27 August 2019

প্রেম, শান্তি  ও আশ্রয়ের প্রতীক মাদার টেরেসার ১০৯ তম জন্ম বার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

প্রেম, শান্তি  ও আশ্রয়ের প্রতীক একটি নাম হল মাদার টেরেসা। মানুষ কে শোষণ,নিপীড়ন, নিষ্ঠুরতার হাত থেকে মুক্তি দেবার জন্য যে সব সাধু-মহাত্মা অণেক  কষ্ট  ভোগ করেছেন,  মাদার টেরেসা ছিলেন তাঁদেরই  একজন। ইনি ১৯১০ সালে ২৭শে আগস্ট আড্রিয়াটিক সাগরের তীরে ছোট শহর স্কোপেনে এক আলবেনিয়ান কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। পিতার নাম ছিল নিকোলাস বোজাকসহিউ যিনি পেশায় ছিলেন মুদি। তিনি মেয়ের নাম রেখেছিলেন অ্যাগনেস গোনক্সহা বোজাকসহিউ।জন্ম সূত্রে মাদার যুগোশ্লোভিয়ার বাসিন্দা হলে ও জাতিসূত্রে তিনি আলবেনিয়ান। অ্যাগনেসের বয়স যখন ৭ বছর তখন তাঁর পিতার মৃত্যু হয়। মাতার কাছে তিনি মানু ষ হতে থাকেন। শৈশব হতেই বিশ্বের দুঃখী, আর্ত, অসহায় মানু ষের কান্না তার চোখের সামনে ভেসে উঠত।মায়ের প্রেরণাতেই গ রীবের প্রতি দয়া ও ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি বিশ্বাস
অ্যাগনেস লাভ করেছিলেন।

স্কেপেজের পাবলিক স্কুলে পড়বার সময়ই সোডালিটি সংঘের মিশনারীদের কাজকর্মের প্রতি অ্যাগনেসের উৎসাহ ছিল। সংঘের পত্র - পত্রিকাগুলি নিয়মিত পড়তেন তিনি।তার নিজের কথায় 'At the age of twelve I first knew I had a vocation to help the poor. I wanted to be a missionary'.

স্কেপেজের পাবলিক স্কুলে পড়বার সময়ে কলকাতার প্রতি এক বিশেষ আকর্ষণ তৈরী হয়েছিল অ্যাগনেসের মনে।

অ্যায়ারল্যান্ডের লরেটো সংঘ তখন  কাজ করছিল। তাদের প্রধান কার্যালয় ছিল ডাবলিনে। অ্যাগনেস সেখানে যোগাযোগ করলেন এবং মায়ের অনুমতি নিয়ে যোগদিলেন লরেটো সংঘে।অ্যায়ারল্যান্ডের বাথার্নহামে গেলেন মাত্র আঠারো বছর বয়সে।

১৯২৮ সালে অ্যাগনেস জাহাজে ভেসে চলে এলেন কলকাতায়। যোগ দিলেন সিস্টারস অব লরেটোতে- আইরিস  সন্নাসিনীদের প্রতিষ্ঠান। সেই থেকেই তিনি মনে প্রানে বাংলার মানুষ হয়ে গেলেন।
তখন ও  পুরোপুরি  সন্নাসিনী তিনি হননি। শিক্ষানবিশী পর্ব শেষ করার জন্য  দার্জিলিং পাঠানো হল তাঁকে। দু বছর সেখানে কাটিয়ে গ্রহন করলেন সন্নাসিনী ব্রত।

কলকাতায় ফিরে এলেন সিস্টার অ্যাগনেস হয়ে। এন্টালির সেন্ট মেরিজ স্কুলে শিক্ষয়ত্রী হিসাবে যোগ দেন।দীর্ঘ কুড়ি বছর তিনি ঐ স্কুলের শিক্ষয়ত্রী ছিলেন। ১৯৪২ সালে তিনি ঐ স্কুলের অধ্যক্ষা হন। স্কুলে থাকাকালীন পাশে মতিঝিল বস্তির বাসিন্দাদের দুঃখ-কষ্ট,দারিদ্র, শিশুদের কষ্ট তাঁকে গভীরভাবে পীড়া দিত।
তখন চলছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। মানুষ সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে কলকাতার অবস্থা তখন খুবই দুর্বিসহ। একটু ভাতের আশায়,  একবাটি ফ্যানের আশায় দলে দলে গ্রামের মানুষ ভিড় করছে কলকাতায়। অনাহারে কু খাদ্য খেয়ে মানুষ  মারা যাচ্ছে। সিস্টার অ্যাগনেস এই সম য় তাঁর কাজ শুরু করলেন।তাঁর নাম হ ল মাদার অ্যাগনেস।
১০ই সেপ্টেম্বর ১৯৪৬ সালে দার্জিলিং যাবার সময় এক অলৌকিক উপলব্ধি তাঁর হল। এই উপলব্ধির কথা বলতে গিয়ে তুনিব লেছেন  ,'a call within a call.... The message was clear.I was to leave rhe convent and help the poor, while living among them.
গরিবের সেবা করতে হলে তাদের মধ্যে থেকেই সেটা করতে হবে। এটা তিনি সারা জীবন স্মরণে রেখেছিলেন। তিনি বলতেন  'দ্য ডে অব ডিমিশন'--- অনুপ্রেরণার দিন।  মাদার অ্যাগনেস পরিনত হলেন মাদার টেরেসাতে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মিশনারিজ অব চ্যারিটি এই দিন টিকেই অনুপ্রেরণার দিবস হিসাবে পালন করে।
মাদার অ্যাগনেসে অধ্যক্ষার কাজ ছেড়ে দেন।ল রে টোর স ন্নাসীদের বেশ ত্যাগ করে পরলেন মোটা নীল পাড় শাড়ী। সেদিন তার সম্বল বলতেছিল পাঁচ টাকা, একটি বাইবেল, ক্রস গাঁথা একটি জপের মালা। আর সাথে ছিল ঈশ্বরে নির্ভরতা, মনোবল আর বিশ্বাস।

১৯৫০ সালে মিশনারিজ অব চ্যারিটি প্রতিষ্ঠা করে শুরু করলেন মানুষের সেবার কাজ।দুঃখী, দরিদ্র মানুষ কে একান্ত মায়ের স্নেহ- মমতায় তুলে নিলেন বুকে।
মাত্র পাঁচ টাকা মূলধন করে যে মিশনারিজ ইব চ্যারিটির  জন্ম হয়েছিল আজ তা বিশ্বে শত শত শাখা প্রশাখা বিস্তার করেছে।
মানবতার সেবা ও শিক্ষা প্রচারের জন্য তিনি বহু দেশে শিশু ভবন,  মহিলা কর্মক্ষেত্র, খাদ্য ও বস্ত্র বিতরণ কেন্দ্র, ভ্রাম্যমান চিকিৎসাকেন্দ্র ও কুষ্ঠাশ্রম ইত্যাদি স্থাপন করেন। বৃদ্ধ বয়সে ও  এই মহীয়সী নারী সেবার কাজে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন।
মানুষ্ কে ভালোবাসার এক অভাব ণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন ক রে ছেন মাদার টেরেসা।গোটা বিশ্ব সেটা স্বীকার করে নতমস্তকে তাকে দিয়েছে নানা পুরস্কার।১৯৬২ সালে ভারত স র কারের 'পদ্মশ্রী', ১৯৭১সালে 'পোপের শান্তি' পুরস্কার।  এছাড়াও তিনি 'নেহ রু' 'মাস্টার অফ ম্যাজেস্টি', 'ভার ত র ত্ন', 'ম্যাগশেশাই' পুরস্কার এবং সন্মান পান।১৯৭৯ সালে ১৭ই অক্টোবর ভারতবর্ষ, এবং কলকাতার গৌর বের দিন। ভারতের নাগরিক মাদার টেরেসা পালেন নোবেল পুরস্কার। পোপ ফ্রান্সিস ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ তে ভ্যাটিকান সিটির  সেন্ট পিটার্স স্কোয়ারে একটি অনুষ্ঠানে তাঁকে সন্ত উপাধি প্রদান করেন।ক১৯৯৭সালের৫ই সেপ্টেম্বর এই বিশ্ব জ ন নীচি র নিদ্রায় নিদ্রিত হ লেও আমাদের কাছে তিনিও ম র হ য়েই থাকবেন।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।




15 August 2019

অগ্নিযুগের বিপ্লবী নেতা ও দার্শনিক শ্রী অরবিন্দ ঘোষের ১৪৭ তম জন্ম বার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।


অগ্নিযুগের বিপ্লবী নেতা ও দার্শনিক শ্রী অরবিন্দ ঘোষের ১৪৭ তম জন্ম বার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি। বাবা  কৃষ্ণধন ছিলেন বাঙালি দের মধ্যে প্রথম বিলেত ফেরত চিকিৎসক।আচার ব্যবহার চাল চলনে কৃষ্ণধন ছিলেন পুরোদস্তর সাহেব। শ্রী অরবিনন্দের মা স্বর্ণলতা ছিলেন অত্যন্ত স্নেহময়ী। ভাই বোন মিলে
অরবিন্দরা মোট  পাঁচজন  ছিলেন।
বাড়িতে বিলেতি পরিবেশে বড় হচ্ছিলেন।
অরবিন্দের জন্ম হয়ে ছিল কলকাতার থিয়েটার রোডে ১৫ই আগস্ট ১৮৭২ সালে। ঘোষ পরিবারের বাড়ি যেন ইংরেজ পরিবার। শ্রীঅরবিনন্দের দেখাশোনার দায়িত্ব ছিল একজন ইংরেজ আয়ার হাতে। ছোট থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত অরবিন্দ জানতেই পারেননি যে তাঁর মাতৃভাষা বাংলা।শ্রীঅরবিন্দের বয়স যখন পাঁচ তখন তিনি দার্জিলিংয়ে সাহেব দের স্কুলে ভর্তি হন।
শ্রীঅরবিন্দের বয়স যখন সাত তখন তিনি ও  তাঁরভাই ইংল্যান্ডে পড়তে যান। শ্রী অরবিন্দ  কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাশ করে দেশে ফিরে আসেন।ইংল্যান্ডে থাকার সময় তিনি জার্মান, ইতালিয়,স্পানিশ এবং গ্রীক ভাষা শিখেছিলেন।
লন্ডনে থাকাকালিন সে সময়কার বরোদার মহারাজা তাঁর রাজ্যের শিক্ষা বিভাগে ভালো বেতনে কাজ করার জন্য আহ্বান জানান। ১৮৯৩  সালে বিদেশে শিক্ষ্যিত হয়ে দেশ মাতৃকার সেবায় জীবন উৎসর্গ করতে শ্রীঅরবিন্দ দেশে ফিরে বরোদায় চলে আসেন।বারোদায় অরবিন্দ ভারতীয় সংস্কৃতির উপর গভীর অধ্যয়ন শুরু করেন, নিজ ঊদ্যোগে সংস্কৃত, হিন্দি এবং বাংলা, বিলেতের শিক্ষায় যেসব থেকে তাকে বঞ্চিত করা হয়েছিল।এই সময় তিনি সংস্কৃত হিন্দি ও বাংলা ভাষা শিক্ষা শুরু করেন। এরপর তিনি   অল্প টাকার বেতনে জাতীয় শিক্ষা পরিষদে অধ্যাপকের চাকরি নেন।তিনি বারোদা থেকেই তার প্রথম কাব্য সঙ্কলন "The Rishi" প্রকাশ করেন। একই সময়ে তিনি বৃটিশ বিরোধী সক্রিয় রাজনীতিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।বাংলা ও মধ্য প্রদেশে ভ্রমন করে বিপ্লবী দলগুলোর সাথে সংযোগ স্থাপন করেন। লোকমান্য তিলক এবং ভইগ নি নিবেদিতার সাথেও যোগাযোগ স্থাপিত হয়।
১৯০৯ সালে যখন বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে সারা দেশ উত্তাল,সেই সময় তিনি বন্দেমাতরম  নামক একটি ইংরাজি পত্রিকা  সম্পাদনা করতেন। এই পত্রিকায় বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে লিখে তিনি পরিচিত হয়ে পড়েন। এমন সময় অনুজ বিপ্লবী বারীন ঘোষের মাধ্যমে বাংলার বিপ্লবী দলের সাথে তাঁর যোগাযোগ ঘটে।বারীন ঘোষ কে তিনি  চিঠি লিখে নির্দেশ দেন ছেলেদের মধ্যে শৃঙ্খলা  এনে ছোট ছোট দল গঠন করতে।কোন শহরই বাদ গেল না।এই ভাবে একে একে মুরারী পুকুরের ছেলেরা এক ত্রিত হয়ে দেশের কাজে একনিষ্ঠ সেবক হব, প্রাণ পণ করে। তাদের সকলের মুখেই  মাতৃমন্ত্র বন্দেমাতরম।

স্বাধীনতার বাণী ছড়িয়ে দেবার জন্য এই সময় বন্ন্দেমাতরম নামে একটা ইংরাজী প ত্রিকা সম্পাদনাক  করতেন। ইংরেজ সরকার এই পত্রিকার এবং আলিপুর বোমার মামলার কারণে শ্রীঅরবিন্দকে গ্রেপ্তার  করেন। কিন্তু দুটি ক্ষেত্রেই অরবিন্দ  মুক্তি পান।এর আল্প কিছুদিন পর অরবিন্দ জানতে পারেন যে ইংরেজ সরকার তাঁকে বরাবরের জন্য বন্দী রাখার ব্যবস্থা করছেন।তখন ১৯১০ সালে তিনি বাংলা ছেড়ে প্রথমে চন্দনগর ও  পরে ফরাসি উপনিবেশ পন্ডিচেরিতে চলে যান।যে শ্রীঅরবিন্দ সুপ্ত ও মোহগ্রস্ত ভারতের তরু ন দের বুকে প্রেরণা জাগিয়ে দেশপ্রেমের বন্যা বইয়ে দেন তিনি আবার যোগ সাধনার মাধ্যমে মুক্তি পথের নিশানা তুলে ধরেন।
১৯১৪ সালে মীরা রিচার্ড নামে রক বিপ্লবী ফরাসী মহিলা শ্রী অরবিন্দের আশ্রমে আসেন এবং অরবিন্দের কাছে দীক্ষা নিলে পর তাঁর নাম হ য় শ্রীমা।তাঁরই ওপর আশ্রম পরিচালনার ভার পড়ত।আওরবিন্দ প ন্ডিচেরীতে থাকাকালীন যে সব গ্রন্থ রচনা করেন তার মধ্যে The Motherএবং ছয় খন্ডে সমাপ্ত দিব্য জীবন The Life Divine উল্লেখযোগ্য।
শ্রী অরবিন্দ ঘোষ পরবর্তী জীবনে আধ্যাত্মিক সাধনায় সিদ্ধিলাভ করে হয়েছিলেন ঋষিঅরবিন্দ।
ঋষি অরবিন্দ ১৯৫০সালের৪ঠা ডিসেম্বর  পরলোকগমন করেন।

কিশোরকবি সুকান্তের ৯৩তম জন্ম বার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।


মাত্র ২১ বছর বয়েসের মধ্যেই সুকান্ত ভট্টাচার্য  হয়ে উঠেছিল কিশোর কবি সুকান্ত।একুশ বছরের মধ্যে তিনি এমন কিছু কবিতা লিখেছেন সেগুলি এক সময় বিপ্লবের আগুনশিখা হিসাবে কাজ করেছে।সব সময় তিনি সামাজিক অব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন।
সুকান্ত ভট্টাচার্য, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হওয়াতে তাঁকে প্রতি মুহূর্তে দারিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই সমাজসেবার ক্ষেত্রে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। সুকান্ত যখন কৈশোর অতিক্রম করেন,তখন সমগ্র ভারতবর্ষ এক রাজনৈতিক ক্রান্তিকালের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলছিল।

কবির জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছিল কলকাতার বেলেঘাটার ৩৪ হরমোহন ঘোষ লেনের বাড়ীতে। সেই বাড়িটি এখনো অক্ষত আছে। পাশের বাড়ীটিতে বসবাস করেন সুকান্তের একমাত্র জীবিত ভাই বিভাস ভট্টাচার্য। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য  সুকান্তের সম্পর্কিত ভাতুষ্পুত্র।
দক্ষিণ কলকাতার একটি গুরুত্ব পূর্ণ উড়াল পুল  কবি সুকান্তের স্বরণে নামে রাখা হয়েছে সুকান্ত সেতু। এটি  যাদবপুরকে (সুলেখার নিকটে) সন্তোষপুর, গরফা, পালবাজার, হাল্টুর সাথে সংযোগকারী রেলওয়ে ওভার ব্রিজ। এটি পূর্ব মহানগর বাইপাসের সাথে সরাসরি সংযোগ সরবরাহ করে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করার সময় থেকেই সুকান্তের  ছড়া লেখা সবাইকে অবাক করে দিয়েছিল। সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় ছাত্রদের লেখা ও ছবি নিয়ে সপ্তমিকা নামে হাতে লেখা একটি পত্রিকা বার করেন।  ভাব, ভাষা, ছন্দ  সব আপন মন থেকেই আসত। তাঁর ছড়া ছিল নিপীড়িত মানুষদের কথা ভেবে লেখা যারা দুবেলা দুমুঠো খেতে পায় না।
মাতুলালয়ে সুকান্ত ১৯২৬ সালের ১৫ই আগস্ট কলকাতার মহিম হালদার স্ট্রিটের বাড়িতে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর পিতার নাম নিবারণচন্দ্র ও মাতার নাম ছিল সুনীতি দেবী। তাঁর পিতার সংসার ছিল অভাব অনটনে ভরা।১৯৪২ সালের ভারত ছাড় আন্দোলন,১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ, ১৯৪৪ সালের নেতাজীর কার্যকলাপ,১৯৪৫ এর নৌবিদ্রোহ এবং ১৯৪৬ সালের ডাক ও তার বিভাগের ধর্মঘট - প্রভৃতি অসংখ্য আন্দোলন ও বিদ্রোহে সারা ভারত উত্তাল। এই দ্রুত পরিবর্তন সুকান্তকে উদ্বেলিত করে। শুধু সাহিত্য সাধনা নয়,  নানা সমাজ সেবামূলক কাজও তিনি করতেন। এর মধ্যে সুকান্ত যোগ দেন ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টিতে। তখন স্বাধীনতা নামে ছিল কম্যুনিস্ট পার্টির  দৈনিক পত্রিকা। এই পত্রিকায় 'কিশোর সভা' বিভাগের সম্পাদক ছিলেন তিনি।। এই বিভাগের সব ছড়াই তাঁর লেখা ছিল। তিনি কৃষ ক ও শ্রমিক আন্দোলনের সাথেও যুক্ত ছিলেন।তাঁর লেখা গান 'রানার' খুব ই জনপ্রিয়। বিদ্রোহ কবিতাটি আজও অনেককে অনুপ্রাণিত করে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় সুকান্ত অনেক গান রচনা করেন বিভ্রান্ত জনগণকে সতর্ক করবার জন্য।দেশের দুঃখদুর্দশা, অপমান নিয়ে তাঁর লেখা ছিল---

অবাক  পৃথিবী অবাক করলে তুমি।

জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ-স্বদেশ ভুমি।।

এ দেশে জন্মে পদাঘাতই শুধু পেলাম

অবাক পৃথিবী। সেলাম তোমাকে সেলাম।

তরুণ কবি সুকান্ত তাঁর কবিতায় রোষ,অভিমান, বেদনা ও বিদ্রোহ ফুটিয়ে তোলেন।তাঁর কতকগুলো কবিতা যথা রানার, সিঁড়ি,,হে মহাজীবন,বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তিনি প্রবন্ধ ও কয়েকটি গল্পও লিখেছিলেন।পরবর্তীকালে সুকান্তের সমস্ত কাব্য গ্রন্থ ও কতকগুলো চিঠিসহ 'সুকান্ত সমগ্র' প্রকাশিত হয়েছে।
আর্থিক অনটন ও পারিবারিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়েই অতিবাহিত  হয়েছিল সুকান্তের জীবন। স্কুলের গন্ডি তিনি পার হতে পাতেরেন নি। কিন্তু অভাব অনটন সত্বেও তাঁর কলম থেমে থাকেনি।
তাঁর লেখা শেষ কবিতার বই 'ছাড়পত্র' যখন ছাপা হচ্ছিল সেই সময় সুকান্ত যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হন। 'ছাড়পত্র’ কাব্যগ্রন্থের ‘হে মহাজীবন’ কবিতাটিতে সুকান্ত 

পূর্ণিমার চাঁদকে ঝলসানো রুটির

সাথে তুলনা করেছেন। ১৯৪৭ সালের ১৩ই মে  যক্ষ্মারোগে কবি সুকান্ত পরলোক গমন করেন।


প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।


30 April 2019

যেভাবে এলো শ্রমিকদের এই ঐতিহাসিক দিনটি।

দেশে বর্তমানে সপ্তদশ নির্বাচন পর্ব চলছে। ভোটের দিন রাজ্যগুলিতে ছুটি থাকছে। এর মধ্যে এসে গেল আর একটি ছুটির দিন। সেটা হল ১লা মে। ছুটি মানেই মজার দিন। কিন্তু এই দিনটির তাৎপর্য আমাদের ভুললে চলবে না।

এই দিনটি ঐতিহাসিক মে দিবস। শ্রমিকদের আত্মদানের দিবস। শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলে। দাবি ছিল দিনে ৮ ঘন্টা কাজ এবং  প্রাপ্য মজুরি। এই আন্দোলনের জন্য ১৮৬০ সালে শ্রমিকরা আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার নামে এক সংগঠন তৈরী করে। তাদের শ্লোগান ছিল সারা দিনে ৮ ঘন্টা কাজ, ৮ ঘন্টা বিশ্রাম, আর ৮ ঘন্টা শুধু নিজের জন্য।

এই আন্দোলনের জন্য তাদের প্রাণও দিতে হয়েছিল। ঘটনাটি ঘটেছিল ১৮৮৬ সালে। ১৮৮৪ সালে শ্রমিকদের দাবি ছিল ১লা মে, ১৮৮৬ সালের মধ্যে তাদের দাবি মেনে নিতে হবে। তাই ১লা মে যুক্তরাষ্ট্রের তিন লাখ শ্রমিক কাজ ছেড়ে রাস্তায় নেমে পড়লে আন্দোলন চরমে ওঠে। দুদিন পরে ৪ঠা মে, শ্রমিকরা সন্ধ্যের পর শিকাগোর হে-মার্কেট স্কয়ার নামে এক বাণিজ্যিক এলাকায় মিছিলের উদ্দেশ্যে জড়ো হন। পুলিশ এই শ্রমিকদের উপর অতর্কিতে হামলা শুরু করলে ১১ জন শ্রমিক শহীদ হন। তাছাড়া ছজন শ্রমিককে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে ১৮৮৭ সালের ১১ই নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে ফাঁসি দেওয়া হয়।

শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের ‘দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ’-এর দাবী আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায়। ১৮৮৯ সালের ১৪ই জুলাই ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ১ মে শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী বছর থেকে ১ মে বিশ্বব্যাপী পালন হয়ে আসছে ‘মে দিবস’ বা ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’।

আজকের দিনে শ্রমিকদের অবস্থানটা অনেকটা পাল্টে গেছে। এখন তাদের ৮ ঘন্টার বেশী কাজ করতে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ন্যায্য মজুরিও জোটেনা। স্থায়ী শ্রমিকের বদলে অস্থায়ী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ চলছে। সেখানে নেই কাজের কোন নিরাপত্তা। আজকের দিনে শ্রমিক আন্দোলনের রূপটাই বদলে গেছে।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেইল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

20 April 2019

১০০ বছর হয়ে গেল জালিয়ানওয়ালা বাগের বালক ও শিশু সহ নিরপারাধ নারী পুরুষদের উপর ব্রিটিশ শাসকদের নিশংস হত্যাকান্ড।


প্রবল রাষ্ট্রক্ষমতা অসহায় মানুষের উপআর অত্যাচার করলে সবাইকে রুখে দাঁড়াতে হবে - এই বার্তাটাই দিয়ে গেল জালিয়ানওয়ালাবাগ। শোনা কথা অনাথ কিশোর উধম সিংহ সেদিন আহত হয়ে সারা রাত পড়ে থাকার পর সকালে এক মুঠো রক্তাক্ত মাটি তুলে ফিরে এসে শপথ নিয়ে ছিল এই হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ নেবার। শুধু উধম সিংহ নয় সমগ্র ভারতবাসী শপথ নিল প্রতিশোধ নেবার। এই হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে সারা দেশে এমনকি সারা বিশ্বে নিন্দা ও সমালোচনার বন্যা বয়ে গেল। গান্ধিজী তার ইয়ং ইন্ডিয়া পত্রিকায় লেখেন এই শয়তান সরকারের সংশোধন সম্ভব নয়, একে ধ্বংস করতেই হবে। কবিমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও চুপ থাকতে পারেন নি। গ্রেফতারের পরোয়ানা না করে তিনি চেয়েছিলেন অমৃতসরে গান্ধিজীর সাথে সভা করতে। কবি নিজের নাইটহুড প্রত্যাখ্যানের চিঠি লিখে  করে পাঠালেন বড়লাটের কাছে। নাইটহুড প্রত্যাখ্যান-পত্রে লর্ড চেমসফোর্ডকে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, "আমার এই প্রতিবাদ আমার আতঙ্কিত দেশবাসীর মৌনযন্ত্রণার অভিব্যক্তি।" আর্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে মানব দরদী ইংরেজ সাহেব দীনবন্ধু এন্ড্রুজ পাঞ্জাবে যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু ইংরেজ সরকার তাঁকে পাঞ্জাবে যেতে দিল না। এটাই হল ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজের শেষের শুরু।

১০০ বছর হয়ে গেল জালিয়ানওয়ালা বাগের বালক ও শিশু সহ নিরপারাধ নারী পুরুষদের উপর ব্রিটিশ শাসকদের নিশংস হত্যাকান্ড। ১৯১৯ সালের ১৩ই এপ্রিল পাঞ্জাবের অমৃতসর শহরে ইংরেজ সেনানায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেগিনাল্ড ডায়ারের নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। ব্রিগেডিয়ার রেগিনাল্ড ডায়ার জন্মেছিলেন এই পাঞ্জাবে ভারতের মাটিতেই। এই হত্যাকান্ডের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল অনেক আগে থেকেই।

১৯১৪ সালের জুলাই মাসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে যুদ্ধে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীও অংশ নিয়েছিলো। ইংরেজ সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যুদ্ধে অংশ নিলে পরাধীন দেশগুলোকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হবে। এই কথায় ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রদূত  গান্ধিজী সহ অনেকেই যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে যুদ্ধে ভারতবাসীকে উৎসাহিত করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ১ লক্ষ ভারতীয় সৈন্য মারা যায় তার মধ্যে অধিকাংশই ছিল পাঞ্জাবের।

পাঞ্জাবের দন্ডমুন্ডের কর্তা স্যর মাইকেল ও'ডোয়্যার ৬ বছর ধরে কড়া শাসনে বেঁধে রেখেছিল পঞ্চনদীর দেশকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় নানা সুবিধার লোভ দেখিয়ে শুধু পাঞ্জাব থেকেই প্রায় ৫ লাখ পুরুষকে যুদ্ধে পাঠানো গিয়েছিল। ১৯১৭ সালের দিকে আর কেউ যুদ্ধে নাম লেখাতে চাইল না। শুরু হল অত্যাচার। মিলিটারিতে নাম লেখাতে শুরু হল জোর জবরদস্তি এবং শাস্তি। এই বছর হয় অতি বৃষ্টি, সাথে ম্যালেরিয়া আর প্লেগ মহামারি। এই সময় ব্রিটিশ সরকার দমন পীড়নের মাধ্যমে সকল প্রকার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কন্ঠরোধ এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে সচেষ্ট হয়। এই উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ সরকার বিচারপতি রাউলাটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের ‘সিডিশন কমিশন’ গঠন করে। ভারতীয়দের হিংসাত্মক আন্দোলন থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে রক্ষা করতে কমিশন কতকগুলি সুপারিশ করে।

১৯১৮ সালের শেষের দিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে। এই যুদ্ধে জার্মানি ইংল্যান্ড তথা মিত্রবাহিনীর হাতে পরাস্ত হয়। কিন্তু ভারতীয়দের প্রতি ইংরেজ সরকারের নীতিতে কোন রকম পরিবর্তন দেখা যায়নি। যেসব সৈন্য যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল তাদেরকে বেকার করে নিজেদের গ্রামে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়।  ভারতবাসীর মনে সন্দেহ ঘনীভূত হতে থাকে। এই সন্দেহ থেকেই ক্ষোভ এবং ইংরেজ বিরোধী মনোভাবের সূচনা ঘটে। এই বছর অনাবৃষ্টি,অর্থনৈতিক মন্দা এবং দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারিতে এক কোটির বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।

১৯১৯ সালের ১৮ই মার্চ  সিডিশন কমিশনের সুপারিশ সমূহের ওপর ভিত্তি করে ব্রিটিশ সরকার এক দমনমূলক আইন চালু করে। এই আইনই সাধারণভাবে কুখ্যাত ‘রাউলাট আইন’ নামে পরিচিত। এই আইনে জনগণের স্বাধীনতা ও অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়।
ভারতীয়দের জাতীয় স্বার্থবিরোধী এই আইনের বিরুদ্ধে চারিদিকে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে ওঠে। কেন্দ্রীয় আইন সভার সমস্ত ভারতীয় সদস্য প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন । মদনমোহন মালাব্য, মহম্মদ আলি জিন্নাহ, মাজহার উল হক আইন পরিষদের সদস্য পদে ইস্তফা দেন। চরমপন্থীরা তো বটেই সুরেন্দ্রনাথ সহ সকল নরমপন্থী নেতা এর বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন। গান্ধিজী সর্বভারতীয় আন্দোলনের ডাক দেন।

১৯১৯ সালের মার্চ মাসে গান্ধিজীর ডাকে দেশব্যাপী বিক্ষোভ হরতাল হয় ও জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। গান্ধিজী সত্যাগ্রহের হুমকি দেন। কুখ্যাত রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে স্থানীয় কংগেস নেতা সইফুদ্দিন কিচলু ও সত্যপালের শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ এবং হিন্দু-মুসলমান- শিখের অভূতপূর্ব যোগদান ইংরেজ প্রশাসকদের খুবই চিন্তা ও অস্বস্তিতে ফেলেছিল। এই দুই নেতা রাওলাট-এর নামে সদ্য চালু হওয়া কালা কানুনের স্বরূপ পঞ্জাববাসীকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাচ্ছিলেন। এই দুই নেতার বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করা হল কোনো জনসভায় ভাষণ না দেওয়ার।

এপ্রিল মাসে গান্ধিজী সত্যাগ্রহ তথা রক্তপতহীন আন্দোলনের মাধ্যমে এর রাওলাট আইনের প্রতিবাদের আয়োজন করেন। ৬ই এপ্রিল বিরাট এক জনসমাবেশে সইফুদ্দিন কিচলু ও সত্যপালের বিরুদ্ধে ফতোয়া প্রত্যাহারের দাবি ওঠে। পুরো অমৃতসর শহর স্তব্ধ করে হরতাল পালিত হয়।

৭ই এপ্রিল পাঞ্জাব যাওয়ার পথে গান্ধিজীকে গ্রেফতার করা হয়। এর প্রতিবাদে আহমেদাবাদের শিল্প শ্রমিক এবং পাঞ্জাবের সাধারণ জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। সরকার গান্ধিজীকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এর পরও বিক্ষোভ কমেনি। ধর্মঘটে এবং বিক্ষোভের লক্ষ্য হয়ে দাড়ায় সরকারী দপ্তর এবং যানবাহন। সাদা চামড়ার ইউরোপীয় কর্মকর্তা এবং অধিবাসীদের উপরও ভারতীয়রা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। তাদের উপরও আক্রমণ করা হয়। মোম্বাইতে জনতা পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়।
এপ্রিল মাসের গোড়ায় রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ সভা, হরতাল, হিন্দু- মুসলমান সম্প্রীতির আবহ ব্রিটিশ শাসকদের ক্রমশই বিচলিত করে তুলছিল।  ৮ই এপ্রিল ডেপুটি কমিশনার আরভিং লেফটেনান্ট গভর্নর মাইকেল ও'ডোয়্যার কে চিঠি লিখে মেশিনগান, সাঁজোয়া গাড়ি আর বাড়তি সেনা চেয়ে নেন।

১০ই এপ্রিল ১৯১৯ সালে সইফুদ্দিন কিচলু ও সত্যপালকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় অজানা গন্তব্যে। এই খবর ছড়িয়ে পরার সাথে সাথে ক্ষুব্ধ জনতা পথে নামলেন। আগুন জ্বলল অমৃতসর শহরে। মানুষ নেতার মুক্তির দাবিতে হাঁটল শহরের ডেপুটি কমিশনারের সাথে দেখা করতে চেয়ে। মিলিটারি পিকেট তাদের পথ আটকায়। ব্যারিকেট ভেঙ্গে এগোনের চেস্টা করলে শুরু হয় গন্ডগোল। জনতার উপর গুলি চললে মারা যায় ২০-৩০ জন। এরপর জনতাকে আর আটকানো গেল না। তাদের একাংশ উন্মত্ত হয়ে আক্রমণ করল টাউন হল, দুটো বিদেশী ব্যাংক, টেলিগ্রাফ আর টেলিফোন এক্সচেঞ্জ। মারমুখী জনতার হাতে মারা গেল পাঁচজন সাহেব। অমৃতসর শহরে ১৩০ জন ইংরেজ নর-নারীকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি নেটিভদের শিক্ষা দেওয়ার বন্দোবস্ত করতে শহটাকে মিলিটারির হাতে তুলে দেওয়া হয়।

পরের দিন ১১ই এপ্রিল সকাল থেকেই অমৃতসরের মাথার উপর চক্কর মারছিল যুদ্ধ বিমান। রাস্তায় কারফিউ ও সেনা টহল। আগের দিনের ঘটনায় মৃতদের দেহ সতকারে নানা রকম নিষেধাজ্ঞা সহ চলল যথেচ্ছ ধরপাকড়। রাতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডায়ার অমৃতসরে পৌঁছে শহরের  দায়িত্ব নিলেন। সে দিন গভীর রাতে বিদ্যুৎহীন করে দেওয়া হল অমৃতসর শহরটাকে। জল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হল।

১২ই এপ্রিল সকাল থেকেই অমৃতসরের মাথার যুদ্ধ বিমান নজর রাখছিল শহরের উপর। শহরের অলিগলিতে সেনা নামল। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডায়ার দুটি সাঁজোয়া গাড়ী নিয়ে বেরোলেন শহর পরিদর্শনে। বিনা অনুমতিতে শহরে প্রবেশ বা বার হওয়া নিষিদ্ধ। মিলিটারি পরাক্রম দেখিয়ে অমৃতসর শহর দখল হয়ে গেল। নোটিশ ঝুলিয়ে শহরের কিছু জায়গায় মিটিং- জমায়েত নিষিদ্ধ করা হল।

১৩ই এপ্রিল, ১৯১৯ সালের সেই অভিশপ্ত দিন। এদিন শহরের কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তি ঠিক করলেন বিকেলে একটা শান্তিপূর্ণ মিটিং করে কিচলু ও সত্যপালের মুক্তির দাবি তুলবেন। তার সাথে ১০ তারিখের অনভিপ্রেত ঘটনার পর সাধারণ মানুষের চরম হয়রানি ও যথেচ্ছ প্রেফতারের বিরুদ্ধেও কথা হবে। সেদিন ছিল বৈশাখী মেলা উৎসবও। স্বর্ণমন্দিরের কাছাকাছি একটি বাগান জালিয়ানওয়ালা বাগে মিটিং এর স্থান ঠিক হয়। সেখানে মিটিং নিষেধের কোনো নোটিশ ছিল না। চারিদিকে  পুলিশের পাহারা থাকলেও বাগান চত্বরে ঢোকার মুখে ভিড় আটকানোর চেষ্টা হয়নি। সেখানে জমা হয়েছিল প্রায় ১০ হাজার জনতা মিটিং শুরু হলে ডায়ার পরিকল্পনা করে ওই চত্বরে একমাত্র সরু যাতায়াতের গলির মুখে দুটো সাঁজোয়া গাড়ী লাগায়। রাস্তার দুধারে বসে গেল পুলিশ পিকেট। আকাশ পথে যুদ্ধ বিমান ঘটনা স্থল পরিদর্শন করে নিল। তার পরেই ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের নির্দেশে হাঁটু-গেড়ে বসা বালুচ ও গোর্খা সৈন্যরা শুরু করল গুলিবর্ষণ। বালক ও শিশু সহ নিরপারাধ নারী পুরুষদের উপর গুলি চলল ১৬০০ রাউন্ডের বেশী। বাগান থেকে বেরোনোর রাস্তা বন্ধ। প্রাণ বাঁচাতে বাগানের দেওয়াল টপকানোর অনেকে চেষ্টা করে। বাগানের মাঝখানে কুয়োতে অনেকে আবার ঝাঁপ দিয়ে গুলি এড়াতে চেয়েছিল। ১০ মিনিট ধরে চলে এই হত্যাকান্ড। সেদিন সরকারী হিসাবে মারা যায় ৩৭৯ জন এবং আহতের সংখ্যা ছিল ১২০০। কিন্তু বেসরকারী হিসাবে নিহতের সংখ্যা ১০০০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল এবং আহতের সংখ্যা ছিল অনেক বেশী।
সন্ধ্যের পর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডায়ার ক্যাম্পে ফিরে বিশ্রাম নিয়ে আবার বেরোলেন রাত আটটার পর শহরে টহল দিতে। দেখে নিতে কেউ বাগানের দিকে যাচ্ছে কিনা মৃত প্রিয়জনদের খোঁজে।

গোটা পঞ্জাব জুড়ে চালু হল সামরিক শাসন। চলল ২ মাস ধরে ধরপাকড় ও অসহ্য নির্যাতন সাথে হেনস্থা। এই হত্যাকান্ড ব্রিটিশ সরকার সম্বন্ধে ভারতীয়দের মোহভঙ্গ ঘটল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নগ্ন রূপ সারা বিশ্বের কাছে উন্মোচিত হয়ে গিয়েছিল। এর পরে গান্ধিজী দেশে বৃহত্তর গণ আন্দোলনের প্রস্তুতি নেন যার পরিণত রূপ ছিল অহিংসা আন্দোলন।

নারকীয় এই গণহত্যা ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়। সেই সময় এন্ড্রুজ সাহেব ছিলেন শান্তিনিকেতনে। নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াবার জন্য তিনি পাঞ্জাব যাবার মনস্থির করেন। কিন্তু ইংরেজ সরকার মানব দরদী ইংরেজ সাহেব দীনবন্ধু এন্ড্রুজকে পাঞ্জাবে যেতে দিল না। এন্ড্রুজ যখন অমৃতসর রেল স্টেশনে পৌঁছান তখন তাঁকে আটক করে দিল্লিতে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়।  বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথও এই হত্যাকান্ডে চুপ থাকতে পারেন নি। তিনি এন্ড্রুজকে গান্ধিজীর কাছে পাঠান যাতে তিনি এবং গান্ধিজী অমৃতসরে গিয়ে আর্ত মানুষদের পাশে দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু গান্ধিজী সেই সময় অমৃতসরে গিয়ে সরকারকে বিব্রত করতে চান নি।
প্রতিবাদী রবীন্দ্রনাথ ৩০শে মে সারা রাত জেগে কবি নিজের নাইটহুড প্রত্যাখ্যানের চিঠি লিখে ৩১ মে ভোরবেলা তার করে পাঠালেন বড়লাটের কাছে। নাইটহুড প্রত্যাখ্যান-পত্রে লর্ড চেমসফোর্ডকে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, "আমার এই প্রতিবাদ আমার আতঙ্কিত দেশবাসীর মৌনযন্ত্রণার অভিব্যক্তি।" এই পত্রের প্রতিলিপি লন্ডনের শহরে বিলি হয়।

ব্রিটিশ সরকারের উপর চাপ বাড়তে থাকে। ১০২০ সালের মার্চ মাসে জেনারেল ডায়ারকে পদত্যাগ করিয়ে ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ভারত ও ইংল্যান্ডে ডায়ার খুবই নিন্দিত হয়েছিলেন। কিন্তু কিছু ব্রিটিশ শাসক দলের কাছে বীর সম্মান পান। ডায়ার পরে নিজে তার কাজের জন্য অনুশোচনা করতেন।
জীবনের শেষ দিন গুলি ডায়ারের ভালো কাটেনি। একের পর এক স্ট্রোকের  কারণে বেশ কিছুদিন  পক্ষাঘাত এবং বাকরোধে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী  ছিলেন। ১৯২৭ সালে ইংল্যান্ডের সমারসেট কাউন্ট্রিতে সেরিব্রাল হেমারেজে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুশয্যায় তবে তিনি বলেছিলেন -
"অমৃতসরের পরিস্থিতি যারা জানত তাদের অনেকেই বলেছেন আমি ঠিক করেছি ... আবার অনেকেই বলেছেন আমি ভুল করেছি। আমি মরে আমার সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে জানতে চাইব আমি ঠিক না বেঠিক"।

কথিত আছে জালিয়ানওয়ালা বাগের সভায় অনাথ কিশোর উধম সিংহ আহত হয়ে সারা রাত পড়ে থাকার পর সকালে এক মুঠো রক্তাক্ত মাটি তুলে ফিরে এসে শপথ নিয়ে ছিল এই হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ নেবার। একুশ বছর পর ১৯৪০ সালে এই শপথ আংশিক ভাবে পূরণ করেন। নাম পাল্টে আফ্রিকা, আমেরিকা ও ইউরোপ হয়ে তিনি লন্ডনে পৌঁছান। মাইকেল ও'ডোয়্যার লন্ডনের সভায় বক্তৃতা দেবার সময় উধম সিংহ সামনে থেকে তাকে গুলি করে হত্যা করে। দ্রুত বিচারের পর উধম সিংহের ফাঁসি হয়।  জালিয়ানওয়ালা বাগে তাঁর চিতাভষ্ম রাখা হয় এবং সেখানে তাঁর একটা মূর্তিও বসেছে।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেইল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

17 April 2019

আজ ১৭ই এপ্রিল, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক ও শিক্ষক ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে  বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।

ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ ৫ই সেপ্টেম্বর, ১৮৮৮ সালে তামিলনাডুর তিরুট্টানিতে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। অভাব সেই পরিবারের নিত্য সঙ্গী। তবুও বাবা মা চেয়েছিলেন ছেলেটিকে পড়াশুনা শিখিয়ে মানুষ করতে হবে। ছোটবেলা থেকেই রাধাকৃষ্ণণের পড়াশুনার প্রতি ছিল প্রবল আগ্রহ। ওঁনার বাবা মা ছিলেন ঐতিহ্যগতভাবে ধর্ম বিশ্বাসী এবং পরিবারের সবাই হিন্দু ধর্মের রীতিনীতি নিষ্ঠার সাথে মেনে চলত।

যখন তাঁর বয়স ৮ তখন তিনি ভর্তি হন তিরুপতি শহরের লুথেরান মিশনারী বিদ্যালয়ে। মিশনারী পরিবেশে পড়াশুনা করার ফলে বাইবেল সম্বন্ধে তার আগ্রহ ছিল। জীবনে কোনও পরীক্ষায় দ্বিতীয় হননি। বিভিন্ন বৃত্তির মাধ্যমে তাঁর ছাত্রজীবন এগিয়ে চলে। ১৯০৫ সালে তিনি মাদ্রাজ খ্রিস্টান কলেজ থেকে দর্শনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তার বিষয় ছিল ‘বেদান্ত দর্শনের বিমূর্ত পূর্বকল্পনা’। ২১ বছর বয়সে এম এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

১৯০৯ সালে  মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। এখানে অধ্যাপনা করেন ৯ বছর। সাথে চলত প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্র দর্শন নিয়ে গর্বেষণা। ১৯২১ সালে বাংলার বাঘ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আমন্ত্রনে কলাকাতায় আসেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন। ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ পর্যন্ত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন।  দেশ–বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বারবার অধ্যাপনার জন্য আমন্ত্রিত হয়েছেন।

ছাত্রদের কাছে উনি ছিলেন খুব জনপ্রিয় এবং সব ছাত্ররাই তাঁকে তাদের পথ প্রদর্শক এবং ফিলোজফার হিসাবে মানত। ১৯২১ সালে মাইশোর বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যখন কলকাতা বিশ্ববদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হন তখন ছাত্ররা ফুল দিয়ে সাজানো বাহনে কলেজ ক্যাম্পাস থেকে রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়েছিল।

রাজনীতিবিদ, দার্শনিক ও অধ্যাপক এই শান্ত মানুষটি ছাত্রজীবনে অতি মেধাবী ছিলেন।  বিশ্বের দরবারে তিনি অতি জনপ্রিয় দার্শনিক অধ্যাপক হিসাবেও পরিচিত ছিলেন। ১৯৩১ সালে তাঁকে ব্রিটিশ নাইটহুডে সম্মানিত করা হয়। ১৯৫৪তে ভারতরত্ন উপাধি পান।

তিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম রাজ্যসভার চেয়ারম্যান, উপরাষ্ট্রপতি (১৯৫২-১৯৬২) এবং দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি (১৯৬২-৬৭) ছিলেন।

তিনি বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য পত্রিকায় লিখতেন। ১৯১৮ সালে তিনি লেখেন তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘ দ্য ফিলোজফি অফ রবীন্দ্রনাথ টেগোর’। দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘দ্য রেন অফ রিলিজিয়ন ইন কনটেমপোরারি ফিলোজফি’ প্রকাশিত হয় ১৯২০সালে।

শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং তাঁদের অবদানকে স্মরণ করার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শিক্ষক দিবস' পালিত হয়। এই দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন দিনে পালিত হয়ে থাকে। তবে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ৫ অক্টোবর তারিখে বিশ্ব শিক্ষক দিবস নামে পালিত হয়।  ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তাঁর জন্মদিন ৫ই সেপ্টেম্বরে ভারতে শিক্ষক দিবস হিসাবে পালিত হয়।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেইল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

14 April 2019

আজ ১৪ই এপ্রিল ডঃ ভীমরাও রামজি আম্বেডকরের ১২৮তম জন্মবার্ষিকী আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।


ডঃ ভীমরাও রামজি আম্বেডকর ছিলেন ভারতীয় সংবিধান রচয়িতা, সমাজ সংস্কারক, রাজনীতিবিদ, হরিজনবন্ধু, লেখক, বৌদ্ধধর্ম সংস্কারক, ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের রূপকার। তিনি বাবাসাহেব  নামেও পরিচিত ছিলেন।

বোম্বের এলফিনস্টন হাই স্কুল, শিক্ষক একটি সমস্যা সমাধানের জন্য ক্লাসের পেছনের বেঞ্চে বসা একজন ছাত্রকে ডাকলেন। ছাত্রটি  ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে এগিয়ে গেলে  মুহূর্তের মধ্যে  পুরো ক্লাসে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেল। অন্যান্য ছাত্ররা তাদের টিফিন বক্স রাখতো ব্ল্যাকবোর্ডের পেছনে। ছাত্রটি ব্ল্যাকবোর্ডের কাছে আসার আগেই সবাই তাড়াহুড়ো করে নিজেদের টিফিন বক্স সরাতে লাগলো। কারণ ছাত্রটি কাছাকাছি আসলে যে, তাদের খাবার অপবিত্র হয়ে যাবে।

ছাত্রটির পরিবার দাপোলি থেকে সতরে চলে আসে। ছাত্রটি ক্লাসের ভেতরে ঢোকার সুযোগ পেলেও বেঞ্চিতে বসতে পারতেন না। ক্লাসের এক কোনে নিজের নিয়ে আসা পাটের বস্তাটি বিছিয়ে বসে পড়তেন। দিনশেষে আবার সেটি নিয়ে যেতেন সঙ্গে করে। কারণ স্কুল পরিষ্কার করা কর্মচারীও সেটি স্পর্শ করতেন না। স্কুলের ট্যাপ খুলে বা জগ থেকে তার জল খাবার অনুমতি ছিলো না। কারণ তাঁর ছোঁয়ায় এসব অপবিত্র হয়ে যাবে। কেবল যখন উচ্চ বর্ণের কেউ ট্যাপ খুলে দিত বা জগ থেকে জল ফেলত তখনই তার জল খাবার সুযোগ মিলত। এ ‘নিচু’ কাজটার দায়ভার সাধারণত স্কুলের পিয়নের কাঁধেই পড়তো। সে জগ থেকে জল ঢালত ছাত্রটির জন্য। অন্য কেউতো কাছেই ঘেঁষতো না তেমন। যেদিন পিয়ন থাকতো না, সেদিন তাকে তৃষ্ণার্ত হয়েই কাটাতে হতো।

কী প্রচণ্ড ঘৃণা! কেন? কারণ ছাত্রটি যে জন্মেছেন নিন্মবর্ণের পরিবারে। মহর পরিবারে জন্ম নেওয়া একজন দলিত তিনি। এতক্ষণ যে ছাত্রটির কথা বলেছি তার পুরো নাম ভীমরাও রামজি আম্বেডকর। দলিতরা যাকে ভালোবেসে ‘বাবা সাহেব’ বলে ডাকেন। পরবর্তীকালে যিনি হয়ে উঠেছিলেন তুখোড় অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক। তিনি হয়েছিলেন ভারতের প্রথম আইনমন্ত্রী, ভারতীয় সংবিধানের মুখ্য স্থপতি। তবে সবচেয়ে আগে তার যে পরিচয়টি দেয়া দরকার তা হলো, বর্ণবৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। ১৯৯০ সালে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক উপাধি ‘ভারতরত্ন’-তে ভূষিত করা হয় তাকে।

ভীমরাও রামজি আম্বেডকর জন্মেছিলেন ১৮৯১ সালের ১৪ই এপ্রিল ভারতের মধ্যপ্রদেশের মোহ অঞ্চলে। রামজি মালোজি শাকপাল ও ভীমাবাই এর চতুর্দশ সন্তান ছিলেন তিনি। তার পূর্বপুরুষদের অধিকাংশই ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। মূলত পিতার ইচ্ছাতেই তার স্কুলের পাঠ শুরু হয়। সেখানে দলিত হওয়ার কারণে তিনি শৈশবেই যে তীব্র বিদ্ধেষের মুখোমুখি হয়েছেন তা উপরের ঘটনাগুলো থেকে কিছুটা টের পাওয়া যায়।

এই বিদ্ধেষ শুধু মাত্র স্কুলেই সীমাবদ্ধ ছিল না। স্কুলের বাইরেও এ হেনস্থা তাঁর পিছু ছাড়েনি। তারা যে পাড়ায় থাকতেন যেখানে অধিকাংশই উচ্চবর্ণের হিন্দু ছিল। সেখানে কোনো নাপিত তাদের চুল কেটে দিতো না, কোনো ধোপা তাদের কাপড় কেঁচে দিতো না। তার বড় বোনকেই তার ও তার ভাইদের চুল কেটে দিতে হতো।
তীব্র হতাশা থেকেই জন্ম হয় সমাজ সংস্কারকদের, বিপ্লবীদের। কেননা এ হতাশাই এনে দেয় সমাজ বদলানোর জিদ। যা ভি আর আম্বেডকরের মনেও তীব্রভাবে জেগেছিল। তিনি তার জীবনের মিশন হিসেবে নিয়েছিলেন বর্ণবৈষম্য দূরীকরণকে। দলিতদের মুখপাত্র হয়ে উঠেছিলেন গোটা ভারতে। তাদের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন এক সুন্দর ভবিষ্যতের। আর এসব কারণেই তিনি দলিতদের কাছে হয়ে উঠেছিলেন ভালোবাসার ‘বাবা সাহেব’।

১৯০৩ সালে আম্বেডকর মাত্র ১২ বছর বয়সে হিন্দু রীতিতেই ৯ বৎসরের দাপোলির মেয়ে “রামাবাই”এর সাথে হয়। বিয়ের পর সপরিবারে তিনি মুম্বাইয়ে চলে আসেন। যেখানেই আম্বেডকর এলফিন্‌স্টোন রাস্তার পাশের সরকারি বিদ্যালয়ের প্রথম অস্পৃশ্য  ছাত্র হিসাবে ভর্তি হন।

ভীমরাও রামজি আম্বেডকর প্রথমে শিখধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হলেও শিখদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক টেকেনি। ১৪ই অক্টোবর ১৯৫৬ সালে তিনি নাগপুরে লক্ষ লক্ষ অনুগামীসহ তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন।

আম্বেডকর ডায়াবেটিস রোগে শারীরিক অবনতির জন্য ১৯৫৪ সালে জুন থেকে প্রায় ৫-৬ মাস তিনি শয্যাগত ছিলেন ও তাঁর দৃষ্টিশক্তি হারান। তিনি ৬ই ডিসেম্বর ১৯৫৬ সালে তাঁর দিল্লিতে বাড়িতে ঘুমন্ত অবস্থায় চির নিদ্রায় শায়িত হন।

প্রিয় পাঠক–পাঠিকা ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। যে কোনো বিষয়ে জানা- অজানা তথ্য আমাদের সাথে আপনিও শেয়ার করতে পারেন।১০০০ শব্দের মধ্যে গুছিয়ে লিখে ছবি সহ মেইল করুন  wonderlandcity.net@gmail.com ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।