যাত এক তরুণ থেকে বাংলা সাহিত্যের শুদ্ধতম কবি হয়ে উঠার দিনগুলোতে শোভনা ছিলেন তার অনুপ্রেরণা। দীর্ঘদিন পর্যন্ত ভালোবেসে গেছেন তাকেই। হয়তো সমাজে লোকলজ্জার ভয়ে মুখ ফুটে কোনোদিন কিছু বলা হয়ে ওঠেনি। প্রেমিকা শোভনা জীবনানন্দের বিয়েতে এসে হাসিখুশী ভাবে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। এমন কষ্টের কথাগুলো হয়তো মুখ ফুটে কাউকে বলতেও পারেননি কবি। কিন্তু জীবনানন্দ দিনলিপির পাতায় পাতায় বন্দী করে রেখে গেছেন সেই অস্ফুট দুঃখগুলোর কথা।

১৯২৭ তাঁর প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’ শোভনাকেই উৎসর্গ করেছিলেন তিনি। কোনো কোনো জীবনানন্দ গবেষকের মতে, এই শোভনাই ছিলেন বনলতা সেন! ১৯৩৫ সালে বুদ্ধদেব বসুর সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যাতেই প্রকাশিত হয় কাব্য গ্রন্থ “বনলতা সেন”’।  ১৯৫৩ সালে তাঁর এই বিখ্যাত  কাব্য গ্রন্থটি নিখিল বঙ্গ রবীন্দ্র সাহিত্য সম্মেলনে  পুরস্কৃত হন।

১৮৯৯ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি, অবিভক্ত বাংলার বরিশালে সত্যানন্দ দাশ আর কুসুমকুমারী দাশের কোল আলোকিত করে পৃথিবীর মুখ দেখেন ছোট্ট মিলু। তাঁর ছোটবেলা কাটে বরিশাল শহরে। ছোটবেলা থেকেই লাজুক ও মুখচোরা স্বভাবের ছিলেন জীবনানন্দ দাশ। ভোরে উঠেই বাবার কণ্ঠে উপনিষদের শ্লোকের আবৃত্তি ও মায়ের কাছ থেকে ধর্মীয় গান শুনতেন মিলু। মায়ের কন্ঠে কবিতার আবৃত্তি শুনতে শুনতে শিশু মিলুর মধ্যেও ছন্দের প্রতি ভালোবাসা জন্মে যায়।

বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ থেকে মেট্রিকুলেশন আর ইন্টারমিডিয়েটে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন তরুণ জীবনানন্দ। ১৯১৯ সালে ইংরেজীতে অনার্স শেষ করেন তিনি। কলকাতায় পা দিয়ে জীবনানন্দ একটু একটু করে কবি হয়ে উঠতে থাকেন। ১৯২৫ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মৃত্যুবরণ করলে তার স্মরণে জীবনানন্দ লেখেন ‘দেশবন্ধুর প্রয়াণে’ নামের একটি কবিতা। বঙ্গবাণী পত্রিকায় প্রকাশিত সেই কবিতাটি পড়ে কবি কালিদাস রায় মন্তব্য করেছিলেন-
“এ কবিতাটি নিশ্চয়ই কোনো প্রতিষ্ঠিত কবির ছদ্মনামে রচনা”। বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রযুগ চলছে তখন। ইংরেজী সাহিত্যে পড়া এক তরুণ লেখা শুরু করলো বাংলা কবিতা, অসাধারণ সব রূপকের গাঁথুনি দিয়ে তৈরি সব কবিতা। ত্রিশ দশকে বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দেব, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী আর জীবনানন্দ এই পঞ্চপান্ডব মিলে বাংলা কবিতায় আধুনিকত্ব নিয়ে এসেছিলেন।

১৯২৯ সালের বিশ্ব মন্দার সময় কলকাতা সহ পুরো বাংলা জুড়ে যেন এই মহামন্দার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে। বাংলা জুড়ে শুরু হয় কর্মী ছাটাই। ইংরেজি সাহিত্যের তরুণ গ্র্যাজুয়েট জীবনানন্দেরও চাকরি নেই। হাজারো মানুষের বেদনার ছন্দগুলো বাধা পড়তে থাকে ‘ধূসর পান্ডুলিপি’র পাতায় পাতায়। ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন - ‘আমি পাগলের মতন জীবনানন্দ দাশের ভক্ত হয়ে গেলাম। ভক্ত কিংবা ক্রীতদাসও বলা যেতে পারে। প্রেসিডেন্সি কলেজের সামনের রেলিং-এর পুরনো বইয়ের দোকান থেকে একদিন মাত্র চার আনায় এক কপি ধূসর পাণ্ডুলিপি কিনে মনে হয়েছিল যেন হাতে স্বর্গ পেয়েছি।’ জীবনানন্দের  “শ্রেষ্ঠ কবিতা” গ্রন্থটি ১৯৫৪ সালে ভারত সরকারের সাহিত্য আকাডেমী পুরস্কার লাভ করে।

জীবনের শেষ কয়েক বছর জীবনানন্দ কাটিয়েছেন চরম অর্থকষ্টে। একটার পর একটা চাকরি হারিয়েছেন। কলকাতার  ল্যান্সডাউন স্ট্রিটের একটি ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। বাড়ি ভাড়া দেওয়ার মতো পয়সাটি পকেটে ছিলো না। এক নর্তকীর কাছে ভাড়াবাড়ির একটি ঘর সাবলেট দিয়েছিলেন। কলকাতায় বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে টিউশনি করেছেন, বীমা কোম্পানির দালালি পর্যন্ত করেছেন। টাকা ধার করেছেন আশপাশের সবার কাছ থেকে। ১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর কলকাতায় ট্রাম দুর্ঘটনায় কবি পৃথিবী থেকে অবসর নেন। মৃত্যুর তিন বছর পর কলকাতার  সিগনেট প্রেস থেকে তাঁর ৬১টি কবিতা নিয়ে ‘রূপসী বাংলা’ প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে জীবনানন্দের কবিতার ভূমিকা ঐতিহাসিক। ষাটের দশকে বাঙালির জাতিসত্তা বিকাশের আন্দোলনে এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে সংগ্রামী বাঙালি জনতাকে তাঁর রূপসী বাংলা তীব্রভাবে অনুপ্রাণিত করে।

জীবনানন্দ দাশের পারিবারিক বাড়িটি যেটি বরিশালের বগুড়া রোডে ‘সর্বানন্দ ভবন’ নামে পরিচিত ছিল কবির সম্মানে একে ‘ধানসিঁড়ি’ নামকরণ করা হয়। বাংলাদেশ সরকার বাড়ির প্রবেশ মুখে ‘কবি জীবনানন্দ দাশ স্মৃতি মিলনায়তন ও পাঠাগার’ স্থাপন করেছে।

আজ কবি জীবনানন্দ দাশের ১২০তম জন্মবার্ষিকীতে জানাই আমাদের শ্রদ্ধা।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেইল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

16 February 2019

আজ ১৬ই ফেব্রুয়ারী, মেঘনাদ সাহার ৬৩ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

ভারতীয় বিজ্ঞান জগতের অন্যতম স্মরণীয় নাম মেঘনাদ সাহা। যিনি এক দিকে যেমন ছিলেন  শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী তেমনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে ছিলেন। ভারতের বিজ্ঞান চর্চার সঙ্গে বিশ্বের পরিচয় ঘটিয়ে দেবার ব্যাপারে এবং ভারতের বিজ্ঞান গবেষণাকে বিশ্বমানে উন্নীত করার ব্যাপারে বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার অবদান অনস্বীকার্য। গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ পাবার পাশাপাশি তিনি চারবার নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছিলেন। নিরলস চেষ্টা ও পরিশ্রমে গড়ে তুলেছেন ইন্সটিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্স।

ঢাকা জেলার তালেবাদ পরগনার অন্তর্গত সিওরাতলী গ্রামে ১৮৯৩ সালের ৬ অক্টোবর মেঘনাদ সাহা জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় তিনি কঠোর দারিদ্রের মধ্য দিয়ে প্রতিপালিত হন। গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা শেষে মেঘনাদ নিকটবর্তী শিমুলিয়ায় যান এবং সেখানে তিনি কাশিমপুর জমিদারের পারিবারিক চিকিৎসক অনন্ত কুমার দাসের আনুকূল্যে প্রতিপালিত হতে থাকেন। ১৯০৫ সালে তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। এ সময় স্বদেশী আন্দোলনে জড়িত হওয়ার কারণে তাঁকে স্কুল ছাড়তে বাধ্য করা হয়। পরে মেঘনাদ সাহা কিশোরীলাল জুবিলী স্কুলে ভর্তি হন। ১৯১১ সালে ঢাকা কলেজ থেকে তিনি আই.এসসি পাস করেন এবং প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য কলকাতা যান। সেখানে তিনি স্যার  জগদীশচন্দ্র বসু, স্যার আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, অধ্যাপক ডি.এন মলি­ক, অধ্যাপক সি.ই কুলিস প্রমুখ শিক্ষকের সান্নিধ্য লাভ করেন। যদিও মেঘনাদ সাহা গণিত শাস্ত্রের ছাত্র ছিলেন, তথাপি তিনি স্যার প্রফুল্ল চন্দ্রের দ্বারা প্রভাবিত হন। অল্পদিনেই মেঘনাদ সাহা তাঁর প্রিয় ছাত্রদের একজন ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে ওঠেন।

তাঁর রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার অনুভূতি তাঁকে ১৯৫১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করতে উদ্বুদ্ধ করে। একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেঘনাদ সাহা তাঁর নিকটতম কংগ্রেস প্রার্থীকে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করে ভারতের লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় সংশি­ষ্ট ছিলেন। শরণার্থী পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করার লক্ষ্যে ড. সাহা বেঙ্গল রিলিফ কমিটি গঠন করেছিলেন।

বিস্তৃত জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ মেঘনাদ সাহাকে পঞ্জিকা সংস্কার প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত করেছিল। জনগণ এবং শিক্ষার প্রতি সতত নিবেদিত প্রফেসর মেঘনাদ সাহা ছিলেন একজন অক্লান্ত কর্মী। ১৯৫৪-র পর থেকে পরিশ্রমী এই জ্ঞানকর্মীর স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করে এবং ১৯৫৬ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি এক বৈঠকে যোগদানের উদ্দেশ্যে দিল্লির পরিকল্পনা কমিশন দপ্তরে যাওয়ার পথে মেঘনাদ সাহা হৃদরোগ আক্রান্তে মারা যান।


প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com  ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

14 February 2019

গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই আমাদের শ্রদ্ধা।

বাংলার সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলকে উজ্জীবিত করতে জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ীর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। বাংলার চিত্রকলাকে বিশ্বের দরবারে অন্য মাত্রায় প্রতিষ্ঠা করার উদ্দোগে রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ ও গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান অনস্বীকার্য।  গগনেদ্রনাথের ছবির ভেতর দিয়ে বাংলার চিত্রকলা চর্চা সম্পূর্ণ একটা নতুন দিশা পেয়েছিল। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ীতে যেভাবে আলোছায়া স্থাপত্যের নির্মানগত কারনে বাড়ীর দেওয়াল, বারান্দায় বা সিঁড়ির খাঁজে পরতো এবং আলোছায়ার টুকরোতে স্পেসকে ভাগ করে দিত গগনেন্দ্রনাথ তাকেই ছবিতে ও আলোকচিত্রে তুলে এনেছিলেন। এই ছবির চরিত্র কিছুটা কিউবিস্ট চিত্রকরদের সাথে মেলে বলেই স্টেলা ক্রামরিশ তাঁকে "অ্যান ইন্ডিয়ান কিউবিস্ট" বলে আখ্যা দিয়েছেন।

গগনেন্দ্রনাথ প্রথম হরিনারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে পাশ্চাত্য জলরঙে ছবি আঁকা শিখেন। পরে জাপানি শিল্পী ইওকোহামা (ওকাকুরু) এবং টাইকান (তাইকোয়ান)-এর দ্বারা তিনি প্রভাবান্বিত হন। রবীন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতির জন্য কয়েকটি চিত্র তিনি অঙ্কন করেন যেগুলিতে জাপানি প্রভাব স্পষ্ট।

তাঁর ব্যঙ্গচিত্রে বাঙালীয়ানার ছাপ দেখা যায়। ১৯১১ সালে মোহনবাগান ইংরেজ দলকে হারিয়ে আই এফ এ শীল্ড জয় করে। তখন বাঙালী আর ফুটবল মিলে মিশে এক হয়ে যায়। পাড়ায় পাড়ায় তখন ফুটবল ক্লাব তৈরী করার হিড়িক পড়ে যায়। এখানে ঠাকুরবাড়ী পিছিয়ে থাকবে কেন। গগনেন্দ্রনাথ জুড়িগাড়ী হাঁকয়ে মাঠে গেলেন মোহনবাগানের খেলা দেখতে। তিনি মাঠে পৌঁছালে শুরু হয় বৃষ্টি। সাথে ছাতা না থাকায় তিনি গাড়ী থেকে নেমে আর খেলা দেখলেন না। বাড়ী ফিরে খেলার মাঠের ছবি আঁকলেন। সেখানে শুধু ছাতা আর ছাতা। নেই কোথাও বারপোস্ট, নেই বল।

তিনি পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। সে সময় শুভ কাজে সেলাই করা পোষাক পড়নো হতো  না। গগনেন্দ্রনাথ মেয়েকে শাড়ি ও ব্লাউজ পড়িয়ে বিয়ের আসরে নিয়ে আসেন। সেলাই করা পোশাক দেখে পাত্রের বাবা আপত্তি জানায়। কিন্তু গগনেন্দ্রনাথ প্রমাণ  করিয়ে দেখান যে সেই বস্ত্রে কোনো সেলাই নেই। ব্লাউজ নিপুন ভাবে আঠা দিয়ে জোড়া দেওয়া আছে। রবীন্দ্রনাথ পরিণত বয়সে তিব্বতি বকু ধরনের যে জোববা পরতেন তার নকশা সর্বপ্রথম গগনেন্দ্রই করেন।

১৮৬৭ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র। সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ভাইপো। তিনি ছিলেন একজন বঙ্গীয় ঘরানারচিত্র ও কার্টুনশিল্পী।

মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে পিতৃহারা হওয়ার পর তাঁর স্কুলের পড়াশুনা বন্ধ হয়। তার বদলে শুরু হয় জমিদারির কাজ এবং সে সঙ্গে পরিবারের প্রধান হিসেবে সামাজিক দায়-দায়িত্ব পালন। কিন্তু এতদ্সত্ত্বেও ভারতীয় ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে তাঁর ছিল প্রবল আগ্রহ। স্কুলের বন্ধন ছিন্ন হওয়াতেই তিনি স্ব-শিক্ষার সুযোগ পান, যেমনটি পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

অভিনয়কলাতেও গগনেন্দ্রনাথের দক্ষতা ছিল। তিনি জোড়াসাঁকোর বিচিত্রা হলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ফাল্গুনী  নাটক মঞ্চস্থ করেন এবং স্বয়ং রাজার ভূমিকায় অভিনয় করেন। অ্যানী বেস্যান্ট তাঁর অভিনয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

গগনেন্দ্রনাথ ১৯২৬ সালে শিশু সাহিত্য ভোঁদড় বাহাদুর রচনা করেন। তাঁর মৃত্যু হয় ১৪ই ফেব্রুয়ারী,১৯৩৮ সালে। তার ৩০ বছর পর ভোঁদড় বাহাদুর প্রকাশিত হয়। আজ ওঁনার ৮১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই আমাদের শ্রদ্ধা।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com -এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

12 February 2019

চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ড্রুজ ১২ই ফেব্রুয়ারী ১৮৭১ সালে ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। আজ চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ড্রুজের ১৪৮ তম জন্মবার্ষিকী।

চার্লস ফ্রিয়ার এন্ড্রুজ যিনি দীনবন্ধু এন্ড্রুজ নামে বিখ্যাত, ভারতের মাটিতে পা দিয়েছিলেন ১৯০৪ সালে। ভারতে এসে দেখলেন ইংরেজ শাসিত নিস্পেশিত দরিদ্র ভারতবাসীকে। ১৩ই এপ্রিল, ১৯১৯ সালে অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে অহিংস এক সমাবেশের ওপর চলল গুলি। প্রাণ গেল হাজারেরও বেশি নর-নারীর। নারকীয় এই গণহত্যা ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়। সেই সময় এন্ড্রুজ সাহেব ছিলেন শান্তিনিকেতনে। নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াবার জন্য তিনি পাঞ্জাব যাবার মনস্থির করেন।
কিন্তু ইংরেজ সরকার মানব দরদী ইংরেজ সাহেব এন্ড্রুজকে পাঞ্জাবে যেতে দিল না। এন্ড্রুজ যখন অমৃতসর রেল স্টেশনে পৌঁছান তখন তাকে আটক করে দিল্লিতে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে পাঞ্জাব থেকে সামরিক শাসন তুলে নেবার পর তিনি সেখানে যান। ছুটে বাড়ালেন পাঞ্জাবের এক প্রান্ত থেকে আন্য প্রান্ত। শুনলেন নিপীড়িত মানুষের কথা। তিনি চেয়েছিলেন মানুষের সেবা করেই ইংরেজদের কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করতে। তিনি সকল ভারতবাসীর কাছে ক্ষমা ভিক্ষা চেয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১২ সালের জুন মাসে ইংল্যান্ডে যান। সেখানে  শিল্পী রোটেনস্টাইনের গৃহেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয় হয় ইংল্যান্ডের চার্লস ফ্রিয়ার এন্ড্রুজ পরবর্তীকালে যিনি রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজির অন্যতম ভক্ত হয়ে ওঠেন। এন্ড্রুজের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল এবং তিনি শান্তিনিকেতনে অনেক সময় অতিবাহিত করেছিলেন।

ইংল্যান্ডের চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ড্রুস একজন খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক, শিক্ষাবিদ ও সমাজ সংস্কারক। তিনি মহাত্মা গান্ধীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠেন এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন। ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে ও সেন্ট স্টিফেনস কলেজে তাঁর অবদানের জন্য তাঁকে দীনবন্ধু বা "দ্য ফ্রেন্ড অফ দ্য পুওর" নামে ডাকা হয়।

চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ড্রুজ ১২ই ফেব্রুয়ারী ১৮৭১ সালে ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন বার্মিংহামের ক্যাথলিক অ্যাপোস্টোলিক চার্চের "এঞ্জেল" (বিশপ)।

১৯০৪ সালে সালে তিনি দিল্লীতে সেন্ট স্টিফেনস কলেজে দর্শন পড়ানোর সময় যেখানে তাঁর অনেক ভারতীয় সহকর্মী ও শিক্ষার্থীর সাথে পরিচিতি ঘটে। তিনি শীঘ্রই  ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের অন্দোলনে  জড়িত পড়েন এবং ১৯১৩ সালে তিনি মাদ্রাজের তুলো শ্রমিকদের ধর্মঘটের সমাধান করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন  করেছিলেন।

কলকাতা সফরকালে ৫ই এপ্রিল ১৯৪০ সালে চার্লি অ্যান্ড্রুজ মারা যান এবং কলকাতার লোয়ার সার্কুলার রোড  'খ্রিস্টান বরিয়াল গ্রাউন্ডে' কবরস্ত করা হয়।

আজ চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ড্রুজের ১৪৮ তম জন্মবার্ষিকী।
আমরা ভুলব না এই এন্ড্রুজ সাহেবের কথা, ভুলব না তার মানব প্রেমের কথা। হে ভারত পথিক এন্ড্রুজ! দীনবন্ধু এন্ড্রুজ! ভারতবন্ধু এন্ড্রুজ! সকল ভারতবাসীর শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন গ্রহণ করো!

ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন।  জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।

11 February 2019

কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত প্রখ্যাত বাঙালি কবি ও ছড়াকার। কবিতার ভূবনে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

আজ ১১ই ফেব্রুয়ারি বাংলা কবিতার ছন্দের জাদুকর কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের  ১৩৭তম জন্মবার্ষিকী।

সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত প্রখ্যাত বাঙালি কবি ও ছড়াকার। কবিতার ভূবনে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বাংলা সাহিত্যে কবিতায় ছন্দের কারুকাজ শব্দ ও ভাষা যথোপযুক্ত ব্যবহারের কৃতিত্বের জন্য তাঁকে 'ছন্দের যাদুকর' নামে আখ্যায়িত করা হয়।

ছোটবেলায় পড়া ছড়া-কবিতাগুলির মধ্যে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ইলশে গুঁড়ি ইলশে গুঁড়ি, দূরের পাল্লার ছিপখান তিন-দাঁড় – তিনজন মাল্লা, পালকির গান পাল্কী চলে!পাল্কী চলে! ইত্যাদি আজ ও আমাদের স্মৃতি থেকে মুছে যাইনি। তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু, ছন্দ, নির্মাণ কৌশল এবং শব্দ ও ভাষার কারুকার্যময়তায় উজ্জ্বল তাঁর প্রতিটি রচনা। নানা ধরণের ছন্দ উদ্ভাবনে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। মেথরদের মতো অস্পৃশ্য ও অবহেলিত সাধারণ মানুষ নিয়েও তিনি কবিতা লিখেছেন। এই কবির কবিতা আজও পাঠকদের অনুরনিত করে। সবিতা, সন্ধিক্ষণ, বেনু ও বীনা, কুহু ও কেকা ইত্যাদি তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ।

কাব্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করার আগে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত পিতার ব্যবসায় যোগ দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ভারতী পত্রিকাগোষ্ঠীর অন্যতম কবি। প্রথম জীবনে তিনি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, অক্ষয় কুমার বড়াল প্রমুখের দ্বারা প্রভাবিত হন। বাংলা শব্দের সঙ্গে আরবি-ফার্সি শব্দের সমন্বিত ব্যবহার দ্বারা বাংলা কাব্যভাষার শক্তি বৃদ্ধির প্রাথমিক কৃতিত্ব তারই। অনুবাদের মাধ্যমে তিনি বিশ্বের কাব্যসাহিত্যের সঙ্গে বাংলার যোগাযোগ ঘটান। নবকুমার, কবিরত্ন, অশীতিপর শর্মা, ত্রিবিক্রম বর্মণ, কলমগীর প্রভৃতি ছদ্মনামে তিনি কবিতা লিখতেন। আরবি-ফারসি, চীনা, জাপানি, ইংরেজি এবং ফরাসি ভাষার বহু কবিতা অনুবাদ করে বাংলাসাহিত্যের বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধি সাধন করেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। এই কবিতাগুলি রয়েছে তাঁর ‘তীর্থসলিল’, ‘তীর্থরেণু’ ও ‘মণিমঞ্জুষা’ নামক তিনটি অনূদিত কবিতার সংকলনে৷

সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ১৮৮২ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি কলকাতার কাছে নিমতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতামহ অক্ষয়কুমার দত্ত ছিলেন। তার পৈতৃক নিবাস বর্ধমানের চুপী গ্রামে। পিতা রজনীনাথ দত্ত ছিলেন কলকাতার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং পিতামহ অক্ষয় কুমার দত্ত ছিলেন তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদক। সত্যেন্দ্রনাথ কলকাতার সেন্ট্রাল কলেজিয়েট স্কুল থেকে এন্ট্রান্স  এবং জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইনস্টিটিউশন (বর্তমান স্কটিশ চার্চ কলেজ) থেকে এফএ।

বাংলা সাহিত্যের এই খ্যাতিমান কবি মাত্র ৪০ বছর বয়সে ১৯২২ সালের ২৫ জুন মৃত্যুবরণ করেন। আজ ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ তাঁর ১৩৭তম জন্মবার্ষিকীতে জানাই আমাদের গভীর শ্রদ্ধা।

ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।

আজ ১১ই ফেব্রুয়ারি, বাংলা সাহিত্যের রম্য রচনায় প্রবাদপুরুষ সৈয়দ মুজতবা আলীর ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম।

সৈয়দ মুজতবা আলী রম্য রচনায় বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ। মানুষকে হাসানোর কাজটি অতি সহজে করেছেন সৈয়দ মুজতবা আলী। যে কোনো বক্তব্যকে নিয়ে তিনি হাস্যরস করেছেন। রম্য রচনার রস সহজে যাতে পাঠক আস্বাদন করে, একটু হলেও হাসির খোরাক জোগায় সে চেষ্টাই তিনি জীবনভর করে গেছেন।

তাঁর ‘রসগোল্লা’ রম্য রচনাটি পড়লে হেসে লুটোপাটি খেতে হয়। গল্পের মুল চরিত্র ঝান্ডুদা বন্ধুর মেয়ের জন্য এক টিন ভ্যাকুম প্যাকেটজাত মিষ্টি নিয়ে যাচ্ছে। ইতালির কাস্টমস অফিসারের সাথে তা নিয়ে বাকবিতন্ডা হয়। কাস্টমস কর্মকর্তাদের সে কিছুতেই বুঝিয়ে উঠতে পারছেনা যে  প্যাকেট খুললেই মিষ্টি নষ্ট হয়ে যাবে। সেখানে নানা হাস্যরসাত্মক ঘটানোর পরেও ঝান্ডুদাকে মিস্টির প্যাকেট খুলতে হয়। আর প্যাকেট খোলার পরে ঘটে সেই আসল ঘটনা। কিছু বুজে উঠার আগেই ঝান্ডুদা ক্ষেপে রসগোল্লা নিয়ে অফিসারের নাকে-মুখে লেপে দেয়। আর সকলকে রসগোল্লা বিলিয়ে দেয়। সকলেই রসগোল্লার রসে মজে আরোও রসগোল্লা খেতে চায় কিন্তু ততোক্ষণে সব শেষ। রসগোল্লার রসে মজে ঝান্ডুদাকে ক্ষমা করে দেন কর্তৃপক্ষ আর সেই যাত্রায় ঝান্ডুদা বেঁচে যায়।

স্ত্রীর দ্বারা স্বামী নির্যাতনের কাহিনীর সাথে  রঙ চড়িয়ে সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছেন ‘দাম্পত্য জীবন’। যেখানে স্বামীরা স্ত্রীর নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে মিছিল-মিটিং করে। এমন একটি সভা চলা কালে শোনা গেল স্ত্রীরা ঝাঁটা নিয়ে সভা পন্ড করতে আসছে। এই খবর রটার সাথে সাথে সভাস্থল খালি হয়ে গেল। একমাত্র সভাপতি সেখান থেকে নড়ল না। পাঠকের মনে হতে পারে তাহলে সভাপতিই একমাত্র বীরপুরুষ যে কিনা সভা ছেড়ে পালাইনি। আসলে ব্যপারটা ছিল অন্যরকম। দারোয়ান গিয়ে দেখল সভাপতি মারা গেছে। সভাপতির চিরতরে পালানোটা ট্রাজেডি কিন্তু এখানেও পাঠকের মনের কোণে অদ্ভুত হাসির সুড়সুড়ি দেয়।

শান্তিনিকেতন ও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘রবি-পুরাণ’। শান্তিনিকেতনে এক মারাঠি ছেলে রবীন্দ্রনাথকে সন্ন্যাসী ভেবে তাঁকে একটি আধুলি দিয়েছিলো। রবিঠাকুর সে নৈবেদ্য গ্রহণ করেছিল। এখানে মুজতবা আলী আরো যোগ করেছেন রবিঠাকুরের কাছ থেকে একবার একটা লোক দশ টাকা ধার নিয়ে বলেছিল আমি চির ঋণী হয়ে থাকলাম। রবিঠাকুর তার নাতি দিনেন্দ্রনাথকে বলেছিল লোকটার শত দোষ থাকলেও একটা গুণ ছিল। লোকটা সত্যভাষী। এই কাহিনী আমাদের রসের সন্ধান দেয়।

শান্তিনিকেতনে পড়ার সময় সেখানের বিশ্বভারতী নামে হাতে লেখা ম্যাগাজিনে মুজতবা আলী লিখতেন। পরবর্তীতে তিনি ‘সত্যপীর’, ‘ওমর খৈয়াম’, ‘টেকচাঁদ’, ‘প্রিয়দর্শী’ প্রভৃতি ছদ্মনামে বিভিন্ন পত্রিকায়, যেমন– দেশ, আনন্দবাজার, বসুমতী, সত্যযুগ, মোহাম্মদী প্রভৃতিতে কলাম লিখেন। তাঁর বহু দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছেন ভ্রমণকাহিনি। এছাড়াও লিখেছেন ছোটগল্প, উপন্যাস, রম্যরচনা। বিবিধ ভাষা থেকে শ্লোক ও রূপকের যথার্থ ব্যবহার, হাস্যরস সৃষ্টিতে পারদর্শিতা এবং এর মধ্য দিয়ে গভীর জীবনবোধ ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা তাঁকে বাংলা সাহিত্যে এক বিশেষ মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য গ্ৰন্থ “দেশে বিদেশে’, ‘শব্নম্’, ‘ময়ূরকণ্ঠী’, ‘হিটলার’, ‘চাচা কাহিনী’, ‘ধূপছায়া’, ‘জলে ডাঙায়’, ‘মুসাফির’, ‘পঞ্চতন্ত্র’, ‘অবিশ্বাস্য’, ‘ভবঘুরে ও অন্যান্য’, ‘টুনিমেম’, ইত্যাদি।

সৈয়দ মুজতবা আলী জন্মগ্রহণ করেন ১৯০৪ সালের ১৩ই সেপ্টেম্বর সিলেটের করিমগঞ্জে। তাঁর পিতা সৈয়দ সিকান্দার আলী। তাঁর পৈতৃক ভিটা হবিগঞ্জে।
পিতার বদলীর চাকরি হওয়ায় মুজতবা আলীর প্রাথমিক শিক্ষাজীবন কাটে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ১৯২১ সালে তিনি শান্তিনিকেতনে ভর্তি হন। তিনি ছিলেন বিশ্বভারতীর প্রথম দিকের ছাত্র। এখানে তিনি সংস্কৃত, ইংরেজি, আরবী, ফার্সি, হিন্দি, গুজরাটি, ফরাসি, জার্মান ও ইটালীয় ভাষাশিক্ষা লাভ করেন।

১৯৪৯-এ দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক নরসিংহদাস সাহিত্য পুরস্কারে সম্মানিত হন। ১৯৬১ সালে  তাঁকে আনন্দ পুরস্কার প্রদান করা হয়। বাংলাদেশে ফেরেন ১৯৭২-এ। সাহিত্য ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিশেবে পান একুশে পদক ২০০৫ (মরণোত্তর)।

সৈয়দ মুজতবা আলীর বাংলাদেশেই ১১ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৪ সালে জীবনাবসান হয়। আজ ওঁনার ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম।

ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন।  জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।


10 February 2019

আজ উনিশ শতকে বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কবি নবীনচন্দ্র সেনের ১৭২তম জন্মবার্ষিকী। ওঁনার প্রতি রইল আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

আজ ১০ই ফেব্রুয়ারি উনিশ শতকে বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কবি নবীনচন্দ্র সেনের ১৭২তম জন্মবার্ষিকী। ওঁনার প্রতি রইল আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

উনিশ শতকে বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কবি নবীনচন্দ্র সেন দেশপ্রেমিক কবি হিসেবেই খ্যাত ছিলেন। ১৮৭৫ সালে ‘পলাশীর যুদ্ধ’ মহাকাব্য প্রকাশিত হলে কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। কবি নবীনচন্দ্র সেকালে বাংলাসাহিত্যে সর্বাধিক পরিচিত ও জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও তাঁকে আমরা এখন প্রায় ভুলতে বসেছি। ‘পলাশীর যুদ্ধ’ প্রকাশের সাথে সাথে এই কাব্যগ্রন্থ নিয়ে ‘বঙ্গদর্শন’, ‘বান্ধব’ ও ‘আর্যদর্শন’ এই তিন সাময়িক পত্রিকায় উল্লেখযোগ্য আলোচনা হয়। ছাত্রজীবন থেকেই নবীনচন্দ্র কবিতা রচনা শুরু করেন। যখন তিনি এফ এ শ্রেণীর ছাত্র প্যারীচরণ সরকার সম্পাদিত এডুকেশন গেজেটে তাঁর প্রথম কবিতা 'কোন এক বিধবা কামিনীর প্রতি’ প্রকাশিত হয়।

রবীন্দ্র সমসাময়িক কবি হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তাঁর বিশেষ হৃদ্যতা ছিল। চট্টগ্রামে কবি নবীনচন্দ্র দাসের সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিচয় ঘটে। নবীনচন্দ্র দাস সেই সময় কালিদাসের ‘রঘুবংশের’ বাংলা অনুবাদের প্রথম খন্ড প্রকাশ করেন। রবীন্দ্রনাথ  ঠাকুর এই অনুবাদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবি নবীনচন্দ্র দাসকে এক দীর্ঘ প্রশংসাপত্র পাঠান। তাতে বিশ্বকবি লেখেন, “আমি আপনার লেখা রঘুবংশের বাংলা অনুবাদ পড়ে বেশ পুলকিত হয়েছি। সংস্কৃত ভাষার কবিতা অনুবাদে অনেক সময়ই কবিতার প্রাঞ্জলতা রক্ষা করা বেশ দুরূহ হয়ে পড়ে। ফলে কবিতার প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে যায়। কিন্তু আপনার অনুবাদে মূল কবিতার ভাবার্থ যথাসম্ভব রক্ষা করে তার ভাবরস ও সৌন্দর্যের এতোটুকু বিচ্যুতি ঘটতে দেননি। ” রঘুবংশের দ্বিতীয় খন্ডের অনুবাদ পড়েও কবিগুরু সমান মুগ্ধ হয়েছিলেন। ১৮৯৫ সালে সাধনা পত্রিকায় এই বইয়ের প্রশংসা করে রবীন্দ্রনাথ একটি দীর্ঘ সাহিত্য সমালোচনা লেখেন।

এক সময় তৎকালিন মাদারীপুর মহকুমার বিখ্যাত বাংলা কবি নবীনচন্দ্র সেন মহকুমা প্রশাসক ছিলেন। নবীনচন্দ্র সেনের আমন্ত্রণে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এক সময় মাদারীপুর সফরে এসেছিলেন এবং মাদারীপুর হতে নবীনচন্দ্র সেনের সাথে বর্তমান ডামুড্যা সফরেও আসেন। ডামুড্যার পূর্ব পাশের নদী দেখে বলেছিলেন এই নদী দামোদর নদীর মতো। এই নদী সাঁতার দিয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মায়ের সাথে দেখা করতে যেতেন। এই কথা শুনে মহকুমা প্রশাসক নবীনচন্দ্র সেন বিদ্যাসাগরের সম্মানে এই এলাকার নাম রাখেন দামোদর। ক্রমে ক্রমে এই এলাকা ডামুড্যা হিসাবে প্রসিদ্ধি লাভ করে। পিতার মৃত্যুর পর কবি আর্থিক সমস্যায় পড়েন। সে সময় দয়ার সাগর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নবীনচন্দ্র সেনকে আর্থিক সাহায্য করেন।


কবি নবীনচন্দ্র সেন ১৮৪৭ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার জমিদার রায় পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তবে তিনি পিতৃপুরুষের ‘রায়’ উপাধি বাদ দিয়ে ‘সেন’ উপাধি ব্যবহার করতেন। তার পিতা-গোপী মোহন রায় ছিলেন পেশায় জজ আদালতের পেশকার এবং মাতা রাজ রাজেশ্বরী দেবী।নবীনচন্দ্রের কবিতানুরাগী পিতার ফরাসি ভাষায় বিশেষ পাণ্ডিত্য ছিল।

নবীনচন্দ্রের বাল্যকালে পড়াশোনা শুরু হয় গ্রামে গুরুমশাইয়ের কাছে। পরে আট বছর বয়সে চট্টগ্রাম শহরে পিতার তত্ত্বাবধানে তিনি স্কুলে ভর্তি হন। ছাত্র নবীনচন্দ্র ১৮৬৩ সালে চট্টগ্রাম স্কুল (বর্তমানে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল) থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন। এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নবীনচন্দ্র ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে। এফ এ পরীক্ষার এক মাস পূর্বে তাঁর বিয়ে হয় লক্ষ্মীকামিনী দেবীর সাথে। এরপর উচ্চ শিক্ষার জন্য কলকাতা যান। ১৮৬৫ সালে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে এফ এ পাশ করেন। পরে তিনি ভর্তি হন জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইনস্টিটিউশনে যা বর্তমানে স্কটিশ চার্চ কলেজ নামে পরিচিত। জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইনস্টিটিউশন থেকে ১৮৬৮ সালে বি এ পাশ করেন।

বি.এ. পাশ করার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যক্ষ সাটক্লিফ-এর সুপারিশে নবীনচন্দ্র কলকাতার হেয়ার স্কুলে তৃতীয় শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হন। পরে ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট নিয়োগের প্রতিযোগিতা মূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে উত্তীর্ণ হন। ১৮৬৮ সাল থেকে ১৯০৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ছত্রিশবছর তিনি ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট ও কালেক্টর হিসেবে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় দক্ষতার সাথে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। চাকরিতে নিযুক্ত থাকা কালীন বহু জনহিতকর সমাজসংস্কার মূলক কাজে নিজেকে আবদ্ধ রেখেছিলেন। ১৮৮৬ সালে তিনি ফেনী হাই স্কুল (বর্তমানে ফেনী সরকারি পাইলট হাই স্কুল) প্রতিষ্ঠা করেন।

 ‘পলাশীর যুদ্ধ’ মহাকাব্য প্রকাশিত হলে কবি হিসেবে পরিচিতির পাশাপাশি তাঁকে ব্রিটিশ শাসকদের রোষের মুখে পড়তে হয়।পলাশীর যুদ্ধ’র পর প্রকাশিত হয় রৈবতক, কুরুক্ষেত্র কাব্যগ্রন্থ। রৈবতক, কুরুক্ষেত্র ও প্রভাস এই তিনটি একটি বিরাট কাব্যের তিনটি স্বতন্ত্র অংশ। এই কাব্য তিনটিতে কৃষ্ণ চরিত্রকে কবি নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরেছিলেন। কবির মতে আর্য ও অনার্য সংস্কৃতির সংঘর্ষের ফলে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ হয়েছিল। আর্য অনার্য দুই সম্প্রদায়কে মিলিত করে শ্রীকৃষ্ণ প্রেমরাজ্য স্থাপন করেছিলেন। নবীনচন্দ্রর অন্যান্য কাব্য গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কাব্য গ্রন্থ  ক্লিওপেট্রা, অমিতাভ,  রঙ্গমতী,খৃষ্ট। এছাড়াও কিছু গদ্য রচনাও করেছিলেন তিনি। ভগবতগীতা এবং মার্কণ্ডেয়-চণ্ডীরও পদ্যানুবাদ করেছিলেন। অনবদ্য সৃষ্টিশীলতা, কবিত্ব তাকে রবীন্দ্র সমসাময়িক যুগেও বাংলা সাহিত্য সমাজে বিশেষ ভাবে জায়গা করে দিয়েছিল।

কবি নবীনচন্দ্র সেন ১৯০৯ সালের ২৩শে জানুয়ারি চট্টগ্রামে নিজের বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

ভালো লাগলে লাইক, শেয়ার করুন। নবীনচন্দ্র সেনের সম্বন্ধে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।

09 February 2019

৯ই ফেব্রুয়ারী কবি, কথাশিল্পী, নাট্যকার, প্রবন্ধকার, চিকিৎসক 'বনফুল'-বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের প্রয়ান দিবস। আজ ওঁনার প্রয়াণ দিবসে জানাই শ্রদ্ধা।

ছোটবেলা থেকেই বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ ছিল। বলাইচাঁদ যখন সাহেবগঞ্জ রেলওয়ে হাইস্কুলের ছাত্র সেই সময়ে ‘বিকাশ’ নামে হাতে লেখা পত্রিকায় কবিতা লেখালিখি করতো। পরে ‘মালঞ্চ’ পত্রিকায় অষ্টম শ্রেণির ছাত্র বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা ছাপা হয়। এতে স্কুলের হেডপণ্ডিত রামচন্দ্র ঝা খুশি হলেন না। হেডপণ্ডিত রামচন্দ্র ঝার ধারণা বলাইচাঁদ সংস্কৃতে একশো পাওয়ার যোগ্য কিন্তু কবিতা লেখার কারনেই বলাইচাঁদ সংস্কৃতে একশো পাচ্ছে না। তাই হেডপণ্ডিত বলাইচাঁদকে কবিতা লিখতে নিষেদ করেন। কিন্তু বলাইচাঁদের প্রবল ইচ্ছা লেখার। তাই হেডপণ্ডিত রামচন্দ্র ঝার হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য 'বনফুল' ছদ্মনাম দিয়ে লিখতে শুরু করেন। কিন্তু এই ছদ্মনামে লিখেও পণ্ডিতমশাইয়ের কাছে ধরা পড়ে গেলেন। এ বার আর পণ্ডিতমশাই বাধা দিলেন না। তিনি বলাইচাঁদকে নির্দেশ অমান্য করার জন্য 'শাস্তি' হিসাবে তাঁকে কিছু সংস্কৃত শ্লোক অনুবাদ করতে বলেন। সেই আনুবাদগুলি 'প্রবাসী’ ও ‘ভারতী’-পত্রিকাতে ছাপাও হয়। এ ভাবেই বলাইচাঁদ 'বনফুল' নামে পরিচিতি লাভ করে 'প্রবাসী', 'ভারতী' এবং সমসাময়িক অন্যান্য পত্রিকায় তাঁর ছোটগল্প প্রকাশ হতে থাকে।

বাংলা সাহিত্যে সর্বপ্রথম অণুগল্প লেখেন বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়। তাঁর গল্পগুলো আধ পৃষ্ঠা বা এক পৃষ্ঠা কিংবা দুই পৃষ্ঠা পর্যন্ত সীমায়ত থাকত। ঈশপের ও জাতকের গল্প, পঞ্চতন্ত্র, হিতোপদেশ প্রভৃতি বনফুলের অণুগল্পের পূর্বতন ঐতিহ্যের নিদর্শন। ‘নিমগাছ’ শিরোনামের আধ-পৃষ্ঠার গল্পটিতে ফুটে উঠেছে এক অসাধারণ কাব্যিক ব্যঞ্জনা। আরেকটি অণুগল্পের নাম হলো ‘অতি ছোটগল্প’। মানুষের নিয়তিকে নিয়ে দুটি অণুগল্পের নাম হলো ‘আত্ম-পর’ ও ‘হাসির গল্প’।

বলাইচাঁদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংস্পর্শে এসেছিলেন। ১৯৩৫ সালে রাজস্থানের জয়পুরের বাসিন্দা রামচন্দ্র শর্মা নামে এক ব্রাহ্মণ মন্দিরে বলি বন্ধ করতে চেয়ে কালীঘাট মন্দিরের কাছে অনশন শুরু করেন। বেশির ভাগ বাঙালিই রামচন্দ্রের এই কর্মসূচির বিরুদ্ধে থাকলেও সমর্থন জানালেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথের এই অবস্থানের বিরোধিতায় খানিকটা ব্যঙ্গের সুরেই একটি কবিতা লেখেন বনফুল। কবিতা পড়ে রাগ নয় বরং কবির সঙ্গে আলাপ করতে চাইলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু বনফুল জানালেন, তিনি ব্রাহ্মণ ও ডাক্তার। তাই ‘কল’, অর্থাৎ নিমন্ত্রণ ছাড়া কোথাও যান না। শেষমেশ সপরিবার বনফুলকে নিমন্ত্রণই জানালেন রবীন্দ্রনাথ। নিমন্ত্রণ পেয়ে পরিবার নিয়ে বনফুল যান শান্তিনিকেতন।

এই শুরু রবীন্দ্র-সান্নিধ্যের। পরে সে আলাপ গড়াল ঘনিষ্ঠতায়। বনফুলের ‘মানুষের মন’ গল্পটি পড়ে ভারী খুশি হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি লেখককে কিছু একটা উপহার দিতে চাইলেন। বনফুলের আবদার উপহার হিসেবে গুরুদেবের গায়ে দেওয়া একটি পুরনো জামা। রবীন্দ্রনাথ কিছুতেই দেবেন না। বনফুলও নাছোড়। শেষমেশ এক দিকে দামি পশম, অন্য দিকে রেশম দেওয়া একটি প্রকাণ্ড জোব্বা উপহার পান। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বনফুলের মতান্তরও হয়েছে। বনফুলের ‘তৃণখণ্ড’-য় কিছু কবিতা  সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মতামত, ‘ডাক্তারের ক্লিনিকে ওরা ভান করা সৌখিন রোগী’। বনফুলের ‘শ্রীমধুসূদন’ নাটকের কিছু অংশও রবীন্দ্রনাথের পছন্দ হয়নি বলে বদলানোর পরামর্শ দিলেও বনফুল তা করেননি।

লেখক হিসেবে বনফুল হাজারেরও বেশি কবিতা, ৫৮৬টি ছোট গল্প, ৬০টি উপন্যাস, ৫টি নাটক, জীবনী ছাড়াও অসংখ্য প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তাঁর 'স্থাবর' ও 'জঙ্গম' উপন্যাসগুলি সর্বসময়ের ক্লাসিক উপন্যাস হিসাবে স্থান করে নিয়েছে। অগ্নীশ্বর ও হাটেবাজারে উপন্যাসগুলি খুবই জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাঁর অনান্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাস তৃণখন্ড, অগ্নি, ডানা ত্রিবর্ণ, ভুবনসোম, প্রচ্ছন্ন মহিমা, উদয় অস্ত প্রভৃতি। তাঁর কয়েকটি উপন্যাস চলচ্চিত্রায়িত হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভূবনসোম, অগ্নীশ্বর ও হাটেবাজারে।

সমাজের অবহেলিত মানুষের সেবা করা ছিল বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের জীবনের ব্রত। এক্ষেত্রে ডাক্তারি ছিল তাঁর অন্যতম মাধ্যম।

কবি, কথাশিল্পী, নাট্যকার, প্রবন্ধকার, চিকিৎসক বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৮৯৯ সালের ১৯শে জুলাই বিহারের পূর্ণিয়া জেলার মণিহারী গ্রামে। পিতা সত্যচরণ মুখোপাধ্যায় ছিলেন পূর্ণিয়া জেলার মণিহারী ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড হাসপাতালের ডাক্তার। মাতা মৃণালিনী দেবী। তার অনুজ অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় খ্যাতনামা চিত্রপরিচালক।

বিহারের পূর্ণিয়া জেলার মণিহারী স্কুলে এবং পরে সাহেবগঞ্জ জেলার সাহেবগঞ্জ উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ে তিনি লেখাপড়া করেন। এরপর ১৯২০ সালে হাজারীবাগ সেন্ট কলম্বাস কলেজ থেকে তিনি আই.এস.সি, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কলকাতা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন এবং পাটনা মেডিক্যাল কলেজে থেকে এম.বি ডিগ্রী লাভ করেন।

বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় কর্মজীবন শুরু করেন কলকাতার একটি বেসরকারি ল্যাবরেটরিতে। পরে মুর্শিদাবাদের আজিমগঞ্জের মিউনিসিপ্যালিটি হাসপাতালে মেডিক্যাল অফিসার পদে কিছুকাল দায়িত্ব পালন করেন। তবে তিনি ভাগলপুরের খলিফাবাগে নিজ উদ্যোগে The Secro-Bactro Clinic নামে একটি ল্যাবরেটরি  প্রতিষ্ঠা করে খ্যাতিমান ডাক্তার হিসেবে পরিচিত হন। প্যাথলজিস্ট হিসাবে তিনি ৪০ বৎসর কাজ করেছেন।  তিনি ১৯৬৮ সালে কলকাতায় চলে আসেন স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য।

সাহিত্য-সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় লাভ করেন শরৎস্মৃতি পুরস্কার, রবীন্দ্র পুরস্কার, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের জগত্তারিণী পদক। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডিলিট উপাধি প্রদান করে ১৯৭৩ সালে; ১৯৭৫ সালে ভারত সরকারের কাছ থেকে তিনি পান পদ্মভূষণ উপাধি।

১৯৭৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি  কলকাতা শহরে তাঁর মৃত্যু হয়। আজ ওঁনার ৪০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

ভালো লাগলে লাইক, শেয়ার করুন। বনফুলের সম্বন্ধে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।