19 February 2019

আজ আমরা শিবাজী জয়ন্তী উপলখ্যে শিবাজী মহারাজের কয়েকটি বিষয়ের উপর আলোচনা করবো যেটা আজকের দিনে খুবই প্রাসঙ্গিক।

১৬৩০ সালের ১৯শে ফেব্রুয়ারী  শিবাজী ভোঁসলে, যিনি ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ নামে পরিচিত, মহারাষ্ট্রের পুণের কাছে একটি পার্বত্য দুর্গে জন্মগ্রহণ করেন। আজ আমরা শিবাজী মহারাজের কয়েকটি বিষয়ের উপর আলোচনা করবো যেটা আজকের দিনে খুবই প্রাসঙ্গিক।

তিনি ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ শাসক। যে সেক্যুলারিজমের কথা আজকাল বারবার বলা হয়, শিবাজি মহারাজ প্রকৃত অর্থেই ছিলেন সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ শাসক। মুসলিমদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক রেখে চলতেন। তাঁর সেনার মধ্যে অনেকে ছিলেন মুসলিম। নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ তাঁর নাটক "ছত্রপতি শিবাজী" তে শিবাজী মহারাজের ধর্মনিরপেক্ষতার নির্দশন খুব সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সেই নাটকের কিছু অংশ আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম।

 "দৃত। একজন মুসলমান সৈনিক রাজদর্শন প্রার্থনা করে।

 শিবাজী। ল’য়ে এসো।

 সুরেরাও। বোধ হয়, বিজাপুরের দূত। ( মুসলমান সৈনিকের প্রবেশ )

শিবাজী। সৈনিক, তোমার মন্তব্য প্ৰকাশ করো।

মুসলমান। মহারাজ, আমরা সপ্তশত মুসলমান, বিজাপুরের সৈনিক দল পরিত্যাগ ক’রে মহারাজের অধীনে কৰ্ম্ম প্রার্থনা করি।

শিবাজী। এ প্রার্থনার কারণ কি?

মুসলমান। মহারাজ, যদিচ বিজাপুর মুসলমান রাজ্য, তথায় আমাদের দুরবস্থার পরিসীমা নাই। জাইগিরদারের পীড়ন, উচ্চ রাজকৰ্ম্মচারীর পীড়ন, সুলতানের পীড়ন, আমরা মুসলমান হ’য়েও আমাদের স্বাধীনতা নাই- অধীনের অধীন। কিন্তু মহারাজের রাজ্যে মুসলমানেরা মহারাষ্ট্রের ন্যায় স্বাধীন। আমরা স্বাধীনতা প্ৰয়াসে মহারাজের আশ্রয় গ্ৰহণ করেছি, আশ্রিতকে বর্জন করবেন না।

শিবাজী। এ সম্বন্ধে আপনাদের মতামত কি?

যেসজনীকঙ্ক। বিজাপুরের সুলতানের সহিত আমাদের শক্ৰতা। এঁরা মুসলমান, এঁদের উপর বিশ্বাস স্থাপন কতদূর সঙ্গত, তা মহারাজ বিচার করুন।

আবাজী। মহারাজ, আমার বিবেচনায় সঙ্গত।  আমাদের বিজাপুরের সহিত শক্রতা সত্য, কিন্তু সমস্ত মুসলমানেব সহিত শক্রতা নয়। বিজাপুবের অধীনে অনেক উচ্চপদস্থ হিন্দু কৰ্ম্মচারী আছেন, এমন কি মহারাজের পিতৃদেব কর্ণাটে তাঁর সেনাপতি। আমাদের সৈনিক-কাৰ্য্যে মুসলমান কি নিমিত্ত নিযুক্ত না হবে?

শিবাজী। আবাজী, তোমার প্রস্তাব অতি সঙ্গত। হে মুসলমান বীর, আজ হ'তে তোমরা আমার সৈন্যদলভুক্ত। প্রজা আমার পুত্রের ন্যায় প্ৰিয়। তোমাদের যখন আমার প্রজা হবার বাসনা, তোমরাও জনে জনে আমার পুত্রের ন্যায় আদরণীয়! তোমাদের বাহুবলে অনেক শত্রু পরাজিত হবে, এইরূপ আমার প্রত্যাশা। আমরা ব্ৰাহ্মণ, ক্ষত্ৰিয়,বৈশ্য ও শূদ্র চারি জাতির স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র ধারণ করেছি, তোমরাও সেই স্বাধীনতার অধিকারী। স্বাধীনতার জন্য অস্ত্ৰ ধারণ ক’রে, জন্মভূমির মুখোজ্জ্বল করবে সন্দেহ নাই। আমার সম্পূর্ণ ধারণা, প্ৰজাপীড়ক ওমরাও-চালিত বিজাপুর দরবার, তোমাদের স্বাধীনতা অপহরণ করেছে। আজ হ’তে তোমরা স্বাধীন মহারাষ্ট্র প্রদেশে স্বাধীন। সাধারণ শত্রু বিরুদ্ধে জাতিভেদ কখনই হবে না। জাতিভেদ শত্রুর বাহু বলবান করে। জাতি-বিরোধে শত্রুর পদানত হওয়া অনিবার্য্য। স্বাধীন মহারাষ্ট্র প্রদেশে ধর্ম প্রভেদ বা জাতি প্রভেদে পরস্পর বিরোধের সম্ভাবনা নাই। স্বাধীনতাপ্রিয় মনুষ্যমাত্ৰই একজাতীয়। স্বাধীনতায় তারা একসূত্রে আবদ্ধ। যে স্বাধীনচেতা, তার হৃদয়ে হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ নাই। ভেদবুদ্ধি কাপুরুষের হৃদয়ে, কাপুরুষে হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ করে। সে ভেদাভেদ স্বাধীন মহারাষ্ট্রে নাই, পরমানন্দে স্বাধীন মহারাষ্ট্রে স্বাধীনতা ভোগ করো। তোমার সহচরীগণকে ল’য়ে এসো, আমি জনে জনে পুত্ৰ সম্বোধনে সম্ভাষণ করবো।

মুসলমান। মহারাজ, কৃতদাস আপনার উদারতায় চির আবদ্ধ।"

শিবাজী মহারাজ মহিলাদের যথেষ্ট সম্মান করতেন। মহিলাদের হেনস্থা বা তাঁদের ওপর কোনওরকম হিংসার ঘটনা বরদাস্ত করতেন না। কঠোর হাতে তা দমনের পক্ষপাতী ছিলেন। অনেকের বিশ্বাস, মা জিজামাতার প্রতি তাঁর অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থেকেই তিনি মহিলাদের সম্মান করতে শিখেছিলেন। সেনাদের উদ্দেশে কঠোর নির্দেশ থাকত, একজন কোনও মহিলার ওপরও অত্যাচার করা চলবে না। কেউ নির্দেশ অমান্য করলে, কঠোর শাস্তি হত। নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ তাঁর নাটক "ছত্রপতি শিবাজী" তে শিবাজী মহারাজের মহিলাদের সম্মানের নির্দশন ফুটিয়ে তুলেছেন। সেই নাটকের শিবাজী মহারাজের কিছু কথা  আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম।

"যদি কীৰ্ত্তিমান হ’বার উচ্চ আশা করো, মাতৃজ্ঞানে পরস্ত্রীর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে। ব্যভিচারীর ধ্বংশ অনিবাৰ্য্য। পুরাণ পাঠে অবগত আছ,-সীতার অপমানে লঙ্কা ধ্বংশ হয়, দ্রৌপদীকে উরু প্রদর্শনে দুৰ্য্যোধনের - উরু ভঙ্গ হয়। সাবধান, ব্যভিচারীর উন্নতি নাই। বীরগণ, হৃদয়ে ধারণা রাখো, নারীর সহ আমাদের বিবাদ নাই, কিরূপে রমণীকে সন্মান করতে হয়, মহারাষ্ট্র তা প্রচার করবে। আমরা জন্মভূমির কাৰ্য্যে ব্ৰতী, মাতৃকাৰ্য্যে ব্ৰতী, নারীর অপমানে মাতার অপমান হবে।"

আজ আমরা নিজের প্রয়োজনেই ছত্রপতি শিবাজী মহারাজকে অনেক বেশি করে মনে রাখবো। ভারতের জন্য লড়াই করতে তাঁর সাম্রাজ্যের প্রত্যটি মানুষকে তিনি উদ্বুদ্ধ করেছেন। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর আমেরিকা ভ্রমণের সময় ছত্রপতি শিবাজী সম্বন্ধে বলেছিলেন, "শিবাজী এমন একজন মহান জাতীয় নায়ক যিনি মাতৃভূমি ভারতবর্ষকে পরাধীনতার শৃঙ্খলামুক্ত করেছিলেন"।

আজ ১৯শে ফেব্রুয়ারী ৩৮৯তম শিবাজী জয়ন্তী উপলখ্যে তাঁকে জানাই আমাদের শ্রদ্ধা।


প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেইল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

17 February 2019

জীবনানন্দ প্রথম জীবনে নিকট আত্মীয়া শোভনা দাসের প্রেমে পড়েছিলেন। শোভনা ছিলেন তরুণ জীবনানন্দের মুগ্ধ পাঠক আর শ্রোতা। ঘন্টার পর ঘন্টা কবি তার নিজের কবিতা পড়ে শোনাতেন শোভনাকে। নিতান্ত অখ্যাত এক তরুণ থেকে বাংলা সাহিত্যের শুদ্ধতম কবি হয়ে উঠার দিনগুলোতে শোভনা ছিলেন তার অনুপ্রেরণা। দীর্ঘদিন পর্যন্ত ভালোবেসে গেছেন তাকেই। হয়তো সমাজে লোকলজ্জার ভয়ে মুখ ফুটে কোনোদিন কিছু বলা হয়ে ওঠেনি। প্রেমিকা শোভনা জীবনানন্দের বিয়েতে এসে হাসিখুশী ভাবে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। এমন কষ্টের কথাগুলো হয়তো মুখ ফুটে কাউকে বলতেও পারেননি কবি। কিন্তু জীবনানন্দ দিনলিপির পাতায় পাতায় বন্দী করে রেখে গেছেন সেই অস্ফুট দুঃখগুলোর কথা।

১৯২৭ তাঁর প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’ শোভনাকেই উৎসর্গ করেছিলেন তিনি। কোনো কোনো জীবনানন্দ গবেষকের মতে, এই শোভনাই ছিলেন বনলতা সেন! ১৯৩৫ সালে বুদ্ধদেব বসুর সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যাতেই প্রকাশিত হয় কাব্য গ্রন্থ “বনলতা সেন”’।  ১৯৫৩ সালে তাঁর এই বিখ্যাত  কাব্য গ্রন্থটি নিখিল বঙ্গ রবীন্দ্র সাহিত্য সম্মেলনে  পুরস্কৃত হন।

১৮৯৯ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি, অবিভক্ত বাংলার বরিশালে সত্যানন্দ দাশ আর কুসুমকুমারী দাশের কোল আলোকিত করে পৃথিবীর মুখ দেখেন ছোট্ট মিলু। তাঁর ছোটবেলা কাটে বরিশাল শহরে। ছোটবেলা থেকেই লাজুক ও মুখচোরা স্বভাবের ছিলেন জীবনানন্দ দাশ। ভোরে উঠেই বাবার কণ্ঠে উপনিষদের শ্লোকের আবৃত্তি ও মায়ের কাছ থেকে ধর্মীয় গান শুনতেন মিলু। মায়ের কন্ঠে কবিতার আবৃত্তি শুনতে শুনতে শিশু মিলুর মধ্যেও ছন্দের প্রতি ভালোবাসা জন্মে যায়।

বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ থেকে মেট্রিকুলেশন আর ইন্টারমিডিয়েটে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন তরুণ জীবনানন্দ। ১৯১৯ সালে ইংরেজীতে অনার্স শেষ করেন তিনি। কলকাতায় পা দিয়ে জীবনানন্দ একটু একটু করে কবি হয়ে উঠতে থাকেন। ১৯২৫ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মৃত্যুবরণ করলে তার স্মরণে জীবনানন্দ লেখেন ‘দেশবন্ধুর প্রয়াণে’ নামের একটি কবিতা। বঙ্গবাণী পত্রিকায় প্রকাশিত সেই কবিতাটি পড়ে কবি কালিদাস রায় মন্তব্য করেছিলেন-
“এ কবিতাটি নিশ্চয়ই কোনো প্রতিষ্ঠিত কবির ছদ্মনামে রচনা”। বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রযুগ চলছে তখন। ইংরেজী সাহিত্যে পড়া এক তরুণ লেখা শুরু করলো বাংলা কবিতা, অসাধারণ সব রূপকের গাঁথুনি দিয়ে তৈরি সব কবিতা। ত্রিশ দশকে বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দেব, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী আর জীবনানন্দ এই পঞ্চপান্ডব মিলে বাংলা কবিতায় আধুনিকত্ব নিয়ে এসেছিলেন।

১৯২৯ সালের বিশ্ব মন্দার সময় কলকাতা সহ পুরো বাংলা জুড়ে যেন এই মহামন্দার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে। বাংলা জুড়ে শুরু হয় কর্মী ছাটাই। ইংরেজি সাহিত্যের তরুণ গ্র্যাজুয়েট জীবনানন্দেরও চাকরি নেই। হাজারো মানুষের বেদনার ছন্দগুলো বাধা পড়তে থাকে ‘ধূসর পান্ডুলিপি’র পাতায় পাতায়। ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন - ‘আমি পাগলের মতন জীবনানন্দ দাশের ভক্ত হয়ে গেলাম। ভক্ত কিংবা ক্রীতদাসও বলা যেতে পারে। প্রেসিডেন্সি কলেজের সামনের রেলিং-এর পুরনো বইয়ের দোকান থেকে একদিন মাত্র চার আনায় এক কপি ধূসর পাণ্ডুলিপি কিনে মনে হয়েছিল যেন হাতে স্বর্গ পেয়েছি।’ জীবনানন্দের  “শ্রেষ্ঠ কবিতা” গ্রন্থটি ১৯৫৪ সালে ভারত সরকারের সাহিত্য আকাডেমী পুরস্কার লাভ করে।

জীবনের শেষ কয়েক বছর জীবনানন্দ কাটিয়েছেন চরম অর্থকষ্টে। একটার পর একটা চাকরি হারিয়েছেন। কলকাতার  ল্যান্সডাউন স্ট্রিটের একটি ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। বাড়ি ভাড়া দেওয়ার মতো পয়সাটি পকেটে ছিলো না। এক নর্তকীর কাছে ভাড়াবাড়ির একটি ঘর সাবলেট দিয়েছিলেন। কলকাতায় বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে টিউশনি করেছেন, বীমা কোম্পানির দালালি পর্যন্ত করেছেন। টাকা ধার করেছেন আশপাশের সবার কাছ থেকে। ১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর কলকাতায় ট্রাম দুর্ঘটনায় কবি পৃথিবী থেকে অবসর নেন। মৃত্যুর তিন বছর পর কলকাতার  সিগনেট প্রেস থেকে তাঁর ৬১টি কবিতা নিয়ে ‘রূপসী বাংলা’ প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে জীবনানন্দের কবিতার ভূমিকা ঐতিহাসিক। ষাটের দশকে বাঙালির জাতিসত্তা বিকাশের আন্দোলনে এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে সংগ্রামী বাঙালি জনতাকে তাঁর রূপসী বাংলা তীব্রভাবে অনুপ্রাণিত করে।

জীবনানন্দ দাশের পারিবারিক বাড়িটি যেটি বরিশালের বগুড়া রোডে ‘সর্বানন্দ ভবন’ নামে পরিচিত ছিল কবির সম্মানে একে ‘ধানসিঁড়ি’ নামকরণ করা হয়। বাংলাদেশ সরকার বাড়ির প্রবেশ মুখে ‘কবি জীবনানন্দ দাশ স্মৃতি মিলনায়তন ও পাঠাগার’ স্থাপন করেছে।

আজ কবি জীবনানন্দ দাশের ১২০তম জন্মবার্ষিকীতে জানাই আমাদের শ্রদ্ধা।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেইল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

16 February 2019

আজ ১৬ই ফেব্রুয়ারী, মেঘনাদ সাহার ৬৩ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

ভারতীয় বিজ্ঞান জগতের অন্যতম স্মরণীয় নাম মেঘনাদ সাহা। যিনি এক দিকে যেমন ছিলেন  শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী তেমনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে ছিলেন। ভারতের বিজ্ঞান চর্চার সঙ্গে বিশ্বের পরিচয় ঘটিয়ে দেবার ব্যাপারে এবং ভারতের বিজ্ঞান গবেষণাকে বিশ্বমানে উন্নীত করার ব্যাপারে বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার অবদান অনস্বীকার্য। গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ পাবার পাশাপাশি তিনি চারবার নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছিলেন। নিরলস চেষ্টা ও পরিশ্রমে গড়ে তুলেছেন ইন্সটিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্স।

ঢাকা জেলার তালেবাদ পরগনার অন্তর্গত সিওরাতলী গ্রামে ১৮৯৩ সালের ৬ অক্টোবর মেঘনাদ সাহা জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় তিনি কঠোর দারিদ্রের মধ্য দিয়ে প্রতিপালিত হন। গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা শেষে মেঘনাদ নিকটবর্তী শিমুলিয়ায় যান এবং সেখানে তিনি কাশিমপুর জমিদারের পারিবারিক চিকিৎসক অনন্ত কুমার দাসের আনুকূল্যে প্রতিপালিত হতে থাকেন। ১৯০৫ সালে তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। এ সময় স্বদেশী আন্দোলনে জড়িত হওয়ার কারণে তাঁকে স্কুল ছাড়তে বাধ্য করা হয়। পরে মেঘনাদ সাহা কিশোরীলাল জুবিলী স্কুলে ভর্তি হন। ১৯১১ সালে ঢাকা কলেজ থেকে তিনি আই.এসসি পাস করেন এবং প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য কলকাতা যান। সেখানে তিনি স্যার  জগদীশচন্দ্র বসু, স্যার আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, অধ্যাপক ডি.এন মলি­ক, অধ্যাপক সি.ই কুলিস প্রমুখ শিক্ষকের সান্নিধ্য লাভ করেন। যদিও মেঘনাদ সাহা গণিত শাস্ত্রের ছাত্র ছিলেন, তথাপি তিনি স্যার প্রফুল্ল চন্দ্রের দ্বারা প্রভাবিত হন। অল্পদিনেই মেঘনাদ সাহা তাঁর প্রিয় ছাত্রদের একজন ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে ওঠেন।

তাঁর রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার অনুভূতি তাঁকে ১৯৫১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করতে উদ্বুদ্ধ করে। একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেঘনাদ সাহা তাঁর নিকটতম কংগ্রেস প্রার্থীকে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করে ভারতের লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় সংশি­ষ্ট ছিলেন। শরণার্থী পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করার লক্ষ্যে ড. সাহা বেঙ্গল রিলিফ কমিটি গঠন করেছিলেন।

বিস্তৃত জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ মেঘনাদ সাহাকে পঞ্জিকা সংস্কার প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত করেছিল। জনগণ এবং শিক্ষার প্রতি সতত নিবেদিত প্রফেসর মেঘনাদ সাহা ছিলেন একজন অক্লান্ত কর্মী। ১৯৫৪-র পর থেকে পরিশ্রমী এই জ্ঞানকর্মীর স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করে এবং ১৯৫৬ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি এক বৈঠকে যোগদানের উদ্দেশ্যে দিল্লির পরিকল্পনা কমিশন দপ্তরে যাওয়ার পথে মেঘনাদ সাহা হৃদরোগ আক্রান্তে মারা যান।


প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com  ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

14 February 2019

গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই আমাদের শ্রদ্ধা।

বাংলার সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলকে উজ্জীবিত করতে জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ীর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। বাংলার চিত্রকলাকে বিশ্বের দরবারে অন্য মাত্রায় প্রতিষ্ঠা করার উদ্দোগে রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ ও গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান অনস্বীকার্য।  গগনেদ্রনাথের ছবির ভেতর দিয়ে বাংলার চিত্রকলা চর্চা সম্পূর্ণ একটা নতুন দিশা পেয়েছিল। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ীতে যেভাবে আলোছায়া স্থাপত্যের নির্মানগত কারনে বাড়ীর দেওয়াল, বারান্দায় বা সিঁড়ির খাঁজে পরতো এবং আলোছায়ার টুকরোতে স্পেসকে ভাগ করে দিত গগনেন্দ্রনাথ তাকেই ছবিতে ও আলোকচিত্রে তুলে এনেছিলেন। এই ছবির চরিত্র কিছুটা কিউবিস্ট চিত্রকরদের সাথে মেলে বলেই স্টেলা ক্রামরিশ তাঁকে "অ্যান ইন্ডিয়ান কিউবিস্ট" বলে আখ্যা দিয়েছেন।

গগনেন্দ্রনাথ প্রথম হরিনারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে পাশ্চাত্য জলরঙে ছবি আঁকা শিখেন। পরে জাপানি শিল্পী ইওকোহামা (ওকাকুরু) এবং টাইকান (তাইকোয়ান)-এর দ্বারা তিনি প্রভাবান্বিত হন। রবীন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতির জন্য কয়েকটি চিত্র তিনি অঙ্কন করেন যেগুলিতে জাপানি প্রভাব স্পষ্ট।

তাঁর ব্যঙ্গচিত্রে বাঙালীয়ানার ছাপ দেখা যায়। ১৯১১ সালে মোহনবাগান ইংরেজ দলকে হারিয়ে আই এফ এ শীল্ড জয় করে। তখন বাঙালী আর ফুটবল মিলে মিশে এক হয়ে যায়। পাড়ায় পাড়ায় তখন ফুটবল ক্লাব তৈরী করার হিড়িক পড়ে যায়। এখানে ঠাকুরবাড়ী পিছিয়ে থাকবে কেন। গগনেন্দ্রনাথ জুড়িগাড়ী হাঁকয়ে মাঠে গেলেন মোহনবাগানের খেলা দেখতে। তিনি মাঠে পৌঁছালে শুরু হয় বৃষ্টি। সাথে ছাতা না থাকায় তিনি গাড়ী থেকে নেমে আর খেলা দেখলেন না। বাড়ী ফিরে খেলার মাঠের ছবি আঁকলেন। সেখানে শুধু ছাতা আর ছাতা। নেই কোথাও বারপোস্ট, নেই বল।

তিনি পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। সে সময় শুভ কাজে সেলাই করা পোষাক পড়নো হতো  না। গগনেন্দ্রনাথ মেয়েকে শাড়ি ও ব্লাউজ পড়িয়ে বিয়ের আসরে নিয়ে আসেন। সেলাই করা পোশাক দেখে পাত্রের বাবা আপত্তি জানায়। কিন্তু গগনেন্দ্রনাথ প্রমাণ  করিয়ে দেখান যে সেই বস্ত্রে কোনো সেলাই নেই। ব্লাউজ নিপুন ভাবে আঠা দিয়ে জোড়া দেওয়া আছে। রবীন্দ্রনাথ পরিণত বয়সে তিব্বতি বকু ধরনের যে জোববা পরতেন তার নকশা সর্বপ্রথম গগনেন্দ্রই করেন।

১৮৬৭ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র। সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ভাইপো। তিনি ছিলেন একজন বঙ্গীয় ঘরানারচিত্র ও কার্টুনশিল্পী।

মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে পিতৃহারা হওয়ার পর তাঁর স্কুলের পড়াশুনা বন্ধ হয়। তার বদলে শুরু হয় জমিদারির কাজ এবং সে সঙ্গে পরিবারের প্রধান হিসেবে সামাজিক দায়-দায়িত্ব পালন। কিন্তু এতদ্সত্ত্বেও ভারতীয় ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে তাঁর ছিল প্রবল আগ্রহ। স্কুলের বন্ধন ছিন্ন হওয়াতেই তিনি স্ব-শিক্ষার সুযোগ পান, যেমনটি পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

অভিনয়কলাতেও গগনেন্দ্রনাথের দক্ষতা ছিল। তিনি জোড়াসাঁকোর বিচিত্রা হলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ফাল্গুনী  নাটক মঞ্চস্থ করেন এবং স্বয়ং রাজার ভূমিকায় অভিনয় করেন। অ্যানী বেস্যান্ট তাঁর অভিনয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

গগনেন্দ্রনাথ ১৯২৬ সালে শিশু সাহিত্য ভোঁদড় বাহাদুর রচনা করেন। তাঁর মৃত্যু হয় ১৪ই ফেব্রুয়ারী,১৯৩৮ সালে। তার ৩০ বছর পর ভোঁদড় বাহাদুর প্রকাশিত হয়। আজ ওঁনার ৮১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই আমাদের শ্রদ্ধা।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com -এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

12 February 2019

চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ড্রুজ ১২ই ফেব্রুয়ারী ১৮৭১ সালে ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। আজ চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ড্রুজের ১৪৮ তম জন্মবার্ষিকী।

চার্লস ফ্রিয়ার এন্ড্রুজ যিনি দীনবন্ধু এন্ড্রুজ নামে বিখ্যাত, ভারতের মাটিতে পা দিয়েছিলেন ১৯০৪ সালে। ভারতে এসে দেখলেন ইংরেজ শাসিত নিস্পেশিত দরিদ্র ভারতবাসীকে। ১৩ই এপ্রিল, ১৯১৯ সালে অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে অহিংস এক সমাবেশের ওপর চলল গুলি। প্রাণ গেল হাজারেরও বেশি নর-নারীর। নারকীয় এই গণহত্যা ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়। সেই সময় এন্ড্রুজ সাহেব ছিলেন শান্তিনিকেতনে। নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াবার জন্য তিনি পাঞ্জাব যাবার মনস্থির করেন।
কিন্তু ইংরেজ সরকার মানব দরদী ইংরেজ সাহেব এন্ড্রুজকে পাঞ্জাবে যেতে দিল না। এন্ড্রুজ যখন অমৃতসর রেল স্টেশনে পৌঁছান তখন তাকে আটক করে দিল্লিতে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে পাঞ্জাব থেকে সামরিক শাসন তুলে নেবার পর তিনি সেখানে যান। ছুটে বাড়ালেন পাঞ্জাবের এক প্রান্ত থেকে আন্য প্রান্ত। শুনলেন নিপীড়িত মানুষের কথা। তিনি চেয়েছিলেন মানুষের সেবা করেই ইংরেজদের কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করতে। তিনি সকল ভারতবাসীর কাছে ক্ষমা ভিক্ষা চেয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১২ সালের জুন মাসে ইংল্যান্ডে যান। সেখানে  শিল্পী রোটেনস্টাইনের গৃহেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয় হয় ইংল্যান্ডের চার্লস ফ্রিয়ার এন্ড্রুজ পরবর্তীকালে যিনি রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজির অন্যতম ভক্ত হয়ে ওঠেন। এন্ড্রুজের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল এবং তিনি শান্তিনিকেতনে অনেক সময় অতিবাহিত করেছিলেন।

ইংল্যান্ডের চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ড্রুস একজন খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক, শিক্ষাবিদ ও সমাজ সংস্কারক। তিনি মহাত্মা গান্ধীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠেন এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন। ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে ও সেন্ট স্টিফেনস কলেজে তাঁর অবদানের জন্য তাঁকে দীনবন্ধু বা "দ্য ফ্রেন্ড অফ দ্য পুওর" নামে ডাকা হয়।

চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ড্রুজ ১২ই ফেব্রুয়ারী ১৮৭১ সালে ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন বার্মিংহামের ক্যাথলিক অ্যাপোস্টোলিক চার্চের "এঞ্জেল" (বিশপ)।

১৯০৪ সালে সালে তিনি দিল্লীতে সেন্ট স্টিফেনস কলেজে দর্শন পড়ানোর সময় যেখানে তাঁর অনেক ভারতীয় সহকর্মী ও শিক্ষার্থীর সাথে পরিচিতি ঘটে। তিনি শীঘ্রই  ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের অন্দোলনে  জড়িত পড়েন এবং ১৯১৩ সালে তিনি মাদ্রাজের তুলো শ্রমিকদের ধর্মঘটের সমাধান করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন  করেছিলেন।

কলকাতা সফরকালে ৫ই এপ্রিল ১৯৪০ সালে চার্লি অ্যান্ড্রুজ মারা যান এবং কলকাতার লোয়ার সার্কুলার রোড  'খ্রিস্টান বরিয়াল গ্রাউন্ডে' কবরস্ত করা হয়।

আজ চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ড্রুজের ১৪৮ তম জন্মবার্ষিকী।
আমরা ভুলব না এই এন্ড্রুজ সাহেবের কথা, ভুলব না তার মানব প্রেমের কথা। হে ভারত পথিক এন্ড্রুজ! দীনবন্ধু এন্ড্রুজ! ভারতবন্ধু এন্ড্রুজ! সকল ভারতবাসীর শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন গ্রহণ করো!

ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন।  জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।

11 February 2019

কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত প্রখ্যাত বাঙালি কবি ও ছড়াকার। কবিতার ভূবনে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

আজ ১১ই ফেব্রুয়ারি বাংলা কবিতার ছন্দের জাদুকর কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের  ১৩৭তম জন্মবার্ষিকী।

সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত প্রখ্যাত বাঙালি কবি ও ছড়াকার। কবিতার ভূবনে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বাংলা সাহিত্যে কবিতায় ছন্দের কারুকাজ শব্দ ও ভাষা যথোপযুক্ত ব্যবহারের কৃতিত্বের জন্য তাঁকে 'ছন্দের যাদুকর' নামে আখ্যায়িত করা হয়।

ছোটবেলায় পড়া ছড়া-কবিতাগুলির মধ্যে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ইলশে গুঁড়ি ইলশে গুঁড়ি, দূরের পাল্লার ছিপখান তিন-দাঁড় – তিনজন মাল্লা, পালকির গান পাল্কী চলে!পাল্কী চলে! ইত্যাদি আজ ও আমাদের স্মৃতি থেকে মুছে যাইনি। তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু, ছন্দ, নির্মাণ কৌশল এবং শব্দ ও ভাষার কারুকার্যময়তায় উজ্জ্বল তাঁর প্রতিটি রচনা। নানা ধরণের ছন্দ উদ্ভাবনে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। মেথরদের মতো অস্পৃশ্য ও অবহেলিত সাধারণ মানুষ নিয়েও তিনি কবিতা লিখেছেন। এই কবির কবিতা আজও পাঠকদের অনুরনিত করে। সবিতা, সন্ধিক্ষণ, বেনু ও বীনা, কুহু ও কেকা ইত্যাদি তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ।

কাব্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করার আগে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত পিতার ব্যবসায় যোগ দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ভারতী পত্রিকাগোষ্ঠীর অন্যতম কবি। প্রথম জীবনে তিনি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, অক্ষয় কুমার বড়াল প্রমুখের দ্বারা প্রভাবিত হন। বাংলা শব্দের সঙ্গে আরবি-ফার্সি শব্দের সমন্বিত ব্যবহার দ্বারা বাংলা কাব্যভাষার শক্তি বৃদ্ধির প্রাথমিক কৃতিত্ব তারই। অনুবাদের মাধ্যমে তিনি বিশ্বের কাব্যসাহিত্যের সঙ্গে বাংলার যোগাযোগ ঘটান। নবকুমার, কবিরত্ন, অশীতিপর শর্মা, ত্রিবিক্রম বর্মণ, কলমগীর প্রভৃতি ছদ্মনামে তিনি কবিতা লিখতেন। আরবি-ফারসি, চীনা, জাপানি, ইংরেজি এবং ফরাসি ভাষার বহু কবিতা অনুবাদ করে বাংলাসাহিত্যের বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধি সাধন করেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। এই কবিতাগুলি রয়েছে তাঁর ‘তীর্থসলিল’, ‘তীর্থরেণু’ ও ‘মণিমঞ্জুষা’ নামক তিনটি অনূদিত কবিতার সংকলনে৷

সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ১৮৮২ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি কলকাতার কাছে নিমতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতামহ অক্ষয়কুমার দত্ত ছিলেন। তার পৈতৃক নিবাস বর্ধমানের চুপী গ্রামে। পিতা রজনীনাথ দত্ত ছিলেন কলকাতার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং পিতামহ অক্ষয় কুমার দত্ত ছিলেন তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদক। সত্যেন্দ্রনাথ কলকাতার সেন্ট্রাল কলেজিয়েট স্কুল থেকে এন্ট্রান্স  এবং জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইনস্টিটিউশন (বর্তমান স্কটিশ চার্চ কলেজ) থেকে এফএ।

বাংলা সাহিত্যের এই খ্যাতিমান কবি মাত্র ৪০ বছর বয়সে ১৯২২ সালের ২৫ জুন মৃত্যুবরণ করেন। আজ ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ তাঁর ১৩৭তম জন্মবার্ষিকীতে জানাই আমাদের গভীর শ্রদ্ধা।

ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।

আজ ১১ই ফেব্রুয়ারি, বাংলা সাহিত্যের রম্য রচনায় প্রবাদপুরুষ সৈয়দ মুজতবা আলীর ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম।

সৈয়দ মুজতবা আলী রম্য রচনায় বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ। মানুষকে হাসানোর কাজটি অতি সহজে করেছেন সৈয়দ মুজতবা আলী। যে কোনো বক্তব্যকে নিয়ে তিনি হাস্যরস করেছেন। রম্য রচনার রস সহজে যাতে পাঠক আস্বাদন করে, একটু হলেও হাসির খোরাক জোগায় সে চেষ্টাই তিনি জীবনভর করে গেছেন।

তাঁর ‘রসগোল্লা’ রম্য রচনাটি পড়লে হেসে লুটোপাটি খেতে হয়। গল্পের মুল চরিত্র ঝান্ডুদা বন্ধুর মেয়ের জন্য এক টিন ভ্যাকুম প্যাকেটজাত মিষ্টি নিয়ে যাচ্ছে। ইতালির কাস্টমস অফিসারের সাথে তা নিয়ে বাকবিতন্ডা হয়। কাস্টমস কর্মকর্তাদের সে কিছুতেই বুঝিয়ে উঠতে পারছেনা যে  প্যাকেট খুললেই মিষ্টি নষ্ট হয়ে যাবে। সেখানে নানা হাস্যরসাত্মক ঘটানোর পরেও ঝান্ডুদাকে মিস্টির প্যাকেট খুলতে হয়। আর প্যাকেট খোলার পরে ঘটে সেই আসল ঘটনা। কিছু বুজে উঠার আগেই ঝান্ডুদা ক্ষেপে রসগোল্লা নিয়ে অফিসারের নাকে-মুখে লেপে দেয়। আর সকলকে রসগোল্লা বিলিয়ে দেয়। সকলেই রসগোল্লার রসে মজে আরোও রসগোল্লা খেতে চায় কিন্তু ততোক্ষণে সব শেষ। রসগোল্লার রসে মজে ঝান্ডুদাকে ক্ষমা করে দেন কর্তৃপক্ষ আর সেই যাত্রায় ঝান্ডুদা বেঁচে যায়।

স্ত্রীর দ্বারা স্বামী নির্যাতনের কাহিনীর সাথে  রঙ চড়িয়ে সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছেন ‘দাম্পত্য জীবন’। যেখানে স্বামীরা স্ত্রীর নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে মিছিল-মিটিং করে। এমন একটি সভা চলা কালে শোনা গেল স্ত্রীরা ঝাঁটা নিয়ে সভা পন্ড করতে আসছে। এই খবর রটার সাথে সাথে সভাস্থল খালি হয়ে গেল। একমাত্র সভাপতি সেখান থেকে নড়ল না। পাঠকের মনে হতে পারে তাহলে সভাপতিই একমাত্র বীরপুরুষ যে কিনা সভা ছেড়ে পালাইনি। আসলে ব্যপারটা ছিল অন্যরকম। দারোয়ান গিয়ে দেখল সভাপতি মারা গেছে। সভাপতির চিরতরে পালানোটা ট্রাজেডি কিন্তু এখানেও পাঠকের মনের কোণে অদ্ভুত হাসির সুড়সুড়ি দেয়।

শান্তিনিকেতন ও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘রবি-পুরাণ’। শান্তিনিকেতনে এক মারাঠি ছেলে রবীন্দ্রনাথকে সন্ন্যাসী ভেবে তাঁকে একটি আধুলি দিয়েছিলো। রবিঠাকুর সে নৈবেদ্য গ্রহণ করেছিল। এখানে মুজতবা আলী আরো যোগ করেছেন রবিঠাকুরের কাছ থেকে একবার একটা লোক দশ টাকা ধার নিয়ে বলেছিল আমি চির ঋণী হয়ে থাকলাম। রবিঠাকুর তার নাতি দিনেন্দ্রনাথকে বলেছিল লোকটার শত দোষ থাকলেও একটা গুণ ছিল। লোকটা সত্যভাষী। এই কাহিনী আমাদের রসের সন্ধান দেয়।

শান্তিনিকেতনে পড়ার সময় সেখানের বিশ্বভারতী নামে হাতে লেখা ম্যাগাজিনে মুজতবা আলী লিখতেন। পরবর্তীতে তিনি ‘সত্যপীর’, ‘ওমর খৈয়াম’, ‘টেকচাঁদ’, ‘প্রিয়দর্শী’ প্রভৃতি ছদ্মনামে বিভিন্ন পত্রিকায়, যেমন– দেশ, আনন্দবাজার, বসুমতী, সত্যযুগ, মোহাম্মদী প্রভৃতিতে কলাম লিখেন। তাঁর বহু দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছেন ভ্রমণকাহিনি। এছাড়াও লিখেছেন ছোটগল্প, উপন্যাস, রম্যরচনা। বিবিধ ভাষা থেকে শ্লোক ও রূপকের যথার্থ ব্যবহার, হাস্যরস সৃষ্টিতে পারদর্শিতা এবং এর মধ্য দিয়ে গভীর জীবনবোধ ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা তাঁকে বাংলা সাহিত্যে এক বিশেষ মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য গ্ৰন্থ “দেশে বিদেশে’, ‘শব্নম্’, ‘ময়ূরকণ্ঠী’, ‘হিটলার’, ‘চাচা কাহিনী’, ‘ধূপছায়া’, ‘জলে ডাঙায়’, ‘মুসাফির’, ‘পঞ্চতন্ত্র’, ‘অবিশ্বাস্য’, ‘ভবঘুরে ও অন্যান্য’, ‘টুনিমেম’, ইত্যাদি।

সৈয়দ মুজতবা আলী জন্মগ্রহণ করেন ১৯০৪ সালের ১৩ই সেপ্টেম্বর সিলেটের করিমগঞ্জে। তাঁর পিতা সৈয়দ সিকান্দার আলী। তাঁর পৈতৃক ভিটা হবিগঞ্জে।
পিতার বদলীর চাকরি হওয়ায় মুজতবা আলীর প্রাথমিক শিক্ষাজীবন কাটে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ১৯২১ সালে তিনি শান্তিনিকেতনে ভর্তি হন। তিনি ছিলেন বিশ্বভারতীর প্রথম দিকের ছাত্র। এখানে তিনি সংস্কৃত, ইংরেজি, আরবী, ফার্সি, হিন্দি, গুজরাটি, ফরাসি, জার্মান ও ইটালীয় ভাষাশিক্ষা লাভ করেন।

১৯৪৯-এ দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক নরসিংহদাস সাহিত্য পুরস্কারে সম্মানিত হন। ১৯৬১ সালে  তাঁকে আনন্দ পুরস্কার প্রদান করা হয়। বাংলাদেশে ফেরেন ১৯৭২-এ। সাহিত্য ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিশেবে পান একুশে পদক ২০০৫ (মরণোত্তর)।

সৈয়দ মুজতবা আলীর বাংলাদেশেই ১১ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৪ সালে জীবনাবসান হয়। আজ ওঁনার ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম।

ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন।  জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।